নির্বাচনী প্রস্তুতি : বিএনপিকে নিয়ে কী ভাবছে সরকার?

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৪:১২ পূর্বাহ্ণ, জুন ১, ২০১৮ | আপডেট: ৪:১২:পূর্বাহ্ণ, জুন ১, ২০১৮

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বাধিকক রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চায় আওয়ামী লীগ। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বিতর্ক এড়াতেই এবার বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে চায় ক্ষমতাসীনেরা। আর খালেদা জিয়াবিহীন নির্বাচনে বিএনপি আসছে না ধরেই এ দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন সরকারের কর্তাব্যক্তিরা।

আওয়ামী লীগ ও সরকারের সূত্রগুলো জানায়, আদালতে সাজা হওয়ায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না বলে মনে করছে আওয়ামী লীগ। আর খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলে বিএনপিও নির্বাচনে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। সেজন্য বিতর্ক এড়াতে নিবন্ধিত অন্যান্য ছোটখাটো দলগুলোকে নির্বাচনমুখী করার চিন্তা করছে তারা। এ ক্ষেত্রে এসব দলকে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনাসহ যা যা করার সবই করবে সরকার। নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে স্থান দেয়া হবে জাতীয় পার্টিকে। আর ১৪ দলীয় জোটের কলেবর না বাড়িয়ে সমমনা সব রাজনৈতিক দলকে আলাদা নির্বাচনের পরামর্শ দেয়া হবে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘নির্বাচনের জন্য কোনো রাজনৈতিক দলই অপরিহার্য নয়। কোনো দলের নেতা যদি দুর্নীতির সাজার কারণে নির্বাচনে অযোগ্য হন এবং সেই কারণে দলটি নির্বাচনে না আসে তবে সেটি একান্তই তাদের ব্যাপার। ওই একটি দলের জন্য তো আর নির্বাচন বসে থাকতে পারে না। তারা না এলেও এবার সর্বোচ্চসংখ্যক রাজনৈতিক দল নির্বাচনে আসতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাই নির্বাচন নিয়ে কোনো ধরনের প্রশ্ন উঠবে না।’

এর আগে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নবম জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অধিকাংশ দল বর্জন করে এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্রসহ মাত্র ১৭টি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। এ ছাড়াও নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীরা বিজয়ী হওয়ায় ওই নির্বাচন নিয়ে চরম বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

৫ জানুয়ারির ওই নির্বাচনে দেশের মোট ৯,১৯,৬৫,৯৭৭ ভোটারের মধ্যে মাত্র ৪,৩৯,৩৮,৯৩৮ জন ভোট দেয়ার সুযোগ পান। নির্বাচনের দিন সহিংসতায় নিহত হন ১৯ জন। নির্বাচনপূর্ব সহিংসতার দিক থেকেও ওই নির্বাচন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটের আগের দিন পর্যন্ত ৪১ দিনে মারা যান ১২৩ জন। আর ভোটের দিন এত সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি আগে কখনো হয়নি। দেশের তৎকালীন প্রধান বিরোধীজোটের বর্জনের মুখে অনুষ্ঠিত একতরফা ওই নির্বাচন নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রশ্ন ও সমালোচনায় পড়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের চাপের মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই নির্বাচনকে নিয়ম রক্ষার নির্বাচন হিসেবে আখ্যা দিয়ে ২-৩ মাসের মধ্যে আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন। তবে সেই নির্বাচন আয়োজনে কোনো উদ্যোগ আর নেয়নি ক্ষমতাসীন দল।

সরকারের একাধিক সূত্র জানায়, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া একটি দুর্নীতি মামলায় বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে নাশকতার একাধিক মামলা রয়েছে। কোনো মামলায় জামিন হলে অন্য একটি মামলায় তাকে পুনরায় গ্রেফতার দেখানো হচ্ছে। এভাবে আগামী নির্বাচন পর্যন্ত সময় পার করতে চায় সরকার। ফলে নির্বাচনের আগে তার কারামুক্তি নিয়ে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। তবে সাবেক তিনবারের এই প্রধানমন্ত্রী কারাগারে বেশ অসুস্থ বলে দলের নেতারা জানিয়েছেন। ইতোমধ্যেই একবার কারাগার থেকে তাকে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাও দেয়া হয়েছে। সে জন্য তিনি রাজি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য নির্বাচনের আগে প্যারোল বা জামিনের মাধ্যমে তাকে দেশের বাইরে পাঠানো হতে পারে। ফলে তিনি আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না তা একেবারেই অনিশ্চিত।

এ দিকে খালেদা জিয়াবিহীন নির্বাচন কোনোভাবেই হতে দেয়া হবে না বলে হুঁশিয়ার করছেন বিএনপির নেতারা। তাকে জেলে রেখে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তারা। এ অবস্থায় বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না ধরে নিয়েই সব রকমের প্রস্তুতি সেরে নিচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এর অংশ হিসেবে আবারো বিএনপিবিহীন একতরফা নির্বাচনের কলঙ্ক মোচন করতে আগামী নির্বাচনে ছোটখাটো রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে নিয়ে আসা হবে। এর মাধ্যমে সর্বোচ্চসংখ্যক রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চায় তারা। শুধু তাই নয়, তুলনামূলক ভোটের হার বাড়ানোর দিকেও বিশেষ নজর দেয়া হবে এবার। বিশেষ করে ভোটের হার ৬০ থেকে ৭০ ভাগ দেখতে চান সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। যাতে বিএনপিবিহীন নির্বাচন নিয়ে কোনো ধরনের প্রশ্ন উঠতে না পারে। নির্বাচনে সর্বোচ্চসংখ্যক রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ এবং ভোটের হার দেশ-বিদেশে ফলাও করে তুলে ধরা হবে। বিষয়টি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদেরও নিয়মিত অবহিত করা হচ্ছে সরকার ও দলের তরফ থেকে। সর্বশেষ গত সোমবার রাজধানীর গুলশানের একটি অভিজাত হোটেলে ৩৩টি দেশের কূটনীতিকের সাথে বৈঠক করে এসব বিষয় তুলে ধরেন আওয়ামী লীগ ও সরকারের প্রতিনিধিরা।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের দুই নেতা আলাপকালে বলেন, খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে কারাগারে। তার নামে আরো অনেক মামলা ঝুলছে। তিনি যদি নির্বাচন না করতে পারেন আর বিএনপি সেই অজুহাতে নির্বাচন বর্জন করে তবে আমাদের কিছুই করার নেই। নির্বাচন হবে সংবিধান অনুযায়ী এবং নির্বাচন কমিশনের অধীনে। এখানে কে বা কোন দল এলো কারা এলো না তা দেখার বিষয় নয়। ইতোমধ্যেই আমরা বিষয়টি স্পষ্ট করেছি। বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের আমরা তা সাফ জানিয়ে দিয়েছি।

আওয়ামী লীগ সম্পাদকমণ্ডলীর তিন নেতা বলেন, উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বিএনপি এবারো নির্বাচনে আসবে বলে মনে হয় না। আর তারা না এলে আওয়ামী লীগ ১৪ দলের সাথে মিলে নির্বাচন করবে। অন্য দিকে নির্বাচনী জোট থেকে জাতীয় পার্টিকে বের করে দিয়ে আলাদা নির্বাচন করানো হবে। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত ছোটখাটো সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে নিয়ে আসা হবে। কাউকে বিএনপির অভাব বুঝতে দেয়া হবে না। পাশাপাশি ভোটের হার বাড়ানোর ওপর বিশেষ নজর দেয়া হবে।

দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী হবে। সেটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার স্পষ্ট করেছেন। নির্বাচনে কে এলো আর কে এলো না তা দেখার বিষয় নয়। নির্বাচন কেমন হলো কেবলমাত্র সেটি দেখার বিষয়।’