ছোট ব্যবসা, ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালনা

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৯:৪৬ অপরাহ্ণ, মে ২৫, ২০১৮ | আপডেট: ৯:৪৬:অপরাহ্ণ, মে ২৫, ২০১৮
ছোট ব্যবসা, ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালনা

শুরুর কথা

দুনিয়াজুড়ে ছোট বা মাঝারী (এস এম ই – স্মল এন্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ) প্রতিষ্টান উতপাদন এবং ব্যবসার ক্ষেত্রে বিরাট ভুমিকা পালন করে আসছে। শুধু বড় শিল্পের সহযোগি হিসেবে নয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধীর ক্ষেত্রে সার্বিক পুজীর যোগান, লোকবল নিয়োগ, মুল্য সংযোজন এসব ক্ষেত্রে বড় অর্থনীতিতে – যেমন আমেরিকা, ইংল্যান্ড, জার্মানী, ফ্রান্স,জাপান, সামষ্টিক ভাবে মুল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞে চালিকা শক্তি হিসেবে ভুমিকা রেখে আসছে। আর এই ভুমিকা পালনের পেছনে রয়েছে এদের অল্প পুজির নির্ভ্রতার মধ্যে ব্যবসায়িক জ্ঞান, পুজি এবং কারিগরী ঙ্গানের উতকর্ষ্যতা, বাজার এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সনবন্ধে হাল ধারনা এবং ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে কঠীন আধুনিক নিয়ন্ত্রন এবং পরিচালনা ব্যবস্থার প্রয়োগ।

আমাদের দেশেও ছোট ব্যবসা আমাদের অর্থনীতেতে একই ভুমিকা পালন করে আসছে তবে কারিগরী জ্ঞান, আধুনীক ধ্যান ধারনার অভাবে প্রত্যাশীত ভুমিকা পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

এই সব ধারনা যেমন কারিগরী জ্ঞান , ব্যবস্থাপনা, পুজী, ক্যাশ, স্টক, হিসাব, লাভ লোকসান, বাজেট তৈরী ও এর সমীক্ষন, পর্যালোচনা করার নিয়ম কানুন এইসব নিয়ে অতি সাধারন ভাষায় এখানে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে। মুল লক্ষ সাধারন বিনীয়োগকারি যাদের প্রাতিষ্ঠানিক এবং কারিগরী জ্ঞানের প্রয়োজন তাদেরকে অতি সাধারণভাবে মুল ব্যপারগুলো বলে দেয়া। যেহেতু পুরো ব্যপারটাই কারিগরী (ট্যাকনিকাল) এবং আধুনিক, কাজেই সবটাই সাধারন ভাষায় প্রকাশ করার মধ্যে কষ্ট এবং সমস্যা দুটোই আছে। এরপরেও যে ভাবনা নিয়ে এই লেখার উদ্যোগ, কিছু উদ্দোক্তাকেও যদি কোনভাবে এই লেখা গুলি প্রভাবিত করে এবং সঠিক সময়ে, সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে সেটাই হবে এই উদ্দ্যোগের সার্থকতা।

সংক্ষেপে ব্যবসার নানান দিক নিয়ে বিষয় ভিত্তিক আলোচনা করা হয়েছে। বিষয় বেছে বেছে পড়ার সুবিধা থাকছে, যেমন কেউ যদি জানতে চায় ব্যবসার ‘লাভ ক্ষতি’র হিসেবটা কিভাবে করবেন বা বুঝবেন সেক্ষেত্রে ‘লাভ ক্ষতি’ অংশ বা ‘নগদ ব্যবস্থাপনা’ (ক্যাশ ফ্লো ম্যানেজমেন্ট)সনবন্ধে জানতে চান, ঐ আইটেমটা আলাদা ভাবে পড়ে নিতে পারেন। উদাহরন এবং ট্যাবল এর মাধ্যমে যেভাবে প্রতিদিনের কার্য্যক্রম চলে সেটা যেখানে দরকার সেখানে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে যাতে সহজে ধারনাটা নেয়া যায় মুল অন্তর্নিহিত কারন গুলো সনবন্ধে। সহজীকরন করার ফলে যাদের কারিগরি জ্ঞান আছে তারা অবশ্যই বিস্তারিত জানার জন্য আসল বই বা মুল বিষয় থেকে বিস্তারিত জেনে নেবেন।

১। ছোট ব্যবসার সংঙ্গা

সাধারনত অল্প পুজি নিয়ে কোন উদ্দোক্তা যখন ব্যাবসা বা উতপাদন এর জন্য বিনিয়োগ করে এবং নিজে অথবা অল্প কিছু লোক নিয়োগ দিয়ে তা পরিচালনা করে এইসব প্রচেষ্টাই ছোট ব্যবসা হিসেবে ধরা হয়।

কখনো আবার পুজির পরিমাপেও নির্নয় করা হয় – যেমন ১০,০০০ থেকে ১০ লাখ বা ১ কোটি টাকা।

তবে সাধারনভাবে এইসব প্রতিষ্টান পারিবারিক এবং ব্যক্তি নিয়ন্ত্রনেই পরিচালিত হয় এবং প্রায়শ আধুনিক হিসাব রক্ষন বা ব্যাবসায়ীক নিয়ম কানুনের রিতি নীতি উপেক্ষীত থাকে। ফলে অল্প সঙ্খক উদ্দোক্তাই সাফল্য ধরে রাখতে পারে দীর্ঘ্য মেয়াদে। এটাই সাধারন ধারনা।

২। পুজী কি

লগ্নিযোগ্য এবং বিনীয়োগকৃত অর্থকেই আমরা সাদামাটা ভাবে পুজী বলতে পারি। এই পুজির সাধারণ বৈশিষ্টগুলো এরকম – নিজস্য অর্থ, পারিবারিক ধার (আত্নীয়, বন্ধু), প্রাতিষ্টানিক ধার – ব্যাংক, এনজিও বা কোন লগ্নিকারি প্রতিষ্টান, বা অংশিদারের বিনিয়োগ।

পুজি বা মুলধনের আর এক বৈশিষ্ট হোল – এটা হতে পারে ফিক্সড বা দীর্ঘমেয়াদী এবং চলতি বা সল্পমেয়াদি।

ফিক্সড মুলধন -সাধারনত যন্ত্রপাতি, মেশিনারিজ, দোকানঘর বা অফিস, লাইসেন্স ফি বা জামানত এসব ক্ষেত্রেই ব্যবহার হয় যার মুল বৈশিষ্ট হোল এই বিনিয়োগ যেহেতু ব্যবসা পরিচালনার জন্য আসল বাপার কাজেই এই মুলধন এখানে বন্দি থাকে এবং ব্যাবসা ভেঙ্গে বা গুটানো ছাড়া এইমুলধন নগত টাকায় রুপান্তৃত করা যায়না। আর কোন ব্যবসার কতখানি এই ধরনের মুলধন দরকার তা নির্ভর করে সেই ব্যবসার ধরন হিসেবে।

চলতি মুলধন -সাধারনত ব্যবসার দৈনন্দিন কর্মকান্ডের জন্য ব্যাবহার হয়ে থাকে। যেমন মাসিক বেতন, বিদ্দুত, দোকান ভাড়া, যাতায়াত,বা যাবতিয় আনুষাঙ্গিক ব্যবসা বা উতপাদন পরিচালনা খরচ। এর সঙ্গে  ব্যাবসার আসল প্রকৃয়া যেমন বিক্রয় করার জন্য পন্য ক্রয় বা কারখানার জন্য কাচামালের তাতক্ষনিক এবং সল্পমেয়াদী জোগান- ষ্টকএ বিনীয়োগ অবশ্যই থাকছে।

চলতি মুলধনের সঠীক ব্যবহারের উপর নির্ভর করে ব্যবসায়িক সাফল্য এবং আমাদের দেশে ছোট এবং মাঝারী উদ্দোক্তাদের জন্য এটা বড় চ্যালেঞ্জ।

একটি ব্যবসার সাফল্য এবং সঠিক মুনাফার ভিত্তিতে দির্ঘমেয়াদে বাজারে টিকে থাকার ক্ষেত্রে এই চলতি মুলধনের চুলচেরা ব্যবহারই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মুল কারন হিসেবে সামনে আসে। সঠিক উপলব্ধি বা বাজার ধারনার অদুরদর্শীতা বাজার মাফিক বা পুজির ভবিষ্যত জোগান মাফিক পরিকল্পনার অভাবই প্রয়োজনীয় নগদ জোগানের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করে যা প্রায়শ বিরাট বাধা হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। এই নগদ পরিকল্পনার সাধারন রুপরেখা নিয়ে ‘নগদ’ (ক্যাশ ফ্লো ম্যানেজমেন্ট)অংশে আলোচনা করা হবে।   এ নিয়ে প্রয়োজনিয় নিরীক্ষা এবং মডেল তৈরির প্রচেষ্টা ‘ক্যাশ ফ্লো ম্যানেজমেন্ট’ এ দেয়া আছে।

৩। পুজীর উতস এবং যোগান

সাধারনভাবে একজন উদ্দোক্তা নিম্নলিখিতভাবে পুজির যোগান দেয় –

ক। নিজস্য জমাকৃত টাকা এবং আত্নীয় সব্জনের কাছ থেকে সল্প মেয়াদে ধার।

খ। ব্যাংক লোন বা কোন প্রতিষ্টান থেকে (এনজিও ইত্যাদি) লোন।

গ। অংশিদার গ্রহন।

উপরেল্লিখিত তিন ধরনের পুজীর বৈশিষ্টও তিন রকম, যাহা প্রতিটা উদ্দোক্তার সঠিকভাবে জানা প্রয়োজন।

১। নিজস্য বা সব্জনের কাছ থেকে নেয়া পুজির উপর কোন সুদ বা চার্জ নাই, ‘ফ্রি মানি’

তবে এই টাকাটা ব্যংকে জমা রাখলে যে মুনাফা পাওয়া যেত সেটা হিসেবে রাখা দরকার।

২। যেকোন লোনের উপর মাসিক হারে সুদ থাকে, থাকে সঠিক সময়ে না দিতে পারার উপর পেনাল্টি, ফাইন এবং চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ। এই খানে লোনের পরিমান এবং তার থেকে আয়টা যদি সুদ থেকে বেশী না হয় তাহলে ব্যবসার লাভ না হয়ে ক্ষতিই হবে মাসের শেষে।

৩। অংশিদার যেমন ফ্রী টাকা বা পুজী আনে তেমনি আনে তার অভিজ্ঞতা। কিন্তু পাশাপাশি সঙ্গে থাকে তার নিজস্য ভাবনা এবং উচ্চাশা। আর শুরুতেই যদি অংশিদারের কর্মকান্ডের গন্ডি এবং পরিধী বিস্তারিতভাবে আলেচিত হয়ে মতৈক্য না হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরবর্তিতে অংশিদার নানা সমস্যা তৈরী করে এবং ব্যক্তিগত মনমালিন্য থেকে তা ব্যবসায়ীক ক্ষতির কারন হয়ে দাঁড়ায়।

৪। ব্যক্তিমালিকানা বা পারিবারিক ব্যবসা

যেসব উদ্যোগ ব্যক্তিনামে বা পারিবারিক নামে স্থানীয় পৌরপ্রতিষ্টান থেকে লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করে। এখানে উদ্দোক্তা একজন ব্যক্তি হিসেবে ব্যবসার যাবতীয় আইনি এবং অর্থনৈতিক বিষয়ে নিজে দায়বদ্ধ থাকেন। এইসব প্রতিষ্টান পরিচালনার ব্যপারে আইনের বাধ্য বাদকতা কম, এর আয় একজন ব্যক্তির আয় ব্যয় হিসেবে বছর শেষে সরকারের কাছে সাধারন নিয়ম মাফিক ট্যাক্সএর জন্য রিটার্ন দিতে হয়।

৫। অংশিদারি বা পার্টনারশিপ ব্যবস্যা

ব্যক্তিমালিকানার মতই আইনি কাঠামো, শুধু এখানে একের অধিক মালিকানাসত্ত থাকে।

এখানে অংশিদার তার বিনীয়োগ বা কাজের দায়ীত্য ভেদে লাভলোকশানের হিসেবে শরিক হন। এই শরিক হওয়ার যায়গাগুলো শুরু থেকেই পরিস্কারভাবে লিখিত চুক্তি আকারে থাকা খুব দরকার, আর যেখানে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো উল্লেখ থাকা প্রয়োজন –

ক। অংশিদারের পুজীর পরিমান – (যেমন – ৫০,০০০ টাকা

খ। ব্যবসায় তার অংশের পরিমান  – ৩০% (লাভ অথবা লোকসান)

গ। তার দায়ীত্য – ফুলটাইম হিসেবে বিক্রয়, পাওনাদার, মজুদ মালামাল এবং বিক্রয়ের যাবতীয় হিসেব পরিচালনা এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়ীত্য ইত্যাদি।

ঘ। মাসিক পারিশ্রমিক – নাই, অথবা মাসের শেষে বেতন – ১০,০০০ টাকা।

ঙ। লভ্যাংশ – ষান্মাসিক/ত্রৈমাসিক হিসেবে প্রত্যাশিত মুনাফার অংশ নগদ উত্তলোন করতে পারবেন যা বাতসরিক হিসেব শেষে মিলেয়ে নেয়া যাবে এবং নগদ প্রদান করা হবে। যদি নগদ দেয়া না হয় বা তুলে নেয়া না হয় তাহলে সেই টাকার উপর কোন সুদ বা অন্য কোন সুবিধা আরোপ হবে না। তবে লভ্যাং যদি মুলধণ হিসেবে ব্যবসায় খাটা হয় সেক্ষেত্রে সেটা পরিস্কারভাবে উল্লেখ করতে হবে অন্য সরিকের সাথে। এই ব্যপারটা আবার পুর্বল্লিখিতভাবেও থাকতে পারে যে মোট মুনাফার ৫০% শুধু তোলা যাবে বাকীটা ব্যবসায় খাটানো হবে ।

চ। নগদ উত্তোলন বা চলতি হিসাব – মাসিক বেতন বা লভ্যাংশের টাকার চলতি হিসাব থাকবে যা থেকে নগদভাবে টাকা ইচ্ছেমত তুলতে পারবে তবে জমার অতিরিক্ত কখনই তুলতে পারবে না। যদি ব্যবসা থেকে সাময়িক হাওলাদ করতে হয় সেটার পরিমান, সময় হয় আগেভাগে উল্লিখিত – যা সবার জন্য প্রযোজ্য অথবা অন্য শরীকের সংগে মতৈক্যের ভিত্তিতে হতে হবে। মনে রাখতে হবে নগদ উত্তোলন এবং চলতি হিসেব ঠিকভাবে সবার জন্য একই রকম নিয়মে চালিত না হওয়ার মধ্যে লুক্কায়ীত থাকে অসন্তোসের বীজ এবং অবশেষে ব্যবসার সর্বনাশ।

খুব সাধারন হিসেবে এইসবই মনে রাখতে হবে এবং সঠিকভাবে মেনে চলতে হবে। আর এইসব মেনে চলার পেছনেই রয়েছে ব্যবসার সাফল্য এবং ঝুট ঝামেলা থেকে দূরে থাকার উপায়। সাধারনভাবে আমাদের উদ্দক্তারা এইসব খটিনাটি বিষয় নিয়ে মোটেই মাথা ঘামাতে চাননা এবং বন্ধুত্য বা আন্তীয়তার আবেগে শুরুতে এসব ঢেকে রাখেন।

ছ। হিসাব সংরক্ষন – সবচ্ছতা এবং সময়মত ও সঠিক হিসেব রাখাটা অংশিদারী ব্যবসায় আরো জরুরী। এই ব্যাপারে ছোট পুজির যেমন থাকেনা অভিজ্ঞতা তেমনি থাকে এক ধরনের উদাসীনতা। যা পরবর্তিতে ব্যবসায়ীক সংকট তৈরী করে শুধু অংশিদারের মধ্যেই নয় অর্থনৈতিক সমস্যাও সৃষ্টি করে ব্যবসার সার্বিক কার্যক্রমের সঠিক বর্ননা না থাকার জন্য। (হিসেব রাখার ব্যপারে বেশ কিছু করনিয় এই কার্য্যক্রমে থাকছে)।

 

৬। লিমিটেড কোম্পানী

সীমিত দায় নিয়ে কোম্পানি আইনের আওতায় ছোট ব্যবসাও নিবন্ধিত হতে পারে। এই নিবন্ধনের বিভিন্ন কারনের মধ্যে মুল কারন গুলো নিম্নরুপ –

ক। মালিক এবং কোম্পানী এখানে আলাদা সত্তা তার মানে আইনের চোখে মালিক এবং কোম্পানী আলাদা হিসাব (এনটিটি)।

খ।  কোম্পানীর দায়বদ্ধতাও সীমিত যা কোন মালিকের যতখানি পুজী (শেয়ার) তার বেশী নয়।

গ। মালিক বা শেয়ার হোল্ডারদের নিজস্য সম্পত্তি ব্যবসায়ীক দেনা পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তবে যদি না মালিক ব্যবসায়ীক সম্পত্তী নিজের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার  করে।

ঘ। যেহেতু এধরনের কোম্পানী বিভিন্ন আইনের দারা নিয়ন্ত্রিত, ব্যবসায়িক লেন দেন, ব্যাঙ্ক, বীমা, ট্যাক্স এবং পুজী এবং ব্যবসা সম্প্রসারনের সুযোগটা এখানে উল্লেখযোগ্য।

ঙ। নিবন্ধন প্রক্রীয়া জটিল, আইনি বাধকতা, বাধ্যতামুলক বাতসরিক হিসেবতৈরি, অডিট, ট্যাক্স রিটার্ন এই সব আধুনিক নিয়ম কানুন মেনে চলা বা পালন করা অনেক সময় সম্ভব হয় না বলে নিবন্ধিত না হয়ে সাধারন লাইসেন্স নিয়েই ব্যবসা করাতেই অনেকে সাচ্ছন্দ বোধ করে।

চ।

৭। দৈনন্দিন কার্য্যক্রম ব্যবস্থাপনা

যে উদ্দেশ্যে একটি ব্যবস্যা প্রতিষ্ঠান গঠিত হয় দৈনিক বা নিয়মিতভাবে সেই লক্ষে পরিচালনায় যাবতীয় শ্রম, মেধা এবং অর্থনৈতিক বিনিয়োগ সঠীক প্রয়োগ এর মাধ্যমে আশানুরুপ ফল অর্জন করার প্রচেষ্টা অব্যাহতভাবে বহাল রাখাই নিয়ম। এর মধ্যে রয়েছে সাফল্য এবং ব্যর্থতার চাবিকাঠী। আর এর জন্য যেটা প্রয়োজন সেটা হোল সার্বিক মনিটরীং, পুরো অবস্থান সম্বন্ধে ধারনা না নিতে পারলে এর নিয়ন্ত্রনও সম্ভব নয়।

আর মনিটরীং এর জন্য চাই সব কিছুর হিসেব রাখা। এখানে উদাহরন হিসেবে দুটো মুল কার্য্যক্রমের রেকর্ড রাখার নিয়মাবলি দেয়া হোল। ব্যবস্থাপকদের সার্বিক সচেতনতাই শুধু এদিকটা নিয়ন্ত্রন এবং বাস্তবায়ন করতে পারে। এখানে বলা ভাল আমাদের দেশে এই নিয়ন্ত্রন এর অভাবেই বেশিরভাগ উদ্যোগ বিফল হয়ে যায়, আর সাধারন উদ্দোক্তাদের এই হিসেব নিকেশের ব্যাপারটা যত জটিল এবং বাড়তি মনে করে হেলা ফেলা করবে ততই তিনি তার ব্যবসার নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলবেন।

৮। মুল্য সংযোজন এবং ব্যয় এর হিসাব

– ব্যবসা পরচালনার খরচ বা মুল্য যেমন আছে সেটা চুলচেরা ভাবে হিসেব রাখা বা মুল্যায়ন করাটা সেভাবেই জরুরি কেননা আয়ের বিপরিতে ব্যায়ের সঠিক পরিমানটা না জানলে কতখানি মুনাফা হচ্ছে আবার সেটা পুরো ব্যবসার সার্বিক খরচ মিটিয়ে উদবৃত্ত কতখানি রাখছে এবং সেটা আশানুরুপ বা বাজারের বা অর্থনৈতিক পরিমাপের পর্যায়ের নুনতম অবস্থানে থাকছে কিনা সেটা জানা যাবে না।

কোন পণ্যের বিক্রয়মুল্য নির্ধারন করার সময় তার আনুষাঙ্গীক ব্যয় গুলো নিরুপন  করাটা জরুরি। আর এটার মধ্যে কারিগরী দক্ষতার ব্যপারগুলো কঠিন হলেও সাধারনভাবে কতখানি মার্কআপ যোগ করলে এর যাবতীয় খরচ তুলে এনে প্রত্যাশিত মুনাফা বা লাভ যোগ করবে সেটা জানতে হবে। যেমন একটা পণ্য বা সেবা – যেটা কিনতে বা তৈরী করতে খরচ লেগেছে ১০০টাকা, এরপর এটা দোকান পর্যুন্ত বা গ্রাহকের কাছে পৌছানো পর্যুন্ত খরচ হয়েছে ২০ টাকা, যেটাকে বলা হয় সরাসরি সম্প্রিক্ত খরচ (ডাইরেক্ট কষ্ট), এখন মার্কআপ হবে কমপক্ষে ১২০ টাকা। বুঝতে হবে যে এর কমে বিক্রয় হলে প্রতি ইউনিটে এর যত কম তত লস প্রতি ইউনিটে। এর পরে থাকছে ব্যবসা পরিচালনার জন্য অন্নান্য আনুষাঙ্গিক খরচ যেমন অফিস বা দোকান ভাড়া, বিদ্যুত, পরিচালক এবং কর্মচারির বেতন, স্থানিয় ট্যাক্স ইত্যাদি যেগুলোকে বলা হয় অপ্রতক্ষ  বা পরোক্ষ খরচ  অথবা স্থায়ী (ফিক্সড কষ্ট) খরচ যার সঙ্গে কোন বিক্রয়কে সম্পৃক্ত করা যায় না – বিক্রি হোক বা না হোক এই সব খরচ করতেই হবে। আর এই সব খরচ মেটানোর জন্য মোট মার্ক আপএর সঙ্গে এই অঙ্কটাও যোগ না হলে লোকসান হবে, তেমনি এর উপরে যেতে না পারলে ব্যবসায় মুনাফাও করা যাবে না, লাভ হবে না।

তাহলে ব্যবসার লাভ লোকসানের হিসাব করতে গেলে মুল্যনির্ধারন (কষ্টিং) এর ব্যপারটা খুবই জরুরী। সাধারনভাবে সেটা এইভাবে বুঝতে হবে –

মোট মাসিক বিক্রয়                                          ২০০,০০০  টাকা

পণ্য বা সেবা মুল্য                ১০০,০০০

মাসিক খরচ                         ৭৫,০০০

মোট ব্যয়                                                      ১৭৫,০০০

নিট মাসিক মুনাফা                                             ২৫,০০০

এই মুনাফা অর্জন সম্ভব হয়েছে এভাবে – বিক্রীত পণ্যের সঙ্গে প্রতক্ষ (২০ হাজার = ৮০০ + ২০= ১০০,০০০) এবং পরোক্ষ বা অপ্রতক্ষ খরচ ৭৫ হাজার টাকা এবং মাসিক মুনাফা হিসেবে  ২৫ হাজার টাকাও আয় করা হয়েছে। তার মানে মুল্য নির্ধারনের সময় প্রতক্ষ, পরক্ষ এবং প্রত্যাশিত মুনাফাও যোগ করা হয়েছে বিক্রিত ৮০০ টা আইটেমে – প্রতি আইটেম ২৫০ টাকা দরে ৮০০ X ২৫০ = ২০০,০০০। এটাই সাধারন নিয়ম তবে আসলে পুরো ব্যপারটা এত সাদামাটা যেমন নয় তেমনি এত সাধারন বা সহজও নয়। কেননা চাইলেই যেমন পণ্যের দাম নির্ধারন করা যায় না তেমনি সব ব্যয় এবং আয় হিসেব মাফিক হয়না, বাজারের বা অর্থনীতির বা সরকারি পলিসির প্রভাব সব সময় থাকে। আর এজন্যই এর গুরুত্তটা উপলব্ধি করতে পারলেই শুধু একজন উদ্দোক্তা সব ধরনের সাবধানতা অবলম্বন করেই দৈনন্দিন কাজে তার হিসেবটা মেলাতে পারেন। আর সেকাজে তাকে সাহায্যের জন্য দক্ষ লোককে নিয়োগ দেন এবং তার কাছ থেকে হিসেবটা ঠিক মত বুঝিয়ে নেন।

৯।  নগদ প্রবাহ (ক্যাশ ফ্লো)

ছোট, মাঝারী বা হোক না বিরাট, সব ব্যবসায় নগদ প্রবাহ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রন করাটা গুরুত্যপুর্ন এবং বিরাট জরুরী হিসেবে মানতে এবং সেইভাবে ব্যবস্থাপনা করতে না পারলে বিরাট ঝুকি (রিস্ক) যে কোন সময় দেখা দিতে পারে। আর এই সমস্যা ছোট ব্যবসাকে খুব সহজেই হয় বন্ধ অথবা লোকসানের মধ্যে ফেলে দিতে পারে। এর মানে এই নয় যে বেচা বিক্রী ভাল চলছিল না – যেসব কারনে ক্যাশ ফ্লো সমস্যা হতে পারে

১। অতিরিক্ত নগদ উত্তোলন

২। বাকী বিক্রীর পরিমান এবং বাকী পরিশোধের সময় দুটোর পরিমান বেশি এবং দীর্ঘ্য।

২। অনাদায়ী বাকী বিক্রি (ক্রেডিট সেল)।

৩। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ষ্টক মজুদ বা নগদ টাকায় প্রচুর মজুদ করে রাখা যেটা বিক্রয় হতে বা নগদে রুপান্তরিত হতে সময় লাগবে।

৪। নগদ টাকায় সম্পদ (এসেট) কেনা যেমন – জমি, মেশিন অথবা অন্যখানে বিনিয়োগ।

৫। বড় অঙ্কের নগদ পরিশোধ –পাওনাদার, লোন অথবা কোন অগ্রিম (এডভান্স)।

৬। নগদ এবং বাকীর মধ্যে সমন্নয় হীনতা

৭। আগাম নগদ প্রবাহের কোন ধারনা না থাকা বা সেভাবে নগদ আয়োজন না করা বা করতে না পারা (ক্যাশ ফ্লো ফোরকাষ্ট)।

মনে রাখতে হবে নগদ টাকার একটা সময় মুল্যমান (টাইম ভ্যালু অফ মানি) আছে, সোজা কথায় – এই টাকাটা কোথাও খাটালে বা বিনিয়োগ করলে কিছু মুনাফা আসত আবার ঐ সময়ের জন্য ধার করলেও সুদ গুনতে হোত কাজেই সময় মুল্য মানে ন্যুনতম আয়টা (যেটা বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অন্য ব্যাংকের মধ্যে লেনদেনের যে রেট সেটাকে বেঞ্চমার্ক হিসেবে ধরা হয়) সব সময় হিসেবে রাখতে হবে।

ক্যাশ ফ্লো পরিকল্পনার সময় নগদ স্থিতির পরিমাপটা কিরকম হতে পারে তার ধারনা তৈরি করা প্রয়োজন। এই পরিকল্পনার সময় বাজার পরিস্থিতি এবং ব্যবসার নীতিগত ধারনা এবং ব্যবস্থাপনা প্রভাবিত করবে। ছোট ব্যবসার নগদ প্রবাহ হোকনা সীমিত এর পরও তাকে নিয়ন্ত্রনের মধ্যে রাখা এবং সঠিকভাবে ব্যবহার করাটা অতিব জরুরী। সাধারনভাবে এর বোঝাপড়াটা এরকম হতে পারে –

দৈনিক, সাপ্তাহিক বা মাসিক আগত (ইনকামিং) নগদ  –     

নগদ বিক্রয়                                 ৫০,০০০

বাকি আদায়                                 ৩০,০০০

দোকান ভাড়া আদায়                       ১০,০০০

সেভিংস হিসাবে মুনাফা আয়               ২,৫০০

অগ্রিম ফেরত –ডাইরেক্টর                   ৭,৫০০

মোট নগদ জমা                                                     ১০০,০০০

 

দৈনিক, সাপ্তাহিক বা মাসিক নির্গত (আউটগুইং) নগদ

ষ্টক ক্রয়  -নগদ                          ৪০,০০০

বাকী পরিশোধ               ২০,০০০

বেতন, মজুরী এবং এলাউন্স           ২০,০০০

দোকান ভাড়া                               ৫,০০০

বিদ্যুত বীল                                  ১,০০০

টেলিফোন বীল                             ১,৫০০

যাতায়াত খরচ                             ২,০০০

চা, পানি, নাস্তা                             ১,০০০

লোন কিস্তি পরিশোধ                    ১৫,০০০

মোট নগদ খরচ                                                      ১০৫,৫০০

নগদ ঘাটতি                                                             (৫,৫০০)

এই ঘাটতি পুরনের জন্য হয় ব্যাংকের কাছে যেতে হবে সুদ এর বীপরিতে কর্জ নিতে, অথবা কারো কাছ থেকে সল্প মেয়াদে ধার বা মালিক তার নিজস্য তহবীল থেকে জোগান দেবেন। আর যদি জোগানের ব্যবস্থা করা না যায় তা হলে উপরের যে কোন খরচ বকেয়া করতে হবে যেমন বেতন, দোকান ভাড়া বা লোনের কিস্তি –এর যেকোন পদক্ষেপই ব্যবসার ভাবমুর্তিতে প্রভাব ফেলবে।

এখানে বাকীটাকে আরো চুলচেরা ভাবে নিয়ন্ত্রনের সুযোগ খুজতে হবে – যেমন নগদ বিক্রয় বাড়ানো – ৫০% বাকীর যায়গায় ৪০ অথবা ৩০% করা যায় কিনা সেটার চেষ্টা করা(তাহলে আরো ১০ থেকে ২০ হাজার নগদ যোগ হতে পারে), বাকী আদায়ে আরো ১৫ দিন এগিয়ে নেয়া যায় কিনা (৫০০০ টাকা এই মাসে পাওয়া যাবে), এত গেলো ক্রয় বা পাওনাদারদের বেলায়।

দেনাদারদের বেলায়ও কিছু করা যেতে পারে – যেমন আরো ১৫ দিন বেশী বাকী রাখতে পারলে, বকেয়া পরিশোধও যদি বিলম্বিত করা যায়, লোনের কিস্তী যদি কমানো যায় সব ক্ষেত্রেই মোট পরিশোধ যোগ্য নগদ খরচের পরিমানও কমে যাবে।

দুদিকে সঠিক ব্যলেন্স করে নগদ প্রবাহের এই ধারাকে নিয়ন্ত্রনের মধ্যে রাখার এই কৌশল রপ্তকরার কাজটা সহজ নাহলেও সার্বক্ষনিক পর্য্যবেক্ষনে রাখলে যে কেউ ব্যাপারটা উতরে যেতে পারে, আর যারা একাউন্টেন্ট রাখতে পারবেন তারা একাজগুলো বুঝিয়ে নিতে পারবেন, প্রতিদিনের নগদ অবস্থান এবং আগামী ৩ অথবা ৬ মাসের নগদ প্রবাহের পুর্বাভাস তৈরী করতে পারবেন যেটা ব্যবসায়ীক সিদ্ধান্ত নিতে অত্যন্ত সহায়ক হিসেবে কাজ করবে।

সাধারনভাবে আমাদের দেশে ব্যবসার কালচারে এই সব টেকনিকাল এবং পুর্বপরিকল্পনার বিষয়গুলোকে হয় গুরুত্য দেয়া হয়না অথবা মনে করা হয় উপরি কাজ যেসব ছাড়াই কাজ চালান যায়। আর এইসব বদ্ধমুল ধারনাগুলোই আমাদের ছোট, মাঝারী সব ধরনের ব্যবসায়ীক সংস্কৃতির মধ্যে একাকার হয়ে বিরাজ করছে। অপর্যাপ্ত আইন এবং আইনের সিথিল প্রয়োগ এই সংস্কৃতিকে জিইয়ে রাখছে, অথচ পুর্ব পরিকল্পনা, বাজেট তৈরী, কাঠামোগত উন্নয়ন বা একটা পরিকল্পিত কাঠামো তৈরী, যাবতীয় হিসেব এবং তথ্য সংরক্ষন এবং এইসব হিসেব এবং তথ্যকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করে সেই মোতাবেক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা অর্জন কেবল একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে দিতে পারে ফলপ্রসু ভাবে টিকে থাকার শক্তি।

উদ্দোক্তারা এই ধ্যান ধারনা যখন আয়ত্যে আনবেন এবং সেইভাবে কাজে লাগাবেন তখনই কেবল আমাদের ছোট বা মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো এই সময়কার কঠিণ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে পারবে। বিশ্যায়নের এই যুগে শুধু আভ্যন্তরীন নয় বহির্বিশ্যের প্রতিযোগিতামুলক বাজারেও তারা নিজেদের প্রবেশ ঘটাতে পারেন যদি তারা আধুনিক ধ্যান ধারনাগুলো রপ্ত করার উদ্যোগ নেয়। নিজেদের ছোট পুজির পরিমাপে থেকেই ক্রমান্নয়ে বা ধাপে ধাপে এইসব প্রক্রিয়াগুলো তারা সামর্থের মধ্যেই কাজে লাগাতে পারে। শুধু দরকার ইচ্ছে, শৃঙ্খলা এবং  উদ্ভাবনি ভাবনা।

শারকথা – নগদ এবং বাকীর মধ্যে পার্থক্যটা সঠিকভাবে পর্যালোচনা করা এর সবল্পকালিন এবং দীর্ঘ্য মেয়াদি প্রভাব যেমন – বাকিতে কেনা মুল্য আর নগদে কেনা মুল্যের পার্থক্য, বেশী বাকি থাকায় আর নুতন বাকী না পাওয়ার সম্ভাবনা – ক্রেডিট রেটিং হ্রাস, সব বাকি সময়মত পরিশোধের জন্য নগদের যোগান এইসব আগেভাগেই একটা পরিকল্পিত ধারনার মধ্যে রাখা। একটা পরিমান পর্যুন্ত বাকী সব সময় পাওয়া যায় কিন্তু সেই বাকী সময়মত পরিশোধ করতে না পারলে তা আর পাওয়া যাবে না। তখন ক্রয় এবং বিক্রয় দুটাতেই তা প্রভাব ফেলবে। সময়মত কিনতে না পারলে তো বেচাও যাবে না, আবার বিক্রীত মালের পয়সা সময়মত আদায় না হলে পরিশাধটায় হবে না। আর নগদের এই টান তখন ব্যবসার অন্নান্য খুব প্রয়োজনিয়, যেমন ষ্টাফ বেতন, দোকান ভাড়া, লোনের কীস্তি পরশোধ সব ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে, যেটা হবে নেতিবাচক প্রভাব।

১০। ব্যবসার তথ্যাদি তৈরী এং সংরক্ষন

–যে পণ্য তৈরী বা বিক্রীর জন্য ব্যবসার সৃষ্টি, সেই ব্যবসা আবার এর পণ্য এবং দৈনন্দিন কার্যাবলির তথ্য উপাত্তও তৈরী করছে। আর এই সব তথ্যকে সঠিকভাবে সংরক্ষন এবং ব্যবহার করে ব্যবসার গতি, প্রবণতা সম্বন্ধে সম্যক ধারনা নেয়া দরকার এইসবকে নিয়ন্ত্রন করার জন্য। এইসব তথ্যকে ( data, records) আমরা দুভাগে ভাগ করতে পারি, ১। আর্থিক তথ্য ( financial data or records)২। কার্য্যপ্রনালির তথ্য (operations data or records)।

সাধারনভাবে আমরা এইভাবে বর্নণা দিতে পারি –

১। আর্থিক রেকর্ড –প্রতিদিনের আর্থিক লেনদেন এর রেকর্ড রাখতে হবে এটুকু বলার বাইরে, সবাই মানে। তবে কিভাবে রাখলে তা সঠিক রাখা হোল সেটা সহজভাবে এখানে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে তবে এর প্রয়োজনিয়তার কথা উপরে নানাভাবে বলা হয়েছে।

প্রতিদিনের আর্থিক লেনদেন দুভাবে হয়ে থাকে – ক। নগদে – নগদে কেনা বা খরচ অথবা বিক্রয়, খ, বাকীতে –কেনা বা খরচ অথবা বিক্রয়।

ক। নগদ লেনদেন এর রেকর্ড – নগদ বহিতে শুধু দৈনিক ক্যাশ আদান প্রদানের হিসেব লিপিবদ্ধ করা হয়। বইএর একদিকের পাতায় আদান বা প্রাপ্য নগদের বর্ননা অন্য পাতায় শুধু প্রদান বা খরচের বর্ননা। এই বর্ননা লিপিবদ্ধ করার সময় খাত বা প্রকারভেদ করে তা আলাদা আলাদা কলামে- ঘরে লিখা যেতে পারে এজন্য যে পরে তা ঐপ্রকারভেদে বিশ্লেষন করা যাবে সহজেই। (এর একটা সেম্পল সংযুক্ত করা হোল সহজিকরনের জন্য)।

নির্দিষ্ট ঘরে লেখার কারনে খাতওয়ারী দৈনিক বা মাসিক হিসেবটা সহজেই যোগ করে বের করা যাবে। তখন মোট ক্যাশের প্রবাহ খাত ওয়ারী হিসেবও জানা সহজ হবে। এখানে বিক্রয়, ক্রয়, ব্যংক থেকে উত্তলন বা জমা, বেতন প্রদান এরকম খাত গুলো সহজেই আলাদা ঘরে লেখা যায়। আর এইখান থেকে মাসের শেষে জানা যাবে নগদে মাসিক বিক্রয়, ক্রয়, খরচ, প্রাপ্তি বা সংগ্রহ, অন্নান্য আদান প্রদান ব্যংকের ব্যালেন্স সব কিছু। এইসব রেকর্ডকে ব্যবহার করেই মাসিক বা বাতসরিক নগদ প্রবাহের উপর বিশ্লেষন ( analysis) তৈরী করা যেতে পারে। আবার যেকোনো সময়ে ক্যাশে কত টাকা বা ব্যাংকে কত টাকা আছে এই রেকর্ড থেকেই তা সহজে জানা যাবে। আরো জানা যাবে এই মাসে দেনাদার রা কত টাকা পরিশোধ করেছে বা বাকি বিক্রীর কত আদায় করা গেছে, পাওনাদার দেরকে কত টাকা দেয়া হয়েছে।

খ। বাকী লেনদেন এর হিসেব – বাকী বহিতে যাবতীয় বাকী লেনদেনএর হিসেব লিখে রাখা হয়। বাকীতে বিক্রয় বা ক্রয় এর হিসেব আলাদা আলাদা বইএ লেখাটাই সুবিধা। ক্রয় বই, বিক্রয় বই এবং খরচ বই। এই তিন বই এর মাধ্যমে ব্যবসার যাবতীয় হিসেব সংরক্ষন এবং নিয়ন্ত্রন করা যায় নগদ বইএর পাশাপাশি।

ক্রয় বইএ যেমন আলাদা আলাদা ঘরে বিক্রেতাদের – দেনাদার, বিক্রয় বইএ তেমনি ক্রেতাদের নামে নামে ঘরে হিসেব রাখা যেতে পারে। মাসের শেষে এইসব ঘরের যোগফল বলে দেবে ঐ মাসে বাকীতে মোট ক্রয় বা বিক্রয় এবং খরিদ্দার এবং পাওনাদারদের মোট হিসাব।

তবে খাতওয়ারী এই হিসাবটা সম্পুর্ন হবে তখনই যখন নগদ এবং ক্যাশ দুটো মিলেই একটা পুর্ন হিসেব তৈরি করা হবে। আর এর জন্য যেটা করতে হবে সেটা সপ্তাহ বা মাসের শেষে সম্পুর্ন আলাদা বইএ খাতওয়ারী হিসেব খোলা যেখানে তারিখ দিয়ে নগদ এবং বাকী সব হিসেবই নগদ এবং বাকী বই থেকে এখানে লিখে রাখতে হবে। একটু জটিল মনে হলেও একজন সাধারন একাউন্টেন্টএর জন্য এটা সহজ। তবে একজন উদ্দোক্তা তার উদ্ভাবনি শক্তি দিয়ে এই সব কারিগরী দিকও সহজেই রপ্ত করতে পারেন। কেননা একজন পাওনাদার বা দেনাদারের আপটুডেট (হাল নাগাদ) হিসেব রাখা ক্যাশ কন্ট্রোল বা সার্বিক ব্যাবসার ব্যাবস্থাপনার জন্য খুবই জরুরী।

২। কার্যপ্রনালির তথ্য বা উপাত্ত বা অপারেশনাল রেকর্ড -মোটামুটিভাবে এইসব বই থেকেই তথ্য নিয়ে ব্যবসার গতি প্রকৃতি বোঝার জন্য বিভিন্নভাবে বিশ্লেষন করা হয়। এই বিশ্লেষন থেকে জানা যায় কি ধরনের আইটেম বেশি অথবা কম বিক্রী হচ্ছে। কোন সময়ে বা এই মাসে কোন আইটেম বা সার্ভিস কত বিক্রী হোল সেটা গত মাসের থেকে কম নাকি বেশী। এই ভাবে বিভিন্ন ধরনের পণ্যের বিক্রী, ক্রয়, ব্যবহার এর উপর পরিসংখান তৈরী করা যায় যা শুধু ব্যবসার গতি প্রকৃতিই নয় আগামী দিনের ব্যবসায়ীক পরিকল্পনা তৈরীতেও করতে পারে সাহায্য। আধুনিক ব্যবস্যা ব্যবস্থাপনায় সঠিক পরিসংখানের সঠিক ব্যবহার খুব অপরিহার্য্য। একজন আধুনিক উদ্দোক্তাই কেবল এইসব দিকগুলো খেয়ালে রেখে অত্যন্ত প্রতিযোগিতার এইযুগে সম্পুর্ন তথ্য উপাত্য হাতে নিয়েই কেবল হাল ধরতে পারেন ব্যবস্যার।

 

এইসব বই থেকেই তৈরী করা হয় লাভ লোকসানের হিসেব (প্রফিট এন্ড লস একাউন্ট), ব্যালেন্স শীট যেটা মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষান্মাসিক বা বাতসরিক হিসেবে তৈরী করা হয়। যদি ঘন ঘন তৈরী করা যায় তবে ব্যবসার প্রবনতা বা ট্রেন্ডটা বোঝা যাবে এবং সহজেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো নেয়া এং বদলানো যায়।

যেহেতু লাভ লোকসানের হিসেবটা মোটামূটিভাবে কারগরী ব্যাপার এং সহজীকরন সহজ নয় কাজেই এখানে তা উল্লেখ করা হচ্ছে না। আগ্রহী উদ্দোক্তা তার বা কোন একাউন্টেন্ট এর কাছে এর খুটিনাটি জেনে নিতে পারেন। এখানে কিছু বাপার টিপস হিসেবে দেয়া হোল।

মোট মাসিক আয় এর থেকে মোট মাসিক খরচ বিয়োগ করলে বা বাদ দিলেই লাভ পাওয়া যায় তবে সেটা সঠিক লাভ বা লোকসান নয় বা সম্পুর্ন হিসেব নয়।

এখানে মনগড়া হিসেব তৈরীর কোন সুযোগ নেই, কেননা হিসেব তৈরীর সময় কতগুলি একাউন্টিং নিয়ম আছে যেগুলো আইন দারা নিয়ন্ত্রন হয় কাজেই সেই হিসেবি লাভ লোকসান বা ব্যালেন্স শীট তৈরী করাটাই নিয়ম।

একজন উদ্দোক্তা হয়ত নগদ এবং বাকী বই থেকে তুলে লাভ লোকসানের হিসেব করবে এই ভেবে যে সব হিসেব তো সারা মাস ধরে ঠিকভাবেই লেখা হয়েছে এই সব বইএ। কিন্তু এখানে হিসেবে আনতে হবে কীছু খরচ এখনো বাকী আছে, যেমন বিদ্যুত বীল এই মাসের, দোকান রিপেয়ার বা সাজানোর বীলটা এখনো দেইনি বা পয়সা দেয়া হয়নি। এই মাসের ব্যাংকএর সুদ বা পৌর ট্যাক্স বা যাকিছু এই মাস বা পিরীওডের জন্য যা এখনও দেয়া হয়নি এবং কোন বইএ লেখা হয়নি (যাকে একাউন্টিং এর ভাষায় বলা হয় – এক্রুয়াল বাংলায়- উপচিতি)।

আবার ক্যাশ বই থেকে আগামী ৬ মাসের অগ্রিম দেয়া দোকানভাড়াও এখানে যোগ হয়ে আছে – যেটাকে প্রিপেমেন্ট বলে। আর আছে একজন সাপ্লাইয়ারকে অগ্রিম দেয়া হয়েছে অথচ সেই পন্য বা মাল আসতে আরো দুইমাস দেরী, সেটা কি মাসিক ক্রয়? না। একজন কর্মচারী জরুরী প্রয়োজনে অগ্রিম বেতনও নিয়েছেন- সেটা কি ঐ মাসের বা সময়ের খরচ? মালিকও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে মোটা অংক তুলে নিয়েছেন।  এই সবকি খরচের মধ্যে নেয়া যাবে? যাবে না, কেননা এই সব খরচ এই মাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, আবার কোনা গুলো খরচ হিসেবে গন্যও করা যাবে না- যেমন এডভান্স বা মালিকের ক্যাশ উত্তোলন। তাহলে এগুলো তো বাদ দিতে হবে, তাই নয়কি। আবার বাদ দিলে কোন হিসেবে সেগুলো দেখানো যাবে?

অবিক্রিত মাল এর হিসেবটাতো বইএ তোলা হয়নি। আবার কিছু পণ্য ফেরত এসেছে খারাপ বলে, যেগুলো অল্পদামে বিক্রয় করা যাবে। কিছু পণ্য নষ্ট হয়ে গেছে পরিবহন এবং উঠা নামার সময়। জটিলতাগুলো এইসব যায়গায়। যেগুলো হিসেব করবার একধরনের নিয়ম তৈরী করাই আছে যেগুলো শুধু একাউন্টেন্টরাই পড়েছে তাদের ডিগ্রি নেয়ার সময়।

ব্যবসা যতই বাড়বে এইসব ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগও ততই বাড়বে, কাজেই সঠিকভাবে হিসেব রাখাটা সবদিক দিয়েই জরুরী, নিয়ম এবং প্রয়োজন।

১১। ব্যবসায়ীক সফলতা বা ব্যর্থতার মাপকাঠী

যে কোন ব্যবসার উল্লেখযোগ্য সফলতার মাপকাঠী হবে একই রকম অন্য ব্যবস্যা প্রতিষ্ঠানের তুলনায় তার সফলতার পরিমান। সারা বছর ধরে মোটামুটি একই রকম ফল ধরে রাখা, বা কঠিন অথবা খারাপ সময়ে হাল ধরে রাখা এইসবেই রয়েছে একজন ভাল উদ্দোক্তার কৃতিত্য।

আর কৃতিত্য বা ব্যর্থতার এই হিসেবকে মাপকাঠী ধরে নিয়মিতভাবে কিছু রিপোর্ট তৈরী করতে হবে যা একটা তুলনামুলক কৃতকার্যের বিবরন তুলে ধরবে।

এই সব রিপোর্ট যেমন ব্যবসার সাধারন নিয়মের মধ্যে নিয়মিত হিসেবে তৈরি করতে হবে তেমনি এইসব জটিল কোন পরিসংখান হবে তাও নয়। যেমন গত ঈদে এই আইটেমটার বিক্রী ছিল ৫০০০ ইউনিট, তার আগের বছর ছিল ৪৫০০, এবার ৬০০০ অথবা ৫৫০০ নিশ্চ্যয় ভাবা যায়। সেটা করা সহজ হবে যদি এর ঐতিহাসিক রেকর্ড থাকে বিগত সময়ের। ঠিক ঈদের পর ঐ আইটেমটা কত পীস বিক্রী হোল তা জানলে একটা তুলনামুলক ধারনা পাওয়া যাবে এবং এর পিছনের কারন গুলোও অনুধাবন করতে সুবিধা হবে।

শেষ কথা

মনে রাখতে হবে ব্যবসা পরিচালনা জটিল ব্যাপার, কেউ সহজেই এর থেকে ভাল কিছু আশা করলে ভুল হবে কেননা এখানে অনেক উপাদান নিহিত থাকে সেটা ব্যবসা পরিচালনা হোক আর বাজার ব্যবস্থাপনাই হোক, আর এসব কিছুকে উপলব্ধি করলেই কেবল নিয়ম মাফিক তা নিয়ন্ত্রন করা যাবে। আর এখানে সেই উপলব্ধিটাকেই জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। একজন সত্যিকারের উদ্দোক্তাই কেবল সব সময় চাইবে তার কষ্টের পুজিকে সব সময় রক্ষা করতে সব রকম চেষ্টা দিয়ে কেননা এর সংগে শুধু তার উচ্চাকাংখাই জড়িত নয় আছে তার ভবিষ্যত এবং ভালভাবে বেচে থাকার চাবিকাঠি।