রোজা কী ও কেন

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৩:০৫ অপরাহ্ণ, মে ২২, ২০১৮ | আপডেট: ৩:০৫:অপরাহ্ণ, মে ২২, ২০১৮
রোজা কী ও কেন

সিয়াম শব্দের সাধারণ অর্থ হচ্ছে বিরত থাকা। তাইতো চুপ বা নিস্তব্ধ থাকাকে সিয়াম বলে। আর যে ব্যক্তি চুপ থাকে তাকে সায়েম বলে। আল্লাহ তায়ালা হযরত মরিয়ম আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘটনা তুলে ধরে বর্ণনা করেন, ফাইম্মা তারাইন্না মিনাল বাশারি আহাদান ফাকুলি ইন্নি নাজারতু লির রাহমানি সাওমান ফালান উকাল্লিমাল ইয়াওমা ইনসিয়ান।

অর্থ : (সন্তান ভূমিষ্ঠের পর) যদি মানুষের মধ্যে কাউকে তুমি দেখ (কোনো প্রশ্ন বা কৈফিয়ত করতে) তবে তুমি বলো, ‘আমি দয়াময় আল্লাহর উদ্দেশে সাওম বা রোজা (কথা বলা থেকে বিরত থাকতে) মানত করছি। সুতরাং আজ আমি কিছুতেই কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলবো না। (সুরা মারইয়াম : আয়াত ২৬)

[কোরআন কারিমের এ আয়াতের শিক্ষনীয় ঘটনা : হযরত মরিয়ম আলাইহি ওয়া সাল্লামের গর্ভে সন্তান জন্ম লাভের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, শিশুর ব্যাপারে তোমার কিছু বলার প্রয়োজন নেই। তার জন্মের ব্যাপারে যে কেউ আপত্তি তুলবে তার জবাব দেবার দায়িত্ব এখন আমার (আল্লাহর)। উল্লেখ্য, বনি ইসরাঈলের মধ্যে মৌনতা বা কথা বলা থেকে বিরত থাকার পদ্ধতি অবলম্বনের রোজা রাখার রীতি ছিল।]

বলা বাহুল্য এখানে ‘সওম’ এর অর্থ হলো কথা বলা থেকে বিরত থাকা।

শরিয়তের পরিভাষায় সাওম বা সিয়াম হলো- ফজর তথা সূর্যোদয়ের পূর্ব থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, স্ত্রী-সঙ্গম, অশ্লীলতা ও অসার ফাহেশা কথা-বার্তাসহ ইত্যাদি যাবতীয় রোযা নষ্টকারী কাজ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহর বন্দেগি করা।

কারণ প্রিয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকার নামই সিয়াম নয়; বরং অসারতা ও অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকার নামই হলো (প্রকৃত) সিয়াম। সুতরাং যদি তোমাকে কেউ গালাগালি করে অথবা তোমার প্রতি মুর্খতা দেখায়, তাহলে তুমি (তার প্রতিকার বা প্রতিশোধ না নিয়ে) তাকে বলো যে, আমি সায়েম, আমি রোযা রেখেছি, আমি রোযা রেখেছি। (মুস্তাদরেকে হাকেম, ইবনে হিব্বান, সহিহুল জামেইস সাগির)

পূর্ববর্তী ধর্মে সিয়াম বা রোজা
মানুষের জন্য রমজান মাসের সিয়াম বা রোজাই প্রথম রোজা নয়। কারণ, সিয়াম বা রোজা হলো এমন এক ইবাদত, যা মানুষ সৃষ্টির পর থেকেই আল্লাহ তায়ালা বান্দার জন্য ফরজ করেছেন। যা আমরা কুরআনুল কারিমে পাই।

আল্লাহ বলেন, ইয়া আইয়্যুহাল্লাজিনা আমানু কুতিবা আলাইকুমুস সিয়ামু কামা কুতিবা আলাল্লাজিনা মিন ক্বাবলিকুম লাআল্লাকুম তাত্তাকুন। (সুরা বাক্বারাহ : আয়াত ১৮৩) অর্থ : হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমনিভাবে তোমাদের পূববর্তী উম্মতের ওপর ফরজ করা হয়েছিল। যাতে তোমরা পরহেজগার হতে পার।

এ থেকে বোঝা যায়, পূর্ববর্তী সকল উম্মতের জন্য রোজা ফরজ ছিল। ইয়াহুদি ও খ্রিস্টানরা নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট জিনিস তেকে বিরত থেকে রজিা পালন করতেন। তাওরাত ও ইঞ্জিলের বর্তমান সংস্কারগুলো থেকেও জানা যায় যে, আল্লাহ তায়ালা রোজাকে পূর্ববর্তী বান্দাদের ওপর ফরজ করেছিলেন।

হযরত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় আগম করলেন, তখন দেখলেন, মদিনার ইয়াহুদিরা আশুরার দিনে রোজা পালন করছে। তখন তিনি তাদের জিজ্ঞাস কররেন, ‘এটা কি এমন দিন যে, তোমরা রোজা রাখছ?’ ইয়াহুদিরা বললো, ‘এ এক মহান দিন। এ দিনে আল্লাহ তাআলা মুসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার কাওমকে পরিত্রাণ দিয়েছিলেন এবং ফিরাউন ও তার কাওমকে পানিতে ডুবিয়ে ধ্বংস করেছিলেন। তাই মুসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যেই এই দিনে রোজা পালন করেছিলেন। আর তাইতো আমরাও এ দিনে রোজা পালন করি।

এ কথা শুনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘মুসার স্মৃতি পালন করার ব্যাপারে তোমাদের চাইতে আমরা অধিক হকদার।’ সুতরাং তিনি ওই দিনে রোজা রাখলেন এবং সবাইকে রোজা রাখতে নির্দেশ দিলেন। (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।

আমরা কেন রোজা রাখবো?
মহান আল্লাহর অপার অনুগ্রহ যে, তিনি বান্দার ওপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পর্যাযে আদেশ-নিষেধ, উপদেশ-ইতিহাস আরোপ করেছে। তার মধ্যে বহু বিষয়কেই পর্যায়ক্রমে ফরজ তথা আবশ্যকীয় এবং হারাম তথা বর্জনীয় করেছেন। অনুরূপ একটি ফরজ হচ্ছে রমজান মাসের সিয়াম বা রোজা। যা তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর পর্যায়ক্রমে কিছু কিছু করে ফরজ করেছেন।

রোজা ফরজ হওয়ার শর্তসমূহ।

রমজান শুরু হয়ে গেছে, প্রত্যেক মুসলমানের দরজায় কড়া নাড়ছে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সঠিকভাবে রোজা রাখার তৌফিক দিন এবং আমাদের রোজা এবং আমলসমূহ কবুল করুন।
রোজা ফরজ হওয়ার দলিল:
পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পার। [২:১৮৩]

أَيَّامًا مَّعْدُودَاتٍ ۚ فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ ۚ وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍ ۖ فَمَن تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ ۚ وَأَن تَصُومُوا خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ

গণনার কয়েকটি দিনের জন্য অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে, অসুখ থাকবে অথবা সফরে থাকবে, তার পক্ষে অন্য সময়ে সে রোজা পূরণ করে নিতে হবে। আর এটি যাদের জন্য অত্যন্ত কষ্ট দায়ক হয়, তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাদ্যদান করবে। যে ব্যক্তি খুশীর সাথে সৎকর্ম করে, তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি রোজা রাখ, তবে তোমাদের জন্যে বিশেষ কল্যাণকর, যদি তোমরা তা বুঝতে পার। [২:১৮৪]

বিশ্লেষণ:
আলোচ্য আয়াতদ্বয়ে এই উম্মতের ঈমানদারগণকে উদ্দেশ্য করে আল্লহতায়ালা রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করেন। রোজা হলো একমাত্র আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির জন্য পানাহার ও যৌনাচার হতে বিরত থাকা। এর দ্বারা আত্নার পরিশুদ্ধি ও স্বভাবের পরিমার্জনা অর্জিত হয়।আল্লাহতায়ালা এই নির্দেশের সাথে সাথে আরো বলেন-তোমাদের পুর্ববতী উম্মতগণের ওপর ও রোজা ফরজ করা হয়েছিলো।তারা তা পালন করতে যত্নবান ছিলো। আল্লাহতায়ালা অন্য আয়াতে বলেন-

 আমি তোমাদের প্রত্যেকের জন্য পথ ও পদ্ধতি নির্ধারন করে দিয়েছি।যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন অবশ্যই সকলকে একই উম্মত করে দিতেন।কিন্তু তোমাদেরকে যা কিছু তিনি দিয়েছেন তা দ্বারা তোমাদেরকে পরীক্ষা করার উদ্দেশ্য। অতএব তোমরা ভালো কাজে প্রতিযোগিতার সাথে অগ্রসর হও।

হাদীস থেকে ব্যাখ্যা:
”গণনার কয়েকটি দিনের জন্য অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে, অসুখ থাকবে অথবা সফরে থাকবে, তার পক্ষে অন্য সময়ে সে রোজা পূরণ করে নিতে হবে। আর এটি যাদের জন্য অত্যন্ত কষ্ট দায়ক হয়, তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাদ্যদান করবে।”এ নির্দেশ আসার পর সাহাবীগনের কেউ কেউ সাওম পালনে সক্ষম হওয়ার পরও তাদের কেউ কেউ সাওম ত্যাগ করে একদিনের পরিবর্তে মিসকিনকে খাওয়াতো।এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ”আর সাওম পালন করাই তোমাদের জন্য উত্তম” এ আয়াতটি নাযিল হয় যা পূর্বের হুকুমকে রহিত করে এবং সবাইকে সাওম পালনেরই নির্দেশ দেয়া হয়। [রেফারেন্সঃ বুখারী, হাদিস নং: ১২৮১]

রোজা কি?
রোজা শব্দটি ফার্সি শব্দ আমরা আরবী শব্দ থেকে বলছি সিয়াম অর্থ হচ্ছে রোজা। সিয়াম শব্দটি এসেছে সাওম থেকে যার অর্থ বিরত থাকা। পারিভাষিক অর্থে সুবহে সাদিক থেকে সুর্যাস্ত না হওয়া পর্যন্ত সমস্তপ্রকার খাদ্যদ্রব্য, পানিয়দ্রব্য থেকে বিরত থাকা ।

রোজা কার জন্য ফরজ?

রোজা কাদের উপরে ফরজ সে বিষয়ে আলোচনা করছি। রোজা ৮ শ্রেণী মানুষের ওপর ফরজ।

১. মুসলমান হওয়া।

মুসলিম ব্যক্তির জন্য রোজা রাখা ফরজ। রোজা কোন অমুসলিমের জন্য ফরজ নয়।

২. বালেগ হওয়া।

নাবালগের ওপর রোজা ফরজ নয়, অর্থাৎ ১২ বৎসর বয়সের কম বয়স হলে রোজা ফরজ হবেনা।

৩. সুস্থব্যক্তি হওয়া।

শারীরিক ভাবে অসুস্থ ব্যক্তির জন্য রোজা রাখার নিয়ম নাই। তবে সাধারন অসুখ বিসুখ হলে যদি সে রোজা রাখার উপযোগী হয় তবে সে রোজা রাখতে পারবে।

৪.সুস্থ মস্তিস্কের অধিকারী হওয়া।

পাগলের ওপর রোজা ফরজ নয়।

৫.স্বাধীন হওয়া।

পরাধীন নয় এমন ব্যক্তি হওয়া।

৬.সজ্ঞান হওয়া।

অর্থাৎ যিনি রোজা রাখবেন তিনি নিজ জ্ঞানে বা স্বেচ্ছায় আল্লাহর হুকুম পালন করবেন।
৭.মুকিম হওয়া।
অর্থাৎ স্তায়ীবাসিন্দা হওয়া। মুসাফিরের ওপর রোজা ফরজের ব্যপারে একটু ভিন্নতা আছে। যেমন কষ্টসাধ্য ভ্রমন হলে পরবর্তীতে রোজা আদায়ের বিধান আছে। আমি মনে করি বর্তমানে সফর অনেক আরামের সাথে করা যায় তাই সফর অবস্থায় একমাত্র কাহিল হয়ে না পড়লে রোজা রাখা উচিৎ।

৮.তাহীরা

অর্থাৎ পবিত্রতা
হায়েজ-নেফাস মুক্ত হতে হবে।

শেষ কথা
অনেকদিন আগে পড়েছিলাম প্রায় ১২ বৎসর আগে। প্রয়োজনীয় বইপত্র সংগ্রহে না থাকায় লেখাটা সংক্ষিপ্ত আকারে দিতে হচ্ছে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের রোজাসমুহকে কবুল করুন।আমীন