রোহিঙ্গা শিশুদের মুখে হাসি, কিন্তু চোখে শূন্যতা দেখতে পেলেন প্রিয়াঙ্কা

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৩:৪২ পূর্বাহ্ণ, মে ২২, ২০১৮ | আপডেট: ৩:৪৪:পূর্বাহ্ণ, মে ২২, ২০১৮
রোহিঙ্গা শিশুদের মুখে হাসি, কিন্তু চোখে শূন্যতা দেখতে পেলেন প্রিয়াঙ্কা

প্রিন্স হ্যারি ও মেগান মার্কেলের প্রথা ভাঙার বিয়েতে উপস্থিত থেকে কয়েক দিন ধরে খবরের শিরোনামে থাকা সাবেক বিশ্বসুন্দরী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া রোহিঙ্গা শিশুদের দেখতে এসেছেন বাংলাদেশে। তিনি কক্সবাজারের টেকনাফের বাহারছড়ার শামলাপুর মনখালি ব্রিজের পাশে অস্থায়ী রোহিঙ্গা শিবিরে গিয়ে শিশুদের সঙ্গে সময় কাটান। অনেক শিশু তাঁকে কাছে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা যেমন হয়েছে, আবার কেউ কেউ চোখের পানিও ফেলেছে।

জাতিসংঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) শুভেচ্ছাদূত হিসেবে বাংলাদেশে এসেছেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। অস্থায়ী রোহিঙ্গা শিবিরে শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানোর পরই প্রিয়াঙ্কা বলেছেন, বর্ষার মৌসুম শুরু হয়ে যাচ্ছে…তারা হুমকিতে আছে। এই প্রজন্মের শিশু সন্তানদের ভবিষ্যৎ নেই। আমি তাদের মুখে হাসি দেখেছি, কিন্তু তাদের চোখে শূন্যতাও দেখতে পেয়েছি। এই ছেলেমেয়ের জীবন মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বেরও তাদের (শিশু) যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। তাদের সাহায্য করারও আহ্বান জানিয়েছেন কোয়ানটিকো তারকা।

রোহিঙ্গা শিশুদের সঙ্গে কথা বলছেন বলিউড অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। ছবি: প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার ইনস্টাগ্রাম থেকে নেওয়া।মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের পর রাখাইন থেকে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এদের শতকরা ৬০ জনই শিশু। টেকনাফের অস্থায়ী রোহিঙ্গা শিবিরে এই শিশুদের দেখার পরই ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ ও ইনস্টাগ্রামে জনপ্রিয় তারকা লিখেছেন, ‘পালিয়ে বাংলাদেশে আসার কয়েক মাস পরেও তারা এখনো অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্য আছে। তারা জনবহুল ক্যাম্পের মধ্য থাকছে। কোনো ধারণাই নেই কত দিন এভাবে তাদের থাকতে হবে…এমনকি অবস্থা আরও খারাপের দিক যাচ্ছে। প্রথম দিকে তারা ওয়াকিবহাল ছিল না পরের খাবার কখন আসবে এবং…অবশেষে কিছুটা নিরাপত্তার মধ্য আছে, এমন অনুভূতি তাদের হচ্ছে। এদিকে বর্ষার মৌসুম শুরু হয়ে যাচ্ছে…তাদের (রোহিঙ্গারা) এখন পর্যন্ত যা বানিয়ে দেওয়া হয়েছে বা তারা বানিয়েছে, তা-ও হুমকিতে আছে। একটি প্রজন্মের শিশুসন্তানদের ভবিষ্যৎ নেই। আমি তাদের হাসি ও তাদের চোখে শূন্যতা দেখতে পেয়েছি।’

হলিউড ও বলিউডের জনপ্রিয় তারকা প্রিয়াঙ্কা চোপড়া আরও লিখেছেন, এ ছেলেমেয়েদের জীবন মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের আমাদের সাহায্য নিদারুণভাবে প্রয়োজন। বিশ্বেরও তাদের (শিশু) যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। আমাদেরও শিশুদের যত্ন নিতে হবে। এই বাচ্চারাই আমাদের ভবিষ্যৎ। তাদের সাহায্য করারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

এর আগে সোমবার সকাল আটটায় ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামেন বলিউড তারকা প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। এখানে ঘণ্টা তিনেক অবস্থান করার পর তিনি ইউএস-বাংলার একটি উড়োজাহাজে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দেন। কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে প্রিয়াঙ্কাকে উখিয়ায় রয়েল টিউলিপ হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। কক্সবাজার পুলিশের বরাত দিয়ে প্রথম আলোর প্রতিনিধি আব্দুল কুদ্দুস জানান, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া এখানে চার দিন থাকবেন।

ঢাকায় নেমেই ফেসবুক নিজের ভেরিফায়েড পেজে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া লিখেছেন, ‘রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু ক্যাম্পে যাচ্ছি। আমার ইনস্টাগ্রামে সেখানকার সব অভিজ্ঞতা শেয়ার করব। আমাকে সেখানে অনুসরণ করতে থাকুন। এ বিষয়টি নিয়ে বিশ্বের ভাবা উচিত। ভাবতে হবে আমাদেরও।’

অনেক শিশু প্রিয়াঙ্কা চোপড়াকে কাছে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়েছেন। কিন্তু আবার কেউ কেউ অবাক চোখেও দেখছে ইউনিসেফে শুভেচ্ছাদূত প্রিয়াঙ্কা চোপড়াকে। ছবি: প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার ইনস্টাগ্রাম থেকে নেওয়া।‘প্লিজ, কাউকে সরাবেন না, ধাক্কা দেবেন না’
আমাদের টেকনাফ প্রতিনিধি জানান, বেলা সাড়ে তিনটা নাগাদ সড়কপথে কক্সবাজার থেকে প্রিয়াঙ্কা চোপড়াকে টেকনাফের বাহারছড়ার শামলাপুর মনখালি ব্রিজের পাশে অস্থায়ী রোহিঙ্গা শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় তাঁর পরনে ছিল কালো জিনসের প্যান্ট, টি-শার্ট আর মাথায় স্কার্ফ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ইউনিসেফ ও স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এখানকার রিফাত হোসেন নামের এক শিশুকে বাংলায় তিনি বলেন, ‘তোমাদের এখানে আমাকে ঘোরাবে?’ মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় রোহিঙ্গা শিশু রিফাত। এরপর তার হাত ধরে রোহিঙ্গা শিবিরে হাঁটলেন এই বলিউড তারকা।

প্রিয়াঙ্কা চোপড়া আসছেন, খবরটি আগে থেকেই রটে যায়। তাই অতিথিদের গাড়ি এসে থামতেই ভিড় করেন রোহিঙ্গা শিবিরে থাকা মানুষজন। সঙ্গে আরও আসেন স্থানীয় অধিবাসীরা। যে তারকাকে সবাই দেখেছেন হিন্দি চলচ্চিত্রে, তাঁকে কাছ থেকে এক নজর দেখার জন্য সবার চেষ্টা। মুহূর্তেই ভিড় বেড়ে যায়। প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আগে থেকেই পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় সেখানে। পুলিশ ধাক্কা দিয়ে আর লাঠিপেটা করে সবাইকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু তাতে বাধা দেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। পুলিশকে অনুরোধ করেন, ‘প্লিজ, কাউকে এভাবে সরাবেন না। ধাক্কা দেবেন না।’

প্রিয়াঙ্কা চোপড়া এ সময় আরেকটি শিশুর সঙ্গে কথা বলেন। বাংলায় ছেলেটিকে তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমার নাম কী?’ ছেলেটি বলল, মো. রফিক। ‘তুমি স্কুলে যাও?’ ছেলেটি মাথা নেড়ে বলল, যাই।

প্রিয়াঙ্কা চোপড়াকে নিয়ে যাওয়া হয় ইউনিসেফ পরিচালিত হাসপাতালে। এ সময় হাসপাতালের ভেতরে বাইরের কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। জানা গেছে, প্রিয়াঙ্কা সেখানে রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন। হাসপাতালের চিকিৎসকদের কাছে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের ব্যাপারে খোঁজখবর নেন। পানিবাহিত রোগের ব্যাপারেও জানতে চান। এ সময় তাঁকে জানানো হয়, এই অস্থায়ী শিবিরে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।

বিকেল ৪টা ০৭ মিনিটে প্রিয়াঙ্কা গাড়িতে গিয়ে ওঠেন। যাওয়ার আগে হাত নাড়িয়ে সবার কাছ থেকে বিদায় নেন। বাংলায় বললেন, ‘আবার আসব।’

বৃহস্পতিবার কক্সবাজার ত্যাগ করবেন প্রিয়াঙ্কা
প্রিয়াঙ্কার সফরসূচি থেকে জানা গেছে, তিনি টেকনাফের হাড়িয়াখালী যাবেন। এই এলাকা দিয়ে মিয়ানমার থেকে অনেক রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শিবির, উখিয়ার কুতুপালং ও জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্প, টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের কথা রয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে কক্সবাজার ত্যাগ করবেন এই বলিউড তারকা।

প্রিয়াঙ্কা চোপড়া ১৯ মে ব্রিটিশ রাজপরিবারের আমন্ত্রণে প্রিন্স হ্যারি আর মেগান মার্কেলের রাজকীয় বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন। সেখান থেকে তিনি দুবাই হয়ে এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজে ঢাকায় এসেছেন।

  • প্রথম আলো