চাপে আওয়ামী লীগ, নির্ভার বিএনপি

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৪:১৫ পূর্বাহ্ণ, মে ২১, ২০১৮ | আপডেট: ৪:১৫:পূর্বাহ্ণ, মে ২১, ২০১৮
চাপে আওয়ামী লীগ, নির্ভার বিএনপি

সদর আর পাশের রাজনগর উপজেলা নিয়ে মৌলভীবাজার-৩ সংসদীয় আসন। এই আসনে বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। দল দুটির সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোতেও এর প্রভাব রয়েছে।

 

দলীয় সূত্রে জানা যায়, গত বছর সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি ঘোষণার পর আওয়ামী লীগে ঐক্যের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু কয়েক দিন পর জেলা কমিটির প্রথম সভায় বর্তমান সংসদ সদস্যসহ একটি অংশ ওয়াকআউট করে। এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে যায় যে জেলা আওয়ামী লীগের গ্রুপিংয়ের রাজনীতির অবসান হয়নি।

অন্যদিকে বিএনপিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বাধীন দুটি গ্রুপ আলাদা কর্মসূচি পালন করে। গত ৮ এপ্রিল মৌলভীবাজার শহরতলির একটি রিসোর্টে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের (ডাকসু) সাবেক সহসভাপতি (ভিপি) আমান উল্লাহ আমানের উপস্থিতিতে প্রতিনিধি সমাবেশে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এক মঞ্চে বসেছিলেন। তার পরও দলীয় কোন্দল দূর হয়নি।

আগামী সংসদ নির্বাচনে এই আসনে দুই দলেই একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী আলোচনায় আছেন। তবে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে এম নাসের রহমানের নাম ঘোষণা করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। তিনি সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের ছেলে। এদিক থেকে তিনি মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থায় আছেন।

 

উল্লেখ্য, মৌলভীবাজার-৩ আসনটি মূলত বিএনপির ঘাঁটি বলেই পরিচিত ছিল। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য এম সাইফুর রহমান ছিলেন এখানকার নেতা। তিনি রাজনীতিতে আসেন জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। চারবার তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জিয়ার মন্ত্রিসভায় প্রথমে বাণিজ্যমন্ত্রী এবং পরে অর্থমন্ত্রী হন। জাতীয় সংসদে তিনি ১২টি বাজেট পেশ করেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ মহসীন আলীর কাছে পরাজিত হন সাইফুর রহমান। পরের বছর সাইফুর রহমান মারা যান। ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবার সংসদ সদস্য হন মহসীন আলী। পরের বছর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। পরে উপনির্বাচনে তাঁর সহধর্মিণী সৈয়দা সায়রা মহসীন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

 

আওয়ামী লীগ : নির্বাচনী এলাকা ঘুরে জানা গেছে, মৌলভীবাজারে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে দুটি বলয় তৈরি হয় ১৯৯৮ সালে। একপক্ষে ছিলেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান। অন্য পক্ষে ছিলেন প্রয়াত সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী। ২০০৬ সাল থেকে আজিজুর রহমান বলয়ের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন সে সময় জেলা কমিটির নির্বাচিত সভাপতি আব্দুস শহীদ ও সাধারণ সম্পাদক নেছার আহমদ। অন্য পক্ষে ছিলেন সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে সৈয়দ মহসিন আলী ও আবদুল অদুদ (বর্তমান প্রয়াত)। মহসিন আলীর মৃত্যুর পর এই পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সৈয়দা সায়রা মহসিন।

গত ২৮ অক্টোবর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে সৈয়দা সায়রা মহসিন বলয়ের একাধিক নেতা প্রার্থী হন। এই সুযোগে নেছার আহমদ ও তাঁর অনুসারী মিছবাহুর রহমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হয়ে যান। কিন্তু দলীয় ঐক্য অর্জন সম্ভব হয়নি এখনো।

 

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন, বর্তমান সংসদ সদস্য সৈয়দা সায়রা মহসিন, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নেছার আহমদ, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সাবেক ব্রিটিশ কাউন্সিলর এম এ রহিম, মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও চেম্বার সভাপতি মো. কামাল হোসেন, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুর রহমান বাবুল।

 

সংসদ সদস্য সায়রা মহসিন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিশন বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর ছিলেন আমার স্বামী সৈয়দ মহসিন আলী। তাঁরই পথ অনুসরণ করে আমিও কাজ করে যাচ্ছি। তাই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড এর মূল্যায়ন করে আমাকে মনোনয়ন দেবে।’

নেছার আহমদ বলেন, ‘দলীয় সভানেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করেছেন। আমি ছাত্রলীগের রাজনীতি করে এখন আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়েছি। সংগঠনে আমার কর্মদক্ষতার গুণেই এই পর্যায়ে পৌঁছেছি। এত দিনের রাজনীতির শেষ পাওয়া হচ্ছে একবার হলেও সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা। আমি মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।’

 

আওয়ামী লীগে গ্রুপিং বিষয়ে নেছার আহমদ বলেন, ‘পরিবারের মধ্যেও মতভেদ থাকে। নেত্রী আমাদের কমিটি অনুমোদন দিয়েছেন। যেসব মতভেদ আছে আমরা নিজেরাই সেব দূর করতে পারব। আগামী নির্বাচনে এই মতভেদ কোনো প্রভাব ফেলবে না। সকলেই নৌকা প্রতীকে ঐক্যবদ্ধ থাকবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।’

 

কামাল হোসেন বলেন, ‘আগামী সংসদ নির্বাচন হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। জনগণের সঙ্গে যাদের সম্পর্ক নেই এমন কেউ প্রার্থী হলে ফল আওয়ামী লীগের পক্ষে আসবে না। জনমানুষের নেতা সৈয়দ মহসিন আলী এখন আমাদের মাঝে নেই। আরেক জনপ্রিয় নেতা আজিজুর রহমান নির্বাচন করবেন না, এমনই শুনেছি। আমি ছাত্রলীগের সভাপতি হওয়ার আগে থেকেই এই অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মানুষ আমাকে ভালোবাসে। নেত্রী আমাকে ব্যক্তিগতভাবে জানেন। এলাকার মানুষের কাজে লাগার জন্য আমাকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে বলে আমি মনে করি।’

 

এম এ রহিম বলেন, ‘ছাত্রলীগের রাজনীতি করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে দীক্ষা নিই। অনেক নির্যাতন সহ্য করেছি। লেখাপড়ার জন্য যুক্তরাজ্য গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়েও আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করেছি। বাঙালি প্রথম কাউন্সিলর হিসেবে যুক্তরাজ্যে নির্বাচিত হয়েছি। ২০০৫ সালে আমার নেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেশে ফিরি। দেশে আসার পর বিএনপি সরকার আমাকে জেলে পুরে রাখে।’

 

দেশের টানে যুক্তরাজ্যের আরাম-আয়েশের জীবন ছেড়ে দিয়েছেন জানিয়ে রহিম বলেন, এলাকায় শিক্ষার প্রসারের জন্য কাজ করছেন তিনি। যুক্তরাজ্য থেকে নিয়ে আসা কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন ব্যবসা-শিল্পপ্রতিষ্ঠানে। শত শত বেকার তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছেন।

 

দুইবার বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (সিআইপি) নির্বাচিত হয়েছেন জানিয়েছে রহিম বলেন, ‘মানুষের জন্য কাজ করছি, করে যাব। দল আমাকে মনোনয়ন দিলে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হব।’

 

বিএনপি : সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি এম নাসের রহমান ছাড়াও বিএনপির মনোনয়ন আলোচনায় আছেন জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র ফয়জুল করিম ময়ূন ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান। কিন্তু গত মাসে প্রতিনিধি সমাবেশে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান মৌলভীবাজার-৩ আসনে এম নাসের রহমানই প্রার্থী হবেন—এমন ঘোষণা দেওয়ার পর অন্যরা মনোনয়ন নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলছেন না। তবে তাঁদের ঘনিষ্ঠরা বলছেন, তাঁরা দলের কাছে মনোনয়ন চাইতে পারেন।

 

নাসের রহমান বলেন, ‘আমার বাবা সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ছিলেন সিলেটের উন্নয়নের রূপকার। এটা উনার আসন। আমি যত দিন সুস্থ থাকব নির্বাচন করব। একাদশ সংসদ নির্বাচনে দল আমাকেই মনোনয়ন দেবে। আর প্রতিনিধি সমাবেশে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান তো আমার নাম ঘোষণা করেই গেছেন। এই ঘোষণারও কোনো প্রয়োজন ছিল না। আমার বাবার আসনে আমি ছাড়া আর কে নির্বাচন করবে? সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আমি বিপুল ভোটে বিজয়ী হব বলে আশাবাদী।’

 

মিজানুর রহমান মিজান বলেন, ‘আমি তৃণমূল থেকে রাজনীতি করে এ পর্যন্ত এসেছি। আমার জনপ্রিয়তা সহ্য করতে না পেরে নিজ দলের লোকজন আমার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছেন। আমি চাই, সব ভেদাভেদ ভুলে একত্র হয়ে কাজ করতে। দল মনোনয়ন দিলে আমি প্রার্থী হব।’

 

অন্যান্য : জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি সৈয়দ শাহাব উদ্দিন আহমদ, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ নূরুল হক দলীয় মনোনয়নপ্রার্থী বলে শোনা যাচ্ছে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের নেতা জামিল আহমদ আনসারী ও শরিফ খালেদ সাইফুল্লাহ মাঠে সক্রিয়। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আহমদ বিলাল কেন্দ্রের অনুমতিসাপেক্ষে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করেছেন। সূত্র : কালের কণ্ঠ