অগ্রজের পথেই হাঁটছেন অনুজ: বরিশালে মাফিয়ারা হতাশ

প্রকাশিত: ১২:১০ অপরাহ্ণ, মে ১৯, ২০১৮ | আপডেট: ৬:০৮:অপরাহ্ণ, মে ১৯, ২০১৮

আলম রায়হান

বরিশালে মাফিয়ারা আবার হতাশ হয়ে পড়েছে। এস এম রুহুল আমিনের বিদায়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন সেক্টরের মাফিয়ারা নিজেদের মতো করে কিছুটা হলেও আশার আলো দেখেছিল। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশকে পকেটে নেয়ার স্বপ্ন দেখেছিল কেউ কেউ। কিন্তু এ স্বপ্ন শুরুতেই হোচট খেল। কারণ ভারপ্রাপ্ত বিএমপি কমিশনার মাহফুজুর রহমান সদ্য বিদায়ী অগ্রজ এস এম রুহুল আমিনের পথেই হাটছেন এবং হাটবেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তার নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা। এমনটাই মনে করছেন বরিশালের পর্যবেক্ষক মহল।

২০০৬ সালে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ-এর যাত্রা শুরু হলেও নানান বিবেচনায় এর জোরালো কার্যক্রম দৃশ্যমান হয় এস এম রুহুল আমিনের আমলে, তার দক্ষ নেতৃত্ব, নিরপেক্ষতা ও জনসম্পৃক্ত মানসিকতার কারণে। ১১ বছর ৫ মাস বয়সী বিএমপি’র দশম কমিশনার ছিলেন এস এম রুহুল আমিন। ২২ মাসের মাথায় তাকে বদলি করা হয় ১২ এপ্রিল। বছর খানেক আগেও তাকে বদলি করা হয়েছিল। তবে সে বদলি আদেশ কয়েক দিনের মাথায় স্থগিত হয়। সেবার বদলির খবরে মাফিয়ারা উল্লাস প্রকাশ করলেও এবার তারা ছিল ভাল্লুকের শীত ঘুমের অবস্থায়। মাফিয়াদের আশঙ্কা ছিল, আবার যদি বদলি আদেশ স্থগিত হয়ে যায়!

তবে ১ মে দুপুরে এস এম রুহুল আমিন বরিশাল ত্যাগ করার পর স্থানীয় মফিয়ারা উল্লসিত হয়ে ওঠে; আবার সক্রিয় হয়, তবে বেশ সতর্কতার সঙ্গে। কিন্তু তারা আবার হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছে ১২ মে। কারণ এদিন সকলের কাছেই স্পষ্ট হয়েছে, ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কমিশনার মাহফুজুর রহমান বিদায়ী অগ্রজের পথেই হাঁটছেন এবং হাঁটবেন। অবশ্য এ রকম মনোভাব তিনি ২৮ এপ্রিল বেশ খানিকটা প্রকাশ করেছেন।

এস এম রুহুল আমিনের বিদায় উপলক্ষে ২৮ এপ্রিল কোতোয়ালি মডেল থানা চত্বরে সংবর্ধনা অুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কমিশনার মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘আমার পোস্টিং হয়েছিল খুলনা মেট্রোপলিটনে। কিন্তু স্যারের সঙ্গে কাজ করার জন্য আমি বরিশালে পোস্টিং নিয়েছি। কিন্তু স্যারের সঙ্গে তো আর কাজ করা হলো না।’ এ সময় তিনি কিছুটা আবেগপ্রবণ ছিলেন। সেদিন তিনি আরো কিছু বিষয় স্পষ্ট করেন। তার বক্তব্যে একটি বিষয় খুবই স্পষ্ট হয়েছে। তা হচ্ছে, কুখ্যাত সন্ত্রাসী সময়ের পরিক্রমায় রাজনীতির খোলসে যতবড় নেতাই হোক, সন্ত্রাসী হিসেবে তার পরিচয় মুছে যায় না।

তবে ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মাহফুজুর রহমানের সেদিনের বক্তব্য বরিশালের মাফিয়ারা তেমন ধর্তব্যের মধ্যে নেয়নি। হয়তো ভেবেছিল বিদায় অনুষ্ঠানে এ ধরনের প্রশংসার ফুলঝুড়ি বর্ষণ এবং আবেগী কথাবার্তা মামুলি রেওয়াজ। কিন্তু তারা নড়েচড়ে বসলো ১২ মে সাংবাদিকদের সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মাহফুজুর রহমানের মতবিনিময় অনুষ্ঠানের পর। আন্তরিক পরিবেশে সাংবাদিকদের সঙ্গে দীর্ঘ এ মতবিনিময় অনুষ্ঠানেও ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কমিশনার বিদায়ী অগ্রজের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন শ্রদ্ধার সঙ্গে। এর সাথে আরো নানান ঘটনায় এরই মধ্যে অনেকের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে, বিএমপি’র ভারপ্রাপ্ত কর্ণধার বিদায়ী অগ্রজের পথেই হাঁটবেন। এবং তিনি অধিকতর কঠোর হতে পারেন বলেও মনে করছেন কেউ কেউ, যা বরিশালে অপরাধী চক্রের জন্য চরম অমঙ্গলের বার্তা!

আর সদ্য বিদায়ী অগ্রজকে অনুসরণ করাই কেবল নয়, প্রায় বিশ বছরের চাকরি জীবনে মাহফুজুর রহমান পুলিশ বিভাগে টাফ অফিসার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মেধাবী ছাত্র মাহফুজুর রহমান পেশাগত জীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল এআইজি (গোপনীয়) পদে ছিলেন প্রায় চার বছর। এ সময় দেশের সকল জেলা ও এসপিদের খোঁজখবর ছিল তার নখদর্পনে। তিনি এআইজি (মিডিয়া) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এর ফলে সাংবাদিকদের সঙ্গেও তার অন্যরকম ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। সম্ভবত সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই বরিশালে বহুধা বিভক্ত সাংবাদিকদের সমান আন্তরিকতায় ম্যানেজ করতে পেরেছেন এবং সাংবাদিকতার সাইনবোর্ডের আড়ালে অপরাধ চালাবার পথ বন্ধ করার সাহসী উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। এর আগে অবশ্য তার নিজ বাহিনীর ব্যাপারেও কঠোর মনোভাব দেখিয়েছেন।

উল্লেখ্য, পাঁচ মাস পূর্বে পদোন্নতি পাবার আগে তিনি প্রায় তিন বছর মানিকগঞ্জ জেলার দাপুটে এসপি ছিলেন।

সকলেরই জানা, মহান পেশা সাংবাদিকতার মধ্যে নানান রকমরে অপসাংবাদিকতা ও হরেক রকমের অপরাধী আশ্রয় নিয়েছে। বিশাল বটবৃক্ষে পক্ষিকুল আশ্রয় নেবার পাশাপাশি যেমন ক্ষতিকর অনেক প্রাণীও ঢুকে পড়ে। একই ঘটনা ঘটেছে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও। ফলে এ পেশার অভ্যন্তরে উদ্বেগজনক অবস্থা বিরাজমান, সারাদেশেই। এ ক্ষেত্রে বরিশালের দশা খুবই নাজুক; কারণ সাংবাদিক তকমা ধারণ করেছে নানান ধরনের অনেক অপরাধী। এমনকী নারী ও মাদকের চিহ্নিত কয়েকজন ব্যবসায়ীও পত্রিকা বের করে সাংবাদিক সেজেছেন; হায়না চিত্রা হরিণ সাজার মতো। তাদের ছত্রছায়ায় গড়ে উঠেছে বিশাল বাহিনী। এদের অনেকে আবার সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে চলে।

এ ব্যাপারে বরিশাল মেট্রোপলিটন প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক শাহনামা পত্রিকার সম্পাদক কাজী আবুল কালাম আজাদের উদ্বেগের মন্তব্য হচ্ছে, আমার পত্রিকার সাংবাদিক পরিচয় দেয়, কিন্তু আমি চিনি না!

এই হচ্ছে বরিশালে সাংবাদিকতার খণ্ডিত একটি চিত্র। আর এসব কথিত সাংবাদিকদের প্রধান বাহন হচ্ছে ‘সাংবাদিক’ অথবা ‘প্রেস’ সাঁটানো মোটরবাইক। এক্ষেত্রে অনেকের নাম্বার প্লেটও নেই। ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কমিশনার প্রথমেই এই বিষয়টার দিকে নজর দিলেন। সমঝোতার ভিত্তিতে তিনি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, সাংবাদিকদের মোটরবাইকে পত্রিকার নাম লিখতে হবে এবং থাকতে হবে সম্পাদকের ফোন নাম্বারও। এ সময় তিনি সিদ্ধান্ত দেন, পুলিশ সদস্যরাও ব্যক্তিগত মোটরবাইকে ‘পুলিশ’ লিখতে পারবে না।

এ সিদ্ধান্তকে কেবল সাংবাদিকরা নয়, পুরো নগরবাসী স্বাগত জানিয়েছে। কেউ কেউ বলেন, সাংবাদিক পরিচয়ে অনেকের উপদ্রব পেশাদার অপরাধীদেরকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে মাদক ব্যবসা ও ভূমিদস্যুতার ক্ষেত্রে। আর তাদের প্রধান বাহন হচ্ছে মোটরবাইক, জটাই পাখির মতো। ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কমিশনার প্রথমেই জটাই পাখির ডানা কেটে দিতে যাচ্ছেন। আরো অনেক প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছেন মাহফুজুর রহমান।

এর প্রতিক্রিয়ায় কেউ যে ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মাহফুজুর রহমানের ডানা কাটার চেষ্টা করবে না, তেমনটি মনে করার কোনই কারণ নেই। হয়তো মাফিয়ারা জোটবদ্ধ হয়ে তাকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করবে। অথবা কশিনার হিসেবে মাথার উপর এমন একজনকে বসাবার জন্য লবিং করবে যার দুর্নীতির ব্যাপ্তি প্রজা হিতৈশী জমিদার রানী দুর্গাবতীর খনন করা দুর্গা সাগরের চেয়েও বিশাল। তবে সূত্র মতে, বরিশালের মাফিয়ারা এ ক্ষেত্রে সফল হবার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ।

সূত্র আরও জানিয়েছে, ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কমিশনার হিসেবে মাহফুজুর রহমান বেশ কিছুদিন থাকবেন। এরপর নতুন পদোন্নতিপ্রাপ্ত কাউকে বিএমপি কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হতে পারে; তবে এ ক্ষেত্রে অতি পাপীদের স্থান পাবার সম্ভাবনা নেই।

উল্লেখ্য, সপ্তাহ খানেকের মধ্যে সিনিয়র অতিরিক্ত ডিআইজিদের মধ্য থেকে প্রায় আটজনকে ডিআইজি’র কারেন্ট চার্জে দেয়া হবে। এরা পূর্ণ ডিআইজি হবার জন্য উপযুক্ত। কিন্তু এসএসবি বৈঠকজনিত জটিলতার কারণে আপাতত কারেন্ট চার্জে দেয়া হবে। আর বরিশালে যাকেই পুলিশ কমিশনার হিসেবে দেয়া হোক, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার হিসেবে থাকবেন মাহফুজুর রহমানই।

এদিকে অপরাধীদের টাইট দিতে গেলে প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারেও সম্ভবত ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কমিশনার মাহফুজুর রহমান বেশ সচেতন। বিষয়টি তিনি প্রকারন্তরে জানানও দিয়েছেন ১২ মে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে। তিনি বলেছেন, “বিশ বছর ধরে পুলিশের চাকরি করছি, আর দশ বছর চাকরি আছে। ভাগ্য আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে জানি না; আমি সিরাতুন মোস্তাকিন পথেই চলবো।”

পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, বরিশালের নানান ধরনের গডফাদারদের জন্য খুবই কঠিন বার্তা দিয়েছেন বিএমপি’র ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মাহফুজুর রহমান। উল্লেখ্য, তিনি বরিশালেরই সন্তান, অনৈতিক প্রেসারে তাকে টলানো কঠিন। ভাঙ্গলেও মচকাবার পাত্র নন মাহফুজুর রহমান, অনেকটা এস এম রুহুল আমিনের মতো!

আলম রায়হান, সিনিয়র সাংবাদিক