সৌদি রাজপরিবারে গৃহবিবাদের অন্তরালে

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৭:১৮ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১২, ২০১৭ | আপডেট: ৭:১৮:পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১২, ২০১৭
সৌদি রাজপরিবারে গৃহবিবাদের অন্তরালে

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে সিংহাসনে বসার পথে সম্ভাব্য সব বাধা সরিয়ে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ সমালোচকদের। তারা বলছেন, পরিবার ও আত্মীয়দের মধ্য থেকে ধারণার চেয়েও বেশি বাধা আসছে বুঝতে পেরেই মতা নিরঙ্কুশ করতে যুবরাজ পরিবারের সদস্যদের ওপর চড়াও হতে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের ঢাল ব্যবহার করছেন। এ অভিযানের প্রথম ইঙ্গিত মেলে ৪ নভেম্বর জারি হওয়া এক নোটিশে।

এ নোটিশে রিয়াদের রিটজ কার্লটন হোটেল কর্তৃপক্ষ অতিথিদের জানায়, ‘স্থানীয় কর্তৃপরে অপ্রত্যাশিত বুকিংয়ের কারণে নিরাপত্তার স্তর আরো কড়াকড়ি করার প্রয়োজনে আমরা আপনাদের হোটেলে রাখতে পারছি না, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এ ব্যবস্থা চলবে।’
নোটিশ জারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সৌদি নিরাপত্তা বাহিনী দেশটির অভিজাত রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের ধরপাকড় শুরু করে। এদের অনেককেই রাজধানী রিয়াদ ও উপকূলীয় শহর জেদ্দা থেকে আটক করা হয়। এদের মধ্যে আছেন ১১ জন প্রিন্স, বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও ধনী ব্যবসায়ী। এদের সবাইকে অভিজাত হোটেল রিটজ কার্লটনে বন্দী করে রাখা হয়। হোটেলটি পরিণত হয় অস্থায়ী কারাগারে। সপ্তাহখানেক পরও এ অবস্থা বজায় থাকে।

এদের মধ্যে কয়েকজনকে বৈঠকের কথা বলে ডেকে আনা হয়েছিল, অন্যদের রিয়াদে তাদের বাসা কিংবা উপকূলীয় শহর জেদ্দা থেকে গ্রেফতার করে বিমানে করে আনা হয় রিটজ কার্লটনে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নির্দেশে এ ব্যবস্থা জারি হয় বলে এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন।

১৯৭৯ থেকে ২০০১ পর্যন্ত সৌদি আরবের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান থাকা প্রিন্স তুর্কি আল ফয়সালের সাবেক উপদেষ্টার খাশোগির মতে, মোহাম্মদ একজন জাতীয়তাবাদী ঘরানার রাজনীতিক, যে তার দেশকে ভালোবাসেন ও তাকে শক্তিশালী রূপে দেখতে চান। খাশোগি আরো বলেন ‘সমস্যা হলো তিনি একাই শাসন করতে চান।’ এই নিরঙ্কুশ মতার আকাক্সাই সৌদি আরবকে অস্থিতিশীল করে দিতে পারে বলে ধারণা অনেকের। এত দিন রাজ পরিবার ও রণশীল ধর্মীয় নেতাদের সমন্বয়ে সৌদি আরবের শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হতো। বেশির ভাগ সিদ্ধান্তই হতো ঐকমত্যের ভিত্তিতে। মোহাম্মদের উত্থানের পর সে চিত্র বদলে গেছে।

২০১৫ সালে সালমান বাদশাহর দায়িত্ব নেয়ার পর মোহাম্মদকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। চলতি বছরের জুনে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নায়েফকে সরিয়ে ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমানকে যুবরাজ করেন বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ ইবনে সৌদি। দায়িত্ব পাওয়ার দুই মাসের মাথায়ই অনেক ধর্মীয় নেতা ও প্রতিপ বুদ্ধিজীবীকে জেলে পুরেন মোহাম্মদ।
সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের মৃত্যুর পর থেকে দায়িত্ব পাওয়া বাদশাদের নেতৃত্বেই একদল প্রিন্স দেশটির শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করছিলেন। প্রিন্সদের মতা কাঠামো এমন ছিল যেন কেউ কারো ওপর জোর না খাটাতে পারেন। ব্যতিক্রম হলেন মোহাম্মদ। ৩২ বছর বয়সী এ যুবরাজ আগের মতা কাঠামোর ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়ে ‘একক শাসন’ প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ সমালোচকদের।

সেনাবাহিনী, নিরাপত্তা, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও সমাজবিষয়ক সব কিছুর একক নিয়ন্ত্রণ যুবরাজের হাতে। আগের বাদশাহরা তাদের ভাই, ছেলে বা ভ্রাতুষ্পুত্রদের কয়েকজনকে উপদেষ্টা বানিয়ে বিভিন্ন দায়িত্ব তাদের সাথে ভাগ করে নিতেন। নতুন যুবরাজ এখন পর্যন্ত পরিবারের কাউকে এ ধরনের শীর্ষ পদে মনোনয়ন না দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে প্রশিতি একদল সৌদি নাগরিকের পরামর্শের ওপর নির্ভর করছেন।

রাজ পরিবারের বেশ কয়েকজন পর্যবেক জানান, চলতি বছরের গ্রীষ্মে পারিবারিক বৈঠকেই রাজ পরিবারের গৃহবিবাদের ইঙ্গিত মেলে। এক পর্যবেক্ষক জানান, দেশটির প্রভাবশালী ন্যাশনাল গার্ডের প্রধান মিতেবের মতো প্রভাবশালী অনেকেই যে মোহাম্মদের উত্থানকে ভালোভাবে নেননি, তা সুবিদিত। এরই প্রতিক্রিয়ায় মিতেবসহ প্রিন্সদের গ্রেফতার করা হয়েছে।

হারিরিকে আটক যুদ্ধ ঘোষণার শামিল : হিজবুল্লাহ

বিবিসি

লেবাননের শিয়া গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর নেতা হাসান নাসরুল্লাহ অভিযোগ করেছেন, তাদের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরিকে জোর করে আটক করার মাধ্যমে লেবাননের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে সৌদি আরব। শুক্রবার সন্ধ্যায় বৈরুতে এক ভাষণে এমন মন্তব্য করেন নাসরুল্লাহ। হজরত ইমাম হোসাইনের (রা:) শাহাদতবার্ষিকী উপলে দেয়া তার এ ভাষণ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

হাসান নাসরুল্লাহ বলেন, ফিউচার পার্টির প্রধান ৪৭ বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরিকে সৌদি আরবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তার সাথে কাউকে যেতে দেয়া হয়নি। রিয়াদে যাওয়ার পর তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে সৌদি আরব লেবাননের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মারাত্মকভাবে হস্তপে করেছে। তিনি বলেন, সাদ হারিরি যে ভাষায় পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন তা থেকে পরিষ্কার হয়েছে যে, তাকে এসব বক্তব্য দিতে বাধ্য করা হয়েছে।

হিজবুল্লাহ নেতা বলেন, ‘হারিরি এখন সৌদি আরবে কারাবন্দী এবং নিজ দেশে ফিরতে পারছেন না। সৌদি আরব নিজের ইচ্ছা লেবানন সরকারের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে। এখানকার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিভেদের বীজ বোনার চেষ্টা করছে রিয়াদ। তারা আমাদের পরস্পরের মুখোমুখি করে দিতে চাইছে।’

তিনি বলেন, ‘লেবাননে সামরিক আগ্রাসন চালাতে সৌদি ইসরাইলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এ ল্য অর্জনে তারা কোটি কোটি ডলার খরচ করতে প্রস্তুত রয়েছে। প্রকৃতপে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধের অজুহাতে সৌদি আরব লেবাননকে ধ্বংস করতে চায়। এই সৌদি আরবই ছিল ২০০৬ সালে হিজবুল্লাহ-ইসরাইল যুদ্ধের প্রধান কারিগর।’

তিনি বলেন, সাদ হারিরিকে আটক রেখে তাকে অপমান করা হয়েছে। এটি লেবাননের জনগণের জন্য অবমাননাকর। চলমান পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট মিশেল আউন চমৎকারভাবে দেশ সামলে নিচ্ছেন। তাকে কাজের েেত্র সব দল ও মতের লোকজনকে সহযোগিতা করতে হবে।

উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরানের সমর্থনপুষ্ট লেবাননের শিয়াপন্থী সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। দলটি একই সাথে লেবাননের একটি রাজনৈতিক ও সামরিক সংগঠন। দেশটির পার্লামেন্টেও তাদের প্রতিনিধিত্ব আছে। ২০১৬ সালে সাদ হারিরির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারে অংশ নেয় হিজবুল্লাহ। এর আগে সৌদি রাজ পরিবারে ব্যাপক ধরপাকড়ের মধ্যেই পদত্যাগের ঘোষণা দেন সৌদি আরবে সফররত লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ আল হারিরি।

টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। ভাষণে সাদ আল হারিরি বলেন, ‘তার বাবা রফিক আল হারিরির হত্যাকাণ্ডের সময় যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, এখন আমরা ঠিক সেই পরিস্থিতিতে বাস করছি।

আমি বুঝতে পারছি, আমাকে হত্যার জন্য কোনো ধরনের ছক তৈরি করা হচ্ছে।’
পদত্যাগী প্রধানমন্ত্রী সাদ আল হারিরির ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরব সফরে যাওয়ার পর তাকে সেখানে অবস্থান ও পদত্যাগ করতে বলা হয়। তারা (সৌদি আরব) তাকে পদত্যাগপত্র পড়তে বলে এবং এর পর থেকেই হারিরিকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে, যে কারণে লেবানিজ প্রধানমন্ত্রী নিজ দেশে ফিরতে পারছেন না। অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সৌদি হস্তেেপর প্রতিবাদ জানিয়েছে লেবানন। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেবরান বাসিল বলেছেন, তার দেশের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়া বা পদচ্যুত করার অধিকার বাইরের কারো নেই।