বাংলাদেশি তিন তরুণের আকাশ জয়ের স্বপ্ন!

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১২:৪৫ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১২, ২০১৭ | আপডেট: ১২:৪৫:পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১২, ২০১৭
বাংলাদেশি তিন তরুণের আকাশ জয়ের স্বপ্ন!

আকাশ জয়ের স্বপ্ন বাংলাদেশি এই তিন তরুণেরইয়া বড় উড়োজাহাজ। উড়ছে তো উড়ছে, উড়ছেই। কী এমন শক্তি রয়েছে এর পেছনে, যা এমন দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে? রয়েছে এমন অগণিত জিজ্ঞাসা, রয়েছে আরও নিখুঁত উড়াল ও গতির আকাঙ্ক্ষা। আর এই অনুসন্ধিৎসা ও আকাঙ্ক্ষা বাংলাদেশের তিন তরুণকে মগ্ন করেছে সাধনায়। এরা হলেন— আমেরিকার কানসাস অঙ্গরাজ্যের আনোওয়ার সাদাত জিহান, শুভেচ্ছা চক্রবতী ও আব্দুল্লাহ-আল বাকী সিফাত। উচিটা স্টেট ইউনিভার্সিটির অ্যারো স্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ুয়া এ তিন শিক্ষার্থী সম্প্রতি প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার সঙ্গে কথা বলেন। ভাবি তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক মহাকাশ বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার স্বপ্ন চোখে এ তিন তরুণের সঙ্গে আলোচনায় উঠে এল অজানা অনেক তথ্য।

আকাশের রাজধানী নামে খ্যাত আমেরিকার কানসাসের উচিটা শহর। এ শহর থেকেই শুরু হয়েছিল বোয়িং, লিয়ারজেড, সেসনার মতো নামকরা সব উড়োজাহাজ কোম্পানির যাত্রা। তারই ধারাবাহিকতায় উচিটা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যারো স্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং সব আকাশছোঁয়া স্বপ্নচারীদের কাছে বিশেষ হয়ে উঠেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে মহাকাশ বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে আসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। রয়েছেন বাংলাদেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীরাও, যারা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে রাখছেন যোগ্যতার স্বাক্ষর। এঁদেরই একজন শুভেচ্ছা চক্রবর্তী।

প্রকৌশলী শুভেচ্ছা বাংলাদেশ মিলিটারি ইনস্টিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে বৃত্তি নিয়ে আমেরিকায় এসেছেন। ক্লাইমেট রিয়্যালিটি লিডারশিপ ও আন্তর্জাতিক মহাকাশ সংস্থার (নাসার) বিজ্ঞান মেলায় আমন্ত্রিত হয়ে যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখা শুভেচ্ছা জানান, একটা উড়োজাহাজ বানাল, আর তা আকাশে উড়াল দিল। বিষয়টা তা নয়। এর পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগার থেকে শুরু করে উড়োজাহাজ উৎপাদনকারী কারখানার ফিনিশ প্রোডাক্ট (উড়োজাহাজ) পর্যন্ত হাজারও মানুষের চুলচেরা বিশ্লেষণ ও শ্রম জড়িত। একটা উড়োজাহাজ ওড়ার পেছনে চারটি বিষয় ক্রিয়াশীল। এগুলো হচ্ছে লিফট, থ্রাস্ট, ওয়েট ও ড্র্যাগ। ভূমি থেকে ওপরে তোলার ক্ষেত্রে লিফট গুরুত্বপূর্ণ। উড়োজাহাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয় থ্রাস্ট। ওয়েট কাজ করে নিচের দিকে। আর ড্র্যাগ বাতাসের সঙ্গে খেলা করে সামনে এগোনোয় সাহায্য করার পাশাপাশি উড়োজাহাজের ভারসাম্য রক্ষা করে। এ চারটি বলের যৌথায়নেই আকাশে ভেসে থাকে উড়োজাহাজ। স্পেস-এক্সের স্বত্বাধিকারী এলেন মাস্কের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, মাত্র ৪৫ মিনিটে আমেরিকা থেকে লন্ডন কিংবা জার্মানি পৌঁছে যাবে উড়োজাহাজ, এ স্বপ্নের বাস্তবায়ন আর দূরে নয়। ২০৩০ সাল নাগাদ মহাকাশে মানুষের অবাধ যাতায়াত এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
উড়োজাহাজ তৈরির উপাদানে দিন দিন ভিন্নতা আসছে বলে জানান তরুণ এ বিজ্ঞানী। তিনি বলেন, এখন উড়োজাহাজ তৈরিতে কম্পোজিট ম্যাটেরিয়ালের (বিভিন্ন বস্তুর সমন্বয়ে তৈরি নতুন বস্তু) ব্যবহার বাড়ছে। মূলত উড়োজাহাজকে আরও হালকা করতেই এসব পদার্থ ব্যবহার করা হচ্ছে। উড়োজাহাজ নির্মাণে কম্পোজিট পদার্থের ব্যবহার শুরু হয় ১৯৬০ সালের দিকে। সে সময় এর ব্যবহার ছিল ১০-১৫ শতাংশ। বর্তমানে উড়োজাহাজ নির্মাণে কম্পোজিটের ব্যবহার বেড়ে ৫৫-৬৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
উড়োজাহাজ নির্মাণে কম্পোজিট পদার্থ ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ার পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক কারণ। কারণ উড়োজাহাজের ভর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার উড্ডয়নে বেশি জ্বালানির প্রয়োজন পড়ে। আর বেশি জ্বালানি মানেই বেশি খরচ। ফলে ব্যয়সংকোচনের জন্য নতুন নতুন কম্পোজিট পদার্থের দিকে ঝুঁকছে উড়োজাহাজ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো। উচ্চ দক্ষতা ও ভৌত ধর্মবিশিষ্ট নতুন নতুন কম্পোজিট তৈরিতে সারা বিশ্বেই চলছে জোর গবেষণা। শুভেচ্ছা চক্রবর্তী জানান, বোয়িং-৭, বোয়িং-৭৭৭, বোয়িং ৭৮৭, ড্রিম লাইনার, বোয়িং-৩৮০, এয়ারবাসের মতো যাত্রীবাহী উড়োজাহাজগুলোয় বর্তমানে ৬০ শতাংশই কম্পোজিট পদার্থ ব্যবহার করা হচ্ছে। মূলত লোহার সঙ্গে অ্যালোমিনিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো হালকা মৌল মিশিয়ে এ কম্পোজিটগুলো তৈরি করা হয়।
নিজের কাজ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘উচিটা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুরেশ রাজুর তত্ত্বাবধানে কাজ করছি আমি। এয়ারক্রাফটের মাল্টি লেয়ার বিম ডিজাইন করেছি এরই মধ্যে। এ ছাড়া রোবট-স্যাটেলাইট দিয়ে উড়োজাহাজ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে কাজ শেষ করে বর্তমানে কম্পোজিট নিয়ে কাজ শুরু করেছি। এসবই ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।’ আর এ প্রতিটি ধাপ পেরিয়েই নিজের স্বপ্নের দরজায় পৌঁছাতে চান শুভেচ্ছা।
একই স্বপ্ন আনোওয়ার সাদাত জিহানের চোখেও। উচিটা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যারো স্পেস নিয়ে ২০১০ সালে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। শব্দহীন উড়োজাহাজ নির্মাণের পথে অনেকটাই এগিয়ে গেছেন তিনি। এরই মধ্যে ‘ওকটেট ট্রাস কোর স্যান্ডউইচ প্যানেল’ নামে একটি ‘শব্দ নিরোধ’ পন্থা নিয়ে কাজ প্রায় শেষ করে এনেছেন জিহান। বর্তমানে তাঁর উদ্ভাবিত এ ধারণাটি পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘উড়োজাহাজে ভ্রমণের সময় এক ধরনের শব্দ আমাদের কানে বাজে। তরঙ্গ ভেদে এ শব্দের তীব্রতা একেক রকম হয়, যার ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। এই শব্দ থেকে উড়োজাহাজকে মুক্ত করতেই কাজ করছি। শুধু আমি নই এ লক্ষ্য সামনে রেখে প্রতিনিয়ত হাজির হচ্ছে নতুন নতুন ধারণা ও সে সম্পর্কিত গবেষণা।’
জিহানের সঙ্গে আলাপে জানা গেল, বর্তমানে উড়োজাহাজের স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে জাহাজের পাখাকে সম্পূর্ণ নমনীয় করে তোলা। উড়োজাহাজের ভারসাম্যের ক্ষেত্রে এর ডানাগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত একটি ডানা প্রায় ৮০হাজার পাউন্ড ভার বহনে সক্ষম। এটি যখন আরও নমনীয় হয়ে উঠবে তখন এর সক্ষমতা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে কমবে এর দুর্ঘটনা কবলিত হওয়ার আশঙ্কাও। উদাহরণ হিসেবে চারটি ইঞ্জিন বন্ধ হওয়ার পরও নিউইয়র্কের হাডসন নদীতে এয়ারবাস ৩৮০-এর নিরাপদ অবতরণের সাম্প্রতিক ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়। এটি সম্ভব হয়েছিল এয়ারবাসের ওই মডেলের উড়োজাহাজের ডানা নমনীয় হওয়ায়। উড়োজাহাজের ডানা এলোমেলো বাতাসের প্রবল শক্তির সঙ্গে লড়াই করে বিশাল ভরের বস্তুটিকে আকাশে ভেসে থাকতে সহায়তা করে। আর তাই এর কাঠামোর সঙ্গেই রয়েছে শব্দের তীব্রতার অন্যতম সূত্রটি। এ ক্ষেত্রে অনেক উন্নতি হলেও এখনো শব্দ নিরোধ অনেক পিছিয়ে আছে। আর জিহান ঠিক এ ক্ষেত্রটিতেই কাজ করছেন।
এদিকে একই স্বপ্ন চোখে নিয়ে পড়ালেখার পাশাপাশি ‘অ্যারো স্পেস ডিজাইন’ নিয়ে বই লেখায় ব্যস্ত এখন আব্দুল্লাহ-আল বাকী সিফাত। তাঁর মতে, বিশ্বের অন্য সব দেশের তরুণদের মতোই বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যেও মহাকাশ নিয়ে আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, পছন্দের বিষয়। আর নিজের স্বপ্ন বয়ান কে না লিখতে ভালোবাসে।
মাতৃভূমি বাংলাদেশ নিয়ে এ তিন তরুণ বিজ্ঞানীর কথা একটাই— সবাই পারলে আমরা পারব না কেন। উড়োজাহাজের খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরির সম্ভাবনাময় দেশ বাংলাদেশ। প্রতি বছর এমআইটি থেকে অর্ধশত অ্যারো স্পেস ইঞ্জিনিয়ার বের হচ্ছেন। এসব মেধাবী প্রকৌশলীকে কাজে লাগিয়ে দেশে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব।

  • প্রথম আলো