তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রাকে ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষের স্বপ্ন

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ২:৫৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১১, ২০১৭ | আপডেট: ২:৫৭:অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১১, ২০১৭
তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রাকে ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষের স্বপ্ন

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার টিয়াখালী ইউনিয়নে ইটবাড়িয়া গ্রামে অবকাঠামোগত নানা সঙ্কট সত্ত্বেও দেশের তৃতীয় সমুদ্র বন্দর পায়রার উন্নয়নকাজ দ্র্র্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। এখন বন্দর থেকে খালাস হওয়া পণ্য খুব সহজে দেশ ও দেশের বাইরে পাঠানোর জন্য সড়ক ও নৌ-পথের উন্নয়নমূলক কাজ চলছে। গত ৯ মাস যাবৎ আমদানিকারকেরা এর সুফল পেতে শুরু করেছেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করতে তৎপর বন্দর কর্তৃপক্ষ। তৃতীয় সমুদ্র বন্দর পায়রায় পণ্য খালাস কার্যক্রম চলছে। খালাস হওয়া পণ্য পরিবহনে প্রয়োজন উন্নত সড়ক ও গভীরতাসম্পন্ন নৌপথের। আর সে লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে রিবার মেন্টেন্যান্স করে ঢাকা থেকে পায়রা বন্দর পর্যন্ত নৌপথকে সুগম করার কাজ শেষের দিকে। চলছে বন্দর থেকে কুয়াকাটা-বরিশাল মহাসড়ক পর্যন্ত ফোর লেনের নতুন সড়ক নির্মাণের কাজও। দ্রত কাজ শেষ করতে ৬০টি রিগ মেশিন ব্যবহার করছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারীরা। বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবিÑ নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ করতে প্রতিদিন নির্ধারিত পরিমাণ কাজ বেঁধে দেয়া হচ্ছে। পায়রা বন্দর দায়িত্বরত প্রধান লে. কমান্ডার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমাদের যে টার্গেট আছে তার মধ্যে আশা করি কাজ শেষ হয়ে যাবে। পণ্য পরিবহনে উন্নত সড়ক ও নাব্য সম্পন্ন নৌপথ সুগম করতে দু’টি প্রকল্পে কয়েক কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।

এ দিকে অবকাঠামোগত সুবিধার অভাবে অপার সম্ভাবনাময় দক্ষিণাঞ্চল আজো অবহেলিত জনপথ হিসেবেই পরিচিত। অথচ এ অঞ্চলে রয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ বঙ্গোপসাগর, পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, কুয়াকাটাসহ পর্যটন সমৃদ্ধ দৃষ্টিনন্দন বিভিন্ন দ্বীপাঞ্চল। পিছিয়ে থাকা এই অঞ্চল এগিয়ে নিতে বর্তমান সরকার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। উপজেলার টিয়াখালী ইউনিয়নের রাবনাবাঁধ চ্যানেলের পশ্চিম তীরে প্রায় সাত হাজার দুই শত একর জায়গাজুড়ে নির্মিত হচ্ছে দেশের তৃতীয় এই সমুদ্র বন্দর। এর বাইরে ১৬ একর জমিতে চলছে লাইট হাউজ নির্মাণ ও রজপাড়া থেকে পায়রা বন্দর পর্যন্ত চার লেনের সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ। ২০২৩ সালের মধ্যে বন্দরের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে রাবনাবাঁধ চ্যানেলে ছয়টি বৈদেশিক বাণিজ্যিক জাহাজ মালামাল খালাস করেছে। জাহাজগুলো ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, পানামা ও চীন থেকে এসেছে। এর মাধ্যমে ২২ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে। জাহাজকেন্দ্রিক কর্মকান্ডে সাথে প্রায় ২ হাজার মানুষ সম্পৃক্ত হয়েছেন। ফলে অঞ্চলে আগের চেয়ে অনেক বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ঝড়-ঝঞ্জা, বিক্ষুব্ধ এ অঞ্চলের মানুষের এক সময় কৃষি এবং মাছ ধরা ছিল তাদের প্রধান পেশা। ধুঁকে ধুঁকে চলা পেশার চলন শক্তিতে গতির সঞ্চার ঘটেছে পায়রা সমুদ্র বন্দর নির্মাণের কারণে।

এই ব্যাপক কর্মযজ্ঞ ঘিরে এবং কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখে এ অঞ্চলের মানুষ সোনালি স্বপ্ন বিভোর হয়ে উঠেছেন। এ অঞ্চলের সকল মানুষের প্রত্যাশা বন্দর পুরো মাত্রায় চালু হলে শিল্পাঞ্চল কেন্দ্রিক আধুনিক শহর গড়ে উঠবে। গড়ে উঠবে বাণিজ্যিক এলাকা, বিমানবন্দর, পোর্টকেন্দ্রিক শিল্প এলাকা, পর্যটন এলাকা। পায়রা বন্দরে টার্মিনাল-জেটির পাশাপাশি তেল শোধনাগার, বিদ্যুৎকেন্দ্র, রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, অর্থনৈতিক অঞ্চল, এক্সকুসিভ টুরিস্ট অঞ্চল, বিমান বন্দর এবং জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতের ব্যবস্থাও থাকবে। বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত-মাস্টার-প্লান। এতে কর্মসংস্থান হবে ৫ থেকে ১০ লাখ মানুষের। সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা গেছে, দেশের তৃতীয় পায়রা বন্দর দক্ষিণ উপকূলের মানুষের জীবন বদলে দিচ্ছে। বন্দরকে ঘিরে প্রকল্প এলাকায় চলছে বিরামহীন উন্নয়ন কার্যক্রম। শত শত শ্রমিক সেখানে কাজ করছেন। পটুয়াখালী সদর থেকে পর্যটন শহর কলাপাড়া উপজেলা সদর হয়ে মানুষ যেতে পারছে পায়রা বন্দর প্রকল্প এলাকায়। ভূমি অধিগ্রহণের পর এগিয়ে চলছে চার লেনের সংযোগ সড়কের কাজ। প্রশাসনিক ভবন, ওয়্যার হাউজ ও বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণের কাজ শেষের পথে। পায়রা বন্দর হতে ঢাকা পর্যন্ত নৌপথে চলাচলের জন্য নৌবাহিনী জরিপ ও ড্রেজিং কাজ চলছে। পরন্ত বিকেলে ভ্রমণপিপাসুদের ভির লেগে যায় বন্দর এলাকায়। প্রকল্প এলাকায় টার্মিনাল স্থাপন করা হয়েছে। চালু করা হয়েছে সৌরবিদ্যুৎ সিস্টেম। আলোকিত হচ্ছে জনপথ। টানা হয়েছে পল¬ী বিদ্যুতের লাইনও। অন্যান্য বন্দরে জাহাজ চলাচলে যেমন জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করতে হয়, পায়রা বন্দরে এ সমস্যা নেই। গভীরতা বেশি থাকায় এ রুটে ২৪ ঘণ্টা জাহাজ চলাচলের সুযোগ রয়েছে। পুরো প্রকল্পকে স্বল্প মেয়াদি, মধ্যম মেয়াদি ও দীর্ঘ মেয়াদি এই তিন ভাগে ভাগ করে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানের দেশীয় ও আঞ্চলিক বন্দর সুবিধা সৃষ্টির মধ্য পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপনের লক্ষ্যে দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ঢাকা থেকে পায়রা পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ, একটি এলএনজি টার্মিনার, ১টি লিকুইট বাল্ক টার্মিনার, জাহাজ ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা সংবলিত ডকইয়ার্ড নির্মাণ, বিমান বন্দর নির্মাণ, কুয়াকাটা কেন্দ্রিক পর্যটন ও রফতানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকা স্থাপন।

একটি পোর্ট মানে শিল্পাঞ্চল। একটি পোর্ট মানে একটি দেশ। একটি আধুনিক পোর্ট একটি দেশ পর্যন্ত চালাতে পারে। আর পুরো প্রকল্প চালু হলে অন্তত ৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। শুধু কর্মসংস্থান হিসাব করে এ বিষয়টি বোঝানো যাবে না। সিঙ্গাপুর, বাংলাদেশের, চট্টগ্রাম কিংবা খুলনার, মংলা বন্দরের কথা চিন্তা করলে বোঝা যাবে একটি সমুদ্র বন্দর হলে কী ধরনের উন্নয়ন হয়। সেখানে পায়রা বন্দর হবে আরো আধুনিক ও কার্যকর। তিনি আরো বলেন, পৃথিবীতে যত বাণিজ্যিক শহর রয়েছে এর পেছনে রয়েছে সমুদ্র বন্দর। তা ছাড়া এখানে একটু ড্রেজিং করলেই সর্বোচ্চ ১৬ মি. ড্রাফট (পানিতে নিমজ্জিত জাহাজের গভীরতা) জাহাজ নোঙর করতে পারবে। যা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বা খুলনা ১০ মিটারের নিচে ড্রাফট জাহাজ নোঙর করতে পারে। আর এখন একটি সমস্যা হলো জেটি। জেটি না থাকায় মালামাল নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। রাতে গভীর সমুদ্র থেকে জাহাজ চলাচলের জন্য লাইট বয়া দেয়া হয়। সেগুলো মাছ ধরার জেলেরা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলে। আর যাদের জমি পায়রা বন্দরের নেয়া হয়েছে ও জলোচ্ছ্বাসে এবং বেড়িবাঁধের বাইরে যারা থাকে তাদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে চার হাজার হাউজিং করে বসবাস করার ব্যবস্থা করা হবে। মোট কথা এই সমুদ্র বন্দর সম্পূর্ণভাবে চালু করা গেছে পৃথিবীর প্রায় সব ধরনেরই জাহাজের পণ্য খালাসের সুবিধা থাকবে। মহাপরিকল্পনা নিয়ে ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর, জাতীয় সংসদে পাস হয় পটুয়াখালীর পায়রা সমুদ্র বন্দর প্রকল্প। একই বছরের ১৯ নভেম্বর বন্দরের ভিত্তি ফলক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৬ সালের ১৩ নভেম্বর দেশের তৃতীয় সমুদ্র বন্দর হিসেবে আনুষ্ঠিক যাত্রা শুরু করেছে পায়রা সমুদ্রবন্দর। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরে বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রম উদ্বোধন করেন তিনি। পদ্মা সেতুর পাথর নিয়ে আসা এমভি ফরচুন বার্ড থেকে পণ্য খালাসের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হয় পায়রার। দেশের তৃতীয় এই বন্দর নির্মাণ করে এ অঞ্চলকে বিশেষ একটি অর্থনৈতিক জোন গড়ে তুলতে হাতে নেয়া হয়েছে মহাপরিকল্পনা।