ঝালকাঠিতে লিগ্যাল এইড’র সহায়তায় মুক্তি পাওয়া নরীদের কথা

প্রকাশিত: ৫:৫৪ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২৮, ২০১৮ | আপডেট: ৫:৫৪:পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২৮, ২০১৮
ঝালকাঠিতে লিগ্যাল এইড’র সহায়তায় মুক্তি পাওয়া নরীদের কথা

পুলিশ ইন্সপেক্টরের ইঞ্জিনিয়ার ছেলে এমন প্রস্তাবের কথা শুনে এবং ছেলে পক্ষের অনুরোধে ২০১৬ সালের জুলাই মাসে ১লাখ টাকা দেন মোহর ধার্য করে আমাকে বিবাহ দেয়া হয়। স্বামী মোঃ হাসিবুর রহমান আবুল খায়ের স্টীল কোম্পানীতে চাকুরী করে। পরে জানতে পারি সে টেকনিশিয়ান। বিবাহের ৪ মাস পর থেকেই দিনের বেলার সব কাজ শেষ করে রাতে শ্বশুরের পা চেপে দেয়া, শরীরে তেল মালিশ করাসহ তার সেবা করতে হতো। দিনে-রাতে কখনোই বিশ্রাম না দিয়ে এভাবে দীর্ঘদিন কঠোর পরিশ্রমের ফলে অসুস্থ্য হয়ে পড়ি। ডাক্তার দেখালে রক্ত শূন্যতা ও শরীর দুর্বল থাকায় আমাকে সাড়ে ৯শত টাকা দামের একটি স্যালাইন শরীরে পুষ করতে দেয়া হয়। এরপর আমি সুস্থ্য হয়ে উঠি। এরপর থেকে শুরু হয় বাবার বাড়ি থেকে টাকা নেয়ার চাপ। না দিতে পারায় তারা আমাকে শারিরীকভাবে নির্যাতন করতো। বাবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তার উপড় দুই বিয়ে। বাবা বড় মায়ের দিকে বেশি খেয়াল ও যতœ নিতেন আর আমাদের সাথে বৈষম্য মূলক আচরণ করতেন। এ সুযোগে আমার উপর শ্বশুর বাড়ির লোকেরা নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়।
একবার শ্বশুর অসুস্থ্য হয়ে পড়লে বরিশাল মেডিকেলে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়। সেখানে আমার ননদ বা শ্বাশুরী কেউ না থেকে আমাকে সবসময় সেবা শুশ্র“ষা করার জন্য রাখা হয়। এসময় তিনি আমার সাথে চরিত্রহীনের মতো আচরণ করতেন। স্বামীর কাছে বললে সে শান্তনা মূলক কোন কথা না বলে উল্টো আমাকে ধমক দিতেন। ননদদের কাছে বললে তারা হত্যার হুমকি দিতো। নির্যাতনের মাত্রা সইতে না পেরে পিত্রালয়ে চলে আসি। অনেক পরিমানে ঘুমের ঔষধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করি। মা সদর হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করানোর ফলে সুস্থ্য হই। পরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেই।
এরই মধ্যে লিগ্যাল এইডের কথা শুনে জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনের নীচ তলার কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে আমাকে একটি দরখাস্ত দিতে বলেন। তাদেও কথামত দরখাস্ত দিলে কর্তৃপক্ষ নোটিশ দিয়ে উভয় পক্ষকে ডাকেন। আলোচনার মাধ্যমে চলতি বছরের মার্চ মাসের ১৫ তারিখে আমার ডিভোর্স হয়। বর্তমানে আমি ঝালকাঠি সরকারী মহিলা কলেজে ডিগ্রি ২য় বর্ষে পড়াশুনা করছি। বর্তমানে নানা বাড়ি থেকে প্রাপ্ত ৫ কাঠা জমির উপর কোনমতে টিনশেড ঘর তৈরী করে মা’কে নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছি। আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলেন লিগ্যাল এইডের উপকারভোগী মরিয়ম বেগম। সদর উপজেলার কির্ত্তীপাশা ইউনিয়নের কমলিকান্দর গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোঃ ওবায়দুর রহমানের ঔরশে কহিনুর বেগমের গর্ভে তার জন্ম।
রাজাপুর উপজেলার উত্তর বাঘড়ি গ্রামের পুলিশ ইন্সপেক্টর (অবঃ) আব্দুল হাকিমের পুত্র মোঃ হাসিবুর রহমান’র সঙ্গে বিয়ে হয়েছিলো এই মরিয়মের। লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সহকারী জজ মোঃ এনায়েত উল্যাহ উভয় পক্ষকে নোটিশ দিয়ে ডেকে দীর্ঘ দিনের কলহ থেকে সুষ্ঠ সমাধানের মাধ্যমে মুক্তি দেন।
অপরদিকে সদর উপজেলার ভাওতিতা গ্রামের মোকলেছ ব্যাপারীর পুত্র লুৎফর রহমানের সাথে ১৯৯৩ সালে ২০ হাজার টাকা দেনমোহরে বিয়ে হয় পার্শ্ববর্তি। ছিলারিশ গ্রামের আব্দুল কাদের জোমাদ্দারের মেয়ে রাবেয়া আক্তারের। বিয়ের সময় ছেলেকে স্বর্নের চেইন, আংটি, নগদ টাকা এবং মেয়েকে কানের দুল দিয়ে পাত্রস্থ করেন আঃ কাদের জোমাদ্দার।
রাবেয়া আক্তার জানান, শ্বশুর বাড়ির যৌথ সংসারে অবিবাহিত ৩ ননদের যাতনায় ১ বছর পরে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে ঝালকাঠি শহরে ভাড়া বাসায় চলে আসি। স্বামী দিন মজুরের কাজ করতেন। ১ দিন কাজ করলে ২ দিন বাসায় শুয়ে থাকতেন। এভাবে সাংসারিক জীবনের ৩ বছরের মধ্যে প্রথম সন্তান রোজি’র জন্ম হয়। বেড়ে যায় সংসারের খরচ। অতি কষ্টে স্বামীর সংসার চলতে থাকে। ৪ বছর পরে দ্বিতীয় সন্তান নয়ন’র জন্ম হয়। তার ৩ বছর পরে তৃতীয় সন্তান সাইদ’র জন্ম হয়।
সংসার পরিচালনা, সন্তানদের খরচ চালাতে না পেরে ২০০৯ সালে তিনি আত্মগোপন করেন। মানুষের বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করে সন্তানদের লালন পালন এবং পড়াশুনা করাই। ২০১১ সালে স্বামী লুৎফর রহমান আরেকটি বিয়ে করে ফিরে এসে নতুন বউ নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ওঠেন। যখন নতুন বউ নিয়ে আসেন তখন আমার বড় সন্তান রোজি খুবই অসুস্থ্য। তাকে নিয়ে সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যাই। ওই সময় আমার পথ রোধ করে বলে দেখ তোকে দিয়ে কিছু হবে না, তাই নতুন আরেকটা বউ নিয়ে এসেছি। সন্তান অসুস্থ্যের কথা বলার পরও সে আমার পথ আটকে রাখে। এসময় স্থানীয় এক দোকানী আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে যেতে সহায়তা করেন। তারপরেও স্বামীর কথা চিন্তা করে সংসার জীবন পার করার কথা ভাবি। কোনভাবেই সুফল না আসায় শ্বশুর বাড়িতে গেলে তারাও আমাকে আশ্রয় দেয় নাই। এসময় উপায়ন্তুর না ভেবে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেই।
২০১৩ সালে লিগ্যাল এইড অফিসে গিয়ে আমার এই জীবন কাহিনী বর্ণনা করলাম। তখন আইজীবী মোর্শেদা আক্তারের মাধ্যমে পারিবারিক মোকদ্দমা (নং-৬৮/১৩) দায়ের করি। আরেক আইনজীবী সাকিনা আলম লিজার মাধ্যমে যৌতুক ও ভরণ পোষণের মোকদ্দমা (নং-২১৪/১৩) দায়ের করি। আইজীবীদের সহায়তা সূলভ ব্যবহার ও বিনা খরচে মামলা পরিচালনা করি। আদালত মামলার প্রক্রিয়া ও স্বাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে পারিবারিক মামলায় তাকে ২ বছরের দন্ড এবং ভরন-পোষণ মামলায় ১ লাখ ৬৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।দুই বছরের দন্ডের ১ মাস কারাভোগ করে আদালতে লুৎফর আপিল করলে আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেন।
রাবেয়া বেগম বর্তমানে শহরের লঞ্চঘাট এলাকায় একটি টিনের বাসায় ১ কন্যা ও ২ পুত্র সন্তান নিয়ে বসবাস করেন। বড় সন্তান রোজি বেগম নিন্ম মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। মেঝ সন্তান নয়ন (১৫) একটি বেকারীতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। ছোট ছেলে সাইদ সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে ৭ম শ্রেণিতে পড়াশুনা করে। শুধু মরিয়ম আর রাবেয়াই নন এরকম আরো অনেকে ঝালকাঠি জেলা লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে বিনা খরচে আইনী সহায়তা পেয়েছেন। ভুক্তভোগী, সুবিধাভোগী ও ঝালকাঠি জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয় সূত্রে এ সব তথ্য জানাগেছে।