নির্বাচনের আগে আ’লীগের বিদেশ মিশন

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৭:১৬ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২৩, ২০১৮ | আপডেট: ৭:১৬:পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২৩, ২০১৮
নির্বাচনের আগে আ’লীগের বিদেশ মিশন

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিদেশ মিশনে রয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তারই অংশ হিসেবে প্রভাবশালী দেশগুলো সফর করছেন দল ও সরকারের প্রতিনিধিরা। এসব সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের কথা বলা হলেও আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের একটি টিম বর্তমানে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছে। আজ সোমবার তাদের দেশে ফেরার কথা রয়েছে। তবে দেশে ফিরে আগামী বৃহস্পতিবারই অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে দেশ ত্যাগ করবেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি নিউজিল্যান্ডও সফর করতে পারেন। অন্য দিকে দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে ১৯ সদস্যের একটি টিম বর্তমানে ভারত সফরে রয়েছে। এ টিমে দলের তিনজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকসহ কেন্দ্রীয় নেতারা রয়েছেন। গতকাল রোববার সকালে তারা দিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। এ ছাড়া দলের আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা: দীপু মনি ও সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী লন্ডন সফরে রয়েছেন।

সম্প্রতি ভারত সফর করে এসেছে দলের তিন সদস্যের আরেকটি টিম। তার আগে পরপর দুই দফায় চীন সফর করেছে আরেক টিম। আগামী নির্বাচনের আগ পর্যন্ত এ রকম সফর আরো হতে পারে। এ ছাড়া প্রভাবশালী দেশগুলোর প্রতিনিধিরাও বাংলাদেশ সফরে আসতে পারেন বলে জানা গেছে। এসব সফরকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে স্বাভাবিক তৎপরতা হিসেবে বলা হচ্ছে সরকার ও দলের তরফ থেকে। ভারত সফর নিয়ে শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘এ সফরে দ্বিপক্ষীয় অনেক বিষয়ে আলাপ হবে। তবে নির্বাচনের বিষয়ে আলাপের কোনো অ্যাজেন্ডা নেই। আর ভারত এ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না।’

আওয়ামী লীগ ও সরকারের একাধিক সূত্র জানায়, বেগম খালেদার কারাবাস ও সরকারের দমনপীড়নের মুখে দেশের রাজনীতিতে একধরনের গুমোট অবস্থা বিরাজ করছে। বিরোধীদের আদালতের বারান্দায় ব্যস্ত রেখে রাজনীতির মাঠ নিজেদের দখলে রেখেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। আগামী নির্বাচন পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত রেখে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চায় সরকার। তবে সরকারের এ রকম কঠোর অবস্থানের কারণে বিরোধীরা আপাতত কোণঠাসা হলেও আগামী নির্বাচনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা কী হবে তা নিয়ে বেশ চিন্তিত ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তৎপর হয়ে উঠেছে বলে সরকারের কাছে বিভিন্ন ধরনের খবর রয়েছে। সে জন্য বিএনপিকে দমনের সাথে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও ‘ম্যানেজ’ করার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিকদের সাথে বৈঠক ও যোগাযোগ রক্ষা এবং বিদেশে সভা-সেমিনারে দল ও সরকারের প্রতিনিধিদের পাঠিয়ে বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্ক আরো উষ্ণ করার কৌশল নেয়া হয়েছে।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী সব দেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে আওয়ামী লীগ। সেই লক্ষ্যে যা কিছু করার সবই করা হচ্ছে। তবে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে এমন রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক আরো বেশি মজবুত করতে চায় সরকার। এ ক্ষেত্রে প্রতিবেশী ভারত, উন্নয়ন অংশীদার চীন এবং রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ প্রভাবশালী দেশগুলো টার্গেট করে এগোচ্ছে তারা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সামরিক মহড়া পরিদর্শনে সম্প্রতি সৌদি আরব সফর করেন। সেখান থেকে কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগ দিতে যুক্তরাজ্যে যান তিনি। সেখানে কমনওয়েলথ সদস্য দেশগুলোর সরকারপ্রধানের পাশাপাশি প্রতিবেশী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে একান্ত বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। আজ সোমবার তার দেশে ফেরার কথা রয়েছে। আর দেশে ফিরেই বৃহস্পতিবার আবার অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে পাড়ি জমাবেন এবং সেখান থেকে নিউজিল্যান্ডও সফর করতে পারেন তিনি।

অন্য দিকে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ১৯ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল গতকাল ভারত পৌঁছেছে।
ভারতে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) আমন্ত্রণে প্রতিনিধিদলটি দেশটিতে সফরে গেছে। সফরকালে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিরা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, লোকসভার স্পিকার সুমিত্রা মহাজন ও বিজেপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে।

প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা হলেনÑ প্রেসিডিয়াম সদস্য পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য্য, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, এ কে এম এনামুল হক শামীম, মিসবাহউদ্দিন সিরাজ ও মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, দফতর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ, প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহমেদ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক আবদুস সবুর, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদক রোকেয়া সুলতানা, উপপ্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন এবং সদস্য গোলাম কিবরিয়া রাব্বানী চিনু।

এ সফর উপলক্ষে শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘এটি মূলত পার্টি টু পার্টি প্রোগ্রাম। এখানে তাদের সঙ্গে আমাদের বোঝাপড়া বাড়বে। স্বার্থ ছাড়া সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। তিস্তাসহ অভিন্ন নদ-নদী ও সন্ত্রাস দমনে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হবে।’ আগামীকাল মঙ্গলবার প্রতিনিধিদলটি ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে।
জানা গেছে, এ সফরটি মার্চের ১১ তারিখে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকের তারিখ ঠিক করতে না পারায় এ সফর পেছানো হয়েছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বিজেপির আমন্ত্রণে আওয়ামী লীগ নেতারা ভারত সফরে গেলেও এ সফরের মূল উদ্দেশ হলো আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিবেশী এ প্রভাবশালী রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক জোরদার করা। এর মাধ্যমে বিশেষ করে ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপির সাথে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক আরো পোক্ত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এ সফরে খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গও স্থান পেতে পারে।

দলের আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা: দীপু মনি এবং সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছেন। তবে তাদের এ সফর ব্যক্তিগত বলে দলীয় সূত্র দাবি করছে।
এর আগে অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির আমন্ত্রণে গত ১৭ ও ১৮ মার্চ ভারত সফর করেছে আওয়ামী লীগের তিন সদস্যদের প্রতিনিধিদল। এ দলে ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা: দীপু মনি ও উপ-দফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়–য়া। সেখানে তারা কংগ্রেসের নতুন সভাপতি রাহুল গান্ধী ও সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দলের দায়িত্ব নেয়ার পর রাহুল গান্ধীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদলের এটিই ছিল প্রথম সাক্ষাৎ। এতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মাধ্যমে বিরোধী দলে থাকা কংগ্রেসের সাথেও সম্পর্ক পুনঃসংস্কারের চেষ্টা করে আওয়ামী লীগ।
তারও আগে গত বছর ১৯ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের ১৯ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে চীন সফর করে। এ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কর্নেল (অব:) ফারুক খান এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা: দীপু মনি।

আওয়ামী লীগের সিনিয়র কয়েকজন নেতা জানান, কূটনেতিক সম্পর্কোন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এর মাধ্যমে বিএনপি জোটবিহীন ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের কারণে সৃষ্ট দূরত্ব ঘোচাতে চান তারা। এ ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে একটি বড় ধরনের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো হচ্ছে, যা ইতোমধ্যে বিশ্ব সম্প্রদায়ের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের দু’জন সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যুতে তুরস্কসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশের সাথে আওয়ামী লীগ সরকারের সম্পর্কের অবনতি হয়। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে সেই সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। তুরস্কের ফার্স্ট লেডি রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দিতে বাংলাদেশে সফরে এসে বর্তমান সরকারের প্রশংসা করেছেন। তুরস্কের রাষ্ট্রপতিও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সাথে ফোনে আলাপ করে পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন। এ ছাড়া পুরো মুসলিম বিশ্ব এখন বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন পশ্চিমা দেশও সরকারের পাশে রয়েছে। এককথায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে দু-একটি দেশ ছাড়া প্রায় পুরো বিশ্ব শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়িয়েছে। শেখ হাসিনাকে মানবিক নেত্রী হিসেবেও আখ্যায়িত করছেন কেউ কেউ। আর এ সুযোগ কাজে লাগাতে চায় সরকার। আগামী নির্বাচন পর্যন্ত এ সমর্থন ধরে রাখতে চান সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। সে জন্য বিদেশ সফর ও নিয়মিত যোগাযোগসহ বিভিন্ন ধরনের কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।

এক মাসের মাথায় পরপর দু’বার ভারত সফর সম্পর্কে জানতে চাইলে ক্ষমতাসীন দলটির একজন সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সাথে কংগ্রেসের একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। সেই সম্পর্ক ধরে রাখতে সম্প্রতি কংগ্রেসের আমন্ত্রণে ভারত সফর করেছে আওয়ামী লীগের টিম। আবার ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সাথেও সম্পর্ক জোরদার করতে চায় আওয়ামী লীগ। সে জন্য বিজেপির আমন্ত্রণে এবার আরেকটি টিম গেছে।’