আমার চ্যালেঞ্জ প্রত্যেক কর্মজীবী মায়ের মতোই

বিশেষ সাক্ষাৎকারে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৬:৫৩ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২২, ২০১৮ | আপডেট: ৮:৩৫:পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২২, ২০১৮
আমার চ্যালেঞ্জ প্রত্যেক কর্মজীবী মায়ের মতোই

জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেছেন, আমার চ্যালেঞ্জ প্রত্যেক কর্মজীবী মায়ের মতোই অভিন্ন। নিজের ঘর সামলে আমাকে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজ হাতে আমাকে তুলে এনেছেন। তিনি আমাকে আস্থায় নিয়ে এভাবে দায়িত্ব না দিলে কতদূর আসতে পারতাম জানি না। রাজনীতির মতোই সংসারেও প্রতিটি মুহূর্ত ব্যালান্স করতে হয়। আমরা যে দায়িত্বেই থাকি না কেন সেই দায়িত্বের একটা চাহিদা আছে। নিজের পেশা সামলে একজন মহিলার জন্য সেটা পূরণ করা অনেক কঠিন। পুরুষরা যখন দায়িত্ব পালন করেন তখন গৃহিণী তাদের সংসার সামলান। নারীর তো কোনো গৃহিণী নেই। নারীকে বাইরে পেশার কাজ সেরে ঘরের কাজটাও সামলাতে হয়। নারীর কোনো ছুটি নেই। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শিমুল মাহমুদ আহমদ সেলিম রেজা

 

আপনার সাফল্যের নেপথ্য প্রেরণা কে? স্বামী-শ্বশুর-বাবা-মা বা সন্তান আপনার জীবনে কে বেশি সাপোর্টিং?

আজকের জায়গা থেকে পেছন ফিরে চাইলে দেখব বাবা-মা দুজনেরই অবদান আছে। বাবা তো সময় পাননি। বাকিটুকু তো মা-ই টেনে এনেছেন। অর্থাৎ ছোটবেলায় যদি লেখাপড়া করার সুযোগ না পেতাম, তাহলে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এ পর্যায়ে আসার সুযোগ তৈরি হতো না। বাবা-মা শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। আমি হলিক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রী ছিলাম। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে পড়েছি। অনার্সে পড়ার সময় আমার বিয়ে হয়। আমি যখন এলএলএম করি তখন আমার শ্বশুরবাড়ির সহযোগিতা পেয়েছি। তারপর পিএইচডিও করেছি। এক্ষেত্রে আমার শ্বশুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ বদরুদ্দিন হোসেইনের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আমার মা মরহুম অধ্যাপক নায়ার সুলতানা বলতেন, আমি নিজে একজন প্রফেসর, সারা জীবন অন্যের সন্তানদের পড়িয়েছি, আমার সন্তান লেখাপড়া না শিখলে কীভাবে হবে? বাবা মরহুম রফিকউল্লাহ চৌধুরী সব সময় লেখাপড়ায় উৎসাহ দিয়ে বলতেন, তোমরা জীবনে বড় হবে, বড় হয়ে আইন বিষয়ে পড়বে। আইন পেশা স্বাধীন পেশা। তাই আইনজীবী হবে। কিন্তু বাবাকে আমরা অল্প বয়সে হারিয়েছি। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। তার পরের সময় ছিল খুবই কঠিন। তখন মা-ই টেনে এনেছেন। আমার মা ছিলেন ইডেন কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগীয় প্রধান ও প্রথম নারী অধ্যক্ষ। তিনি ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। পরে তিনি শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক ও পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মেম্বার ছিলেন। আমার স্বামী সৈয়দ ইশতিয়াক হোসেনকেও আমি অবশ্যই ধন্যবাদ দেব। কারণ তিনিও এই বিষয়গুলোতে কোনো দিন কোনো বাধা দেননি। আমার মেয়েটা যখন ছোট ছিল, আমি তখন আইন পেশায় যুক্ত হলাম, সুপ্রিম কোর্টে আমি ১৫ বছর প্র্যাকটিস করেছি। আইনজীবী হিসেবে নিজেকে দাঁড় করানোটাও কিন্তু কঠিন একটা চ্যালেঞ্জ। কারণ মেয়েদের অনেকেই শিক্ষকতায় চলে যেতেন বা অন্য কোনো করপোরেট সেক্টরে লিগ্যাল অ্যাডভাইজারের পদে চলে যেতেন। কিন্তু আমরা সাহস করে প্র্যাকটিসটা ধরে রেখেছি, নিজে একটা কিছু করব বলে। সেটা করতে আমাদের দীর্ঘ সময় চেম্বারে দিতে হতো, কোর্টে দিতে হতো। মামলা তৈরি করা এত সহজ ছিল না। অনেক সময় লাগত, অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করতে হতো। এক্ষেত্রে পরিবারের ভিতর থেকে কোনো বাধার সম্মুখীন হইনি। আমার ছেলে, মেয়ে, তারা তো ছোট থেকেই আমাকে কাজে দেখেছে। কাজেই তাদের কাছে এটা নৈমিত্তিক বিষয় ছিল, মা তো কাজেই থাকে। তারাও সবসময় সাপোর্ট করেছে। কোনো সময় যদি অভিযোগ করত, তাহলে হয়তো মা হিসেবে আমার মনে একটা কষ্ট থাকত। আমার চ্যালেঞ্জ সেখান থেকেও কম ছিল না। কেননা আমার বাচ্চারা যখন বাসায় ফিরে আসত তখন তারা টেবিলে একা বসেই খেত। আমি তো আর সব দিন ওখানে থাকতে পারতাম না। কারণ সময় মেলানো যায় না। দায়িত্বের বিষয় থাকে। ছোটখাটো ছাড় তো পরিবারকে অনেক ক্ষেত্রেই দিতে হয়েছে। মহিলারা যারা কর্মে থাকেন, তাদের এগুলো ফেস করতেই হয়। আমার চ্যালেঞ্জও প্রত্যেক কর্মজীবী নারীর মতোই। তবে এসব ক্ষেত্রে সবার সাপোর্ট পেয়েছি বলেই সফলতার ভিত রচিত হয়েছে।

 

রাজনীতিতে আসার নেপথ্যে আপনার প্রেরণা কে?

আমাদের বাড়িতে সবসময় রাজনীতির চর্চা হতো। রাজনৈতিক আলোচনা যেমন ন্যাশনাল পলিটিক্স, ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স নিয়ে আমাদের বাড়িতে সবসময় আলোচনা চলত। বাবা ছাত্রজীবনেই রাজনীতি করতেন, ছাত্রলীগ করতেন। তাই রাজনীতিতে আসার প্রেরণা আসলে আমার বাবা রফিকউল্লাহ চৌধুরী। খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন তিনি। ’৫৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়াশোনা করেন তখন তিনি ছাত্রলীগের প্রথম নির্বাচিত সভাপতি। সরাসরি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তিনি রাজনীতি করেন। তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে থাকতেন। একটা পর্যায়ে জাতির পিতা তাকে বলেছিলেন, তুমি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দাও। প্রশাসনে আমার লোক দরকার। ১৯৬১ সালে তিনি পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে কোয়ালিফাই করেন। চাকরিতে যোগ দেন। স্বাধীনতার পর দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান বাবাকে প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব দেন। কিন্তু ১৯৭৫-এর পর সব উলট-পালট হয়ে যায়। বাবা যেটা করতে চেয়েছিলেন সেটা তিনি করতে পারেননি। সেটা আমি করছি। একদিকে প্রফেশনাল হিসেবে আইনজীবী পেশায় আসলাম, অন্যদিকে কমনওয়েলথ স্কালারশিপ নিয়ে ইংল্যান্ডে গেলাম, ইউকে এসেক্স ইউনিভার্সিটি থেকে আমি সাংবিধানিক আইন ও মানবাধিকারের ওপর পিএইচডি করলাম। ফিরে এসেও আইনজীবী হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সঙ্গেও কাজ করতাম। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী সেলের সঙ্গে কাজ করতাম, যে জায়গা থেকে একজন আইনজীবী হিসেবে সহযোগিতা করা যায়, সে জায়গাগুলোতে আমি সবসময়ই সক্রিয় থাকতাম। ওয়ান-ইলেভেনের সময় নেত্রীকে গ্রেফতার করা হয়, তখন তার আইনজীবী প্যানেলে আমিও ছিলাম। সেখান থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে এগিয়ে এনেছেন। বলতে গেলে  তিনি আমাকে নিজ হাতে ধরে তুলে এনেছেন। নেত্রী যদি আমাকে এভাবে এগিয়ে না আনতেন, তাহলে হয়তো আমি কতদূর অগ্রসর হতে পারতাম, সেটা বলতে পারি না।

 

রাজনৈতিক জীবন ব্যক্তিগত কাজে প্রভাব ফেলে, আপনার অভিজ্ঞতা কী?

ইট ইজ অলওয়েজ আ কোশ্চেন অব ব্যালান্সিং। কারণ, মানুষের জীবনে সময় অফুরন্ত থাকে না। সে সময়টাকে আপনি কীভাবে ম্যানেজ করবেন? আপনি আইনজীবী হন, রাজনীতিবিদ হন বা যে দায়িত্বেই থাকেন না কেন, সে দায়িত্বের একটা চাহিদা আছে। সে চাহিদাটা অনেক সময় আপনার কমিটমেন্টের ওপর নির্ভর করে। কমিটমেন্টে যদি আপনি সিরিয়াস না হন, আপনাকে ফেল করতে হবে। একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি, আমার মেয়ে যখন ছোট ছিল, তখন কোর্টে যেতাম, কোর্ট শেষ করে যখন বাসায় আসতাম, তখন যে বুয়াটা মেয়েটাকে দেখত, আমি আসার সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চাটাকে আমার কোলে দিয়ে দিত, তার ছুটি। সে মনে করত আমি তো এতক্ষণ দেখলাম, আর আপা তো এখন আসছেই। আপা যে কোথা থেকে আসছে, আপা যে বেড়াতে যায়নি এতক্ষণ, আপা যে একটা কঠিন কাজের মধ্য থেকে এসেছে, সেটা দেখার তার সময় নেই। ফলে সেই জায়গাটাতে কোনো ছাড় নেই আপনার। বাচ্চাটাও তখন ছাড়বে না আপনাকে। সে অনেকক্ষণ পর তার মাকে কাছে পেয়েছে। এই দায়িত্ব থেকে কিন্তু একজন নারীর ছুটি নেই। আপনি যদি দিনের দিকে সময় দিতে না পারেন, সেটাকে অন্যসময় আপনাকে কমপেনসেট করতেই হবে। রাতে তাকে ঘুম পাড়াতে আপনাকে যেতেই হচ্ছে। সে হয়তো সারাদিন আপনাকে ছাড়া থাকবে কিন্তু আপনাকে ছাড়া সে ঘুমাবেই না। এ জায়গাতে আমাদের সবসময় একটা ব্যালান্স করতে হয়।

 

আপনার সন্তানের কাছে আপনার চাওয়া কী?

আমার জন্য কিছু করতে হবে ওদের কাছে এমন কোনো চাওয়া নেই। ওরা ভালো মানুষ হবে। নিজেদের জীবনটা নিজেরা গড়বে। তাদের মধ্য দিয়ে অন্য মানুষের সাহায্য হবে এবং দেশকে ভালোবাসবে। এই জিনিসগুলো যদি ওদের কাজ ও আচার-ব্যবহারে দেখতে পাই, তাহলেই আনন্দিত হব। বুঝব যে মূল্যবোধগুলো তাদের মধ্যে দিতে চেয়েছি, সেগুলো তারা পেয়েছে।

 

এমন একটি স্মৃতির কথা বলেন, যা আপনাকে কষ্ট দিয়েছিল?

আমি যখন কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন-সিপিএ’র চেয়ারপারসন ছিলাম, সেখানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমার অনেক কমিটমেন্ট ও সিরিয়াস দায়িত্ব ছিল। তো সেই সিপিএ’র একটা সম্মেলন যেটা আফ্রিকাতে অনুষ্ঠিত হবে। এটা ছিল আফ্রিকান রিজিওনাল কনফারেন্স। এই সম্মেলনটা হবে কেনিয়ার নাইরোবিতে। আমি যে ফ্লাইটে সেখানে যাচ্ছি সেই ফ্লাইটে আমার মেয়ে ইউএসএ থেকে একটা ছোট ছুটিতে এসেছিল বাংলাদেশে। সে ইউএসে পড়ে। তো যেই ফ্লাইটে আমার মেয়ে এসেছে আমি সেই ফ্লাইটে আফ্রিকা চলে গেছি। আমাকে যেতে হয়েছে। ঘটনাটা এমনই ছিল, ওর ছুটির সঙ্গে আমার প্রোগ্রাম ক্ল্যাশ করেছে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই আমার সে কনফারেন্সটা বাদ দেওয়ার সুযোগ ছিল না। একজন মা হিসেবে সেদিন আমি খুবই মর্মাহত ছিলাম, আমার অন্তরে অনেক কষ্ট ছিল। অন্যকিছু হলে কোনোভাবেই আমি সেখানে যেতাম না। এ ধরনের অনেক ডিলেমা অনেক সময় করতে হয়। তারপরেও লাইফ ইজ অল এবাউট প্রাইওরিটি অ্যান্ড  ইউর চয়েস।

 

স্পিকার হিসেবে দেশে বিদেশে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছেন; এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

সুনাম তো ভালোই লাগে। তবে অনেক আলোচনা সমালোচনার মধ্যে আমি স্পিকার হিসেবে শপথ নিই। আমি মনে করি, ৪৬ বছর বয়সে একজন নারী এই পদে এলে সমালোচনা থাকাই স্বাভাবিক। এটা আমাকে দায়িত্ব পালনে সিরিয়াস হতে সাহায্য করেছে। মনে রেখেছি সফল স্পিকার হতে হলে সংসদ সদস্যদের টেম্পারমেন্ট বুঝতে হবে। এটা যদি আপনি ঠিকভাবে নির্ণয় করতে না পারেন, আপনি কখনো হাউস সুন্দরভাবে পরিচালনা করতে পারবেন না। এখানে ৩৫০ জন মানুষ বসে আছেন। এদের একেকজনের চিন্তা একেক রকম, একেক দলের ভাবনা একেক রকম, আদর্শগত অবস্থান একেক রকম। এসব কিছুকে স্পেস দিয়ে যথেষ্ট সমন্বয় করতে হয়। আমি তা করার চেষ্টা করছি।

 

জনগণের জন্য কাজ করতে মন্ত্রী না স্পিকার, কোন পদটি উপভোগ করছেন?

আমি মনে করি, দেশের জন্য প্রত্যেকটা মানুষ অবদান রাখছে। দেশের জন্য কাজ করতে মন্ত্রী হতে হবে, স্পিকার হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আজকে যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের পথে পা বাড়িয়েছে, এটা তো কারও একক প্রচেষ্টায় নয়। তবে উভয় পদে দায়িত্বের ভিন্নতা আছে। একটি সাংবিধানিক, অপরটি নির্বাহী দায়িত্ব। আমি উভয় দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছি।

 

সংসদ পরিচালনা করতে গিয়ে কখনো বিব্রতবোধ করেছেন কি?

বিব্রতবোধ করিনি। তবে অনেক সময় সংসদ পরিচালনা করতে গিয়ে অনেক সিদ্ধান্ত খুব তাত্ক্ষণিকভাবে নিতে হয়। সেক্ষেত্রে কিন্তু স্পিকার কোনো স্বেচ্ছাচারিতা করতে পারেন না। অনেকে মনে করেন উনি চাইলেই একটা কিছু করতে পারেন। কিন্তু না উনি চাইলেই কিছু করতে পারেন না। কারণ, ওনার হাত সংবিধান, কার্যপ্রণালি বিধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এ ছাড়া অনেক প্রিসিডেন্ট ও কনভেনশন আছে, সেগুলো স্পিকারকে সবসময় মাথায় রাখতে হয়। আপনি চাইলেই আপনার ভালো লাগল না বলে আপনি তা করতে পারেন না। যেমন মাইক অফ করে দেওয়া। স্পিকার চাইলে দিতে পারেন কিন্তু আমাকে বিবেচনায় রাখতে হয় তিনি জনপ্রতিনিধি। তাই অকারণে আমি তার বাক-স্বাধীনতাকে থামিয়ে দিতে পারি না। যদি দেখি উনি একাধারে এমন ভাষা ব্যবহার করছেন যেটা সংসদীয় ভাষা নয়, তখন আমি ২৭০ বিধির প্রতি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করি। যেমন নারীদের নিয়ে কেউ কোনো অপ্রীতিকর শব্দ প্রয়োগ করলে সেটা সঙ্গে সঙ্গে একপাঞ্চ করে দিচ্ছি। এ ছাড়া আমাদের সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে যেসব আলোচনা হয় এটা স্ট্রিক্ট সেন্সে পয়েন্ট অব অর্ডার হয় না। অনির্ধারিত আলোচনাই হয় বলতে পারেন। তবে এই প্রথাটা আগে থেকেই চলে আসছে। এটা আমাদের দেশের সংসদে নয়, অনেক দেশের অনেক সংসদেই এই প্র্যাকটিস আছে। অনেক সংসদে এ জন্য জিরো আওয়ার থাকে, যেখানে অনির্ধারিত আলোচনার সুযোগ থাকে।

 

নবম ও দশম সংসদের মধ্যে আপনার বিবেচনায় কী পার্থক্য চোখে পড়েছে?

নবম সংসদের শেষ দিকে আমি দায়িত্ব পেয়েছি। তখন বিরোধী দল ছিল বিএনপি। একটি সেশনেই আমি তাদের পেয়েছি। বাজেট সেশনের পর তারা আর সংসদে আসেননি। তবে সংসদীয় ভাষার প্রয়োগে তখন যে অশালীনতার ব্যবহার দেখেছি, দশম সংসদে তা নেই। বিরোধী দল গঠনমূলক ভূমিকা পালন করছে।

 

আইন প্রণয়নে হ্যাঁ-না বলা ছাড়া সংসদে সরকারি দলের কোনো ভূমিকা নেই আপনার মত কী?

না, এটা ঠিক নয়, কারণ স্থায়ী কমিটিতে সরকার দলের এমপিরা আছেন। প্রতিটি আইন উত্থাপন হওয়ার পর স্থায়ী কমিটিতে যায় এবং সেখানে আইনগুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়। সেখানে অবশ্যই সরকারি এমপিরা ভূমিকা রাখছেন এবং আইন পাসের সময় বলা হয় স্থায়ী কমিটি কর্তৃক স্থিরকৃত আকারে। একটি আইন মন্ত্রিসভা অনুমোদন করলে সংসদে উত্থাপিত হয়ে স্থায়ী কমিটিতে যায়, অতঃপর স্থায়ী কমিটি থেকে রিপোর্ট আসে সংসদে। সংসদে যদি আবার কোনো পরিবর্তন না করা হয় তাহলে স্থায়ী কমিটি কর্তৃক স্থিরকৃত আকারে আইনটি পাস হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে কমিটিতেই আইনের নামও পরিবর্তন হয়েছে।

 

সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকায় সংসদের ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন আছে। আপনার মন্তব্য কী?

আমি আপনার কাছে জানতে চাই, শক্তিশালী বিরোধী দল বলতে কী বুঝায়? আসলে কী, এটা আমাদের মাইন্ড সেট। বিরোধী দল বা সরকারি দল নির্ধারণ করার একমাত্র এখতিয়ার বা ক্ষমতা জনগণের হাতে। জনগণের ভোটের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয় এবং সংবিধানের রূপরেখায় সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সরকার গঠিত হয়। সরকারি দল বা বিরোধী দল কে হবে সেটা আগে থেকে বলা সম্ভব নয়। স্পিকারের এখানে কোনো ভূমিকা নেই। এখানে একমাত্র ক্ষমতা জনগণের, তারা যেভাবে ভোট দেবে- সেটার ওপর ফলাফল আসবে এবং সংসদের রূপরেখাও সেভাবেই হবে। যেমন এবার কিন্তু সংসদে অনেক স্বতন্ত্র সদস্য আছেন। এই সংখ্যা অন্যবারের চেয়ে বেশি। তাই সংসদের গঠন শেষ পর্যন্ত কেমন হবে, সেটা কারোর নিয়ন্ত্রণে নেই। এটা সম্পূর্ণরূপে জনগণের নিয়ন্ত্রণে।

 

তিন বছর সাফল্যের সঙ্গে আপনি সিপিএর চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় আপনি বিভিন্ন দেশের সংসদীয় রীতি-নীতি ও বিতর্ক প্রত্যক্ষ করেছেন। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ অত্যন্ত কার্যকর এবং সক্রিয়। সদস্য হিসেবে আমি জাতীয় সংসদ দেখেছি যখন আবদুল হামিদ সাহেব স্পিকার ছিলেন, নবম জাতীয় সংসদ প্রথমে সদস্য এবং পরে স্পিকার হিসেবে দেখেছি এবং দশম জাতীয় সংসদ দেখছি। আমি মনে করি মেধায়, যোগ্যতায়, দক্ষতায় আমাদের এমপিরা অত্যন্ত দক্ষ এবং তারা জনগণের জীবনমান এবং জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয়গুলোকে যত চমৎকারভাবে সংসদে উপস্থাপন করতে পারেন— সেটা খুবই আশাপ্রদ।

 

সংসদে স্পিকারের রুলিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে স্পিকারকে তা দিতে হয়। এ বিষয়ে আপনার অভিজ্ঞতা কী?

সমস্ত রুলিং একত্র করে একটি বই বের করা হচ্ছে। আমার সময়ে রুলিং দেওয়ার মতো খুব বেশি বিষয় উত্থাপিত হয়েছে, আমি তা মনে করি না। তারপরও দু-তিন জায়গায় যেখানে সুযোগ ছিল সেগুলো আমি দিয়েছি। তবে পূর্ববর্তী স্পিকারদের অনেক ধরনের রুলিং রয়েছে। সংসদ সচিবালয় থেকে সমস্ত রুলিং একত্রে সংকলিত করার একটি উদ্যোগ চাওয়া হয় এবং আমি মনে করি এটি খুবই ভালো একটি উদ্যোগ, সে কারণে আমরা এই উদ্যোগটা নিয়েছি এবং এটি প্রায় শেষের পর্যায়ে। এর জন্য আমরা একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছি, তারা এটা পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন, সেখানে আমাদের প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী সাহেব এবং বর্তমান ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া উভয়ে মিলে এই বইটির প্রস্তুতি দেখেছেন।

 

বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত আইপিইউ ও সিপিএর মতো বিশাল দুটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সাফল্য বাংলাদেশকে বিশ্বের সফল রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র কতটা উপকৃত হয়েছে?

বঙ্গবন্ধুর সময় থেকেই বাংলাদেশ আইপিইউ এবং সিপিএ’র সদস্য, কিন্তু দীর্ঘদিনের এই সম্পর্ক আরও বেগবান হয় যখন দশম জাতীয় সংসদের দুজন সদস্য আইপিইউর প্রেসিডেন্ট এবং সিপিএ’র চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। এর ফলে আইপিইউ এবং সিপিএ’তে আমাদের সক্রিয়ভাবে কাজ করার সুযোগ বৃদ্ধি পায়, যার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে আইপিইউ এবং সিপিএ’র সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ওপর যে বিশ্ববাসীর আস্থা আছে তাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র বিশ্বে একটি সম্মানিত স্থান পেয়েছে, যার ফলে বিশ্বের সব পার্লামেন্টের সদস্যরা দুবার বাংলাদেশে সম্মেলন করতে রাজি হয়েছেন।

 

মুসলিমপ্রধান দেশের স্পিকার হিসেবে নারীর ক্ষমতায়নে কীভাবে ভূমিকা রাখা সম্ভব?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৃতীয়বারের মতো নেতৃত্ব দিচ্ছেন। স্পিকার হিসেবে আমার মনোনয়ন, নির্বাচন ও দায়িত্ব গ্রহণ, নারীর ক্ষমতায়নকে এগিয়ে নিতে অবশ্যই বিশেষ ভূমিকা রাখছে। সারা বিশ্বেই অনেক মুসলিমপ্রধান দেশে নারী স্পিকার রয়েছেন। ইউনাইটেড আরব আমিরাতে নারী স্পিকার রয়েছেন। ইসলামিক সম্মেলন সংস্থা বা ওআইসি’র অঙ্গ-সংগঠন ‘পিইউআইসি’। ইরানে অনুষ্ঠিত ‘পিইউআইসি’র সম্মেলনে আমি অংশগ্রহণ করেছি। সেখানে বিভিন্ন ইসলামিক রাষ্ট্রের নারী স্পিকার দেখতে পেয়েছি। আফ্রিকার বিভিন্ন রাষ্ট্রে নারী স্পিকার আছে। একসময় পাকিস্তানে ফাহমিদা মির্জা নারী স্পিকার ছিলেন। এরকম আরও অনেক রাষ্ট্রে নারী স্পিকার আছেন। এটা সব জায়গাতেই নারীর ক্ষমতায়নকে ত্বরান্বিত করে। এ ছাড়া আইপিইউ’র একটি জোট আছে ‘ওমেন্স স্পিকারস কনফারেন্স’ শুধু নারী স্পিকারদের নিয়ে; আমি সেখানে একবার গিয়েছিলাম, সময়ের অভাবে সবসময় যাওয়া হয় না। সৌদি আরবের মজলিশে শূরা’র স্পিকার বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং অনেক আলোচনা হয়েছে এবং রিয়াদ থেকেও আমাকে সেখানে মজলিশে শূরা’তে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, সময় সুযোগ করে আমি সেখানে যাব। তবে স্পিকার স্পিকারই। এখানে নারী-পুরুষ কোনো ভেদাভেদ নেই ।

 

স্পিকার হিসেবে আপনার সাফল্য কোথায় খুঁজে পান?

এত তাড়াতাড়িই সফলতার কথা বলতে পারি না, দশম সংসদ এখনো শেষ হয়নি। সংসদ পরিচালনার  সাংবিধানিক দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করার চেষ্টা করছি। আমার সাফল্য মানুষ খুঁজে পাবে, আমি নিজের সাফল্য নিজে কীভাবে খুঁজব। যদি আমার দেশের মানুষ মনে করে আমি সফল, সেটাই হবে আমার পাওয়া।

 

লুই আই কানের নকশা বাস্তবায়ন নিয়ে কী ভাবছেন?

লুই কানের নকশা আনার ব্যাপারে আমাদের কমিশনের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। কেননা এই ভবনটি আমাদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান এবং ঐতিহ্যবাহী। এই ভবনের মূল নকশা কোথায় কী আছে জানা থাকাটা আমাদের জন্য জরুরি, সামগ্রিকভাবে বিশদ নকশা না থাকায় আমরা সঠিকভাবে এর রক্ষণাবেক্ষণও করতে পারছি না। তা ছাড়া আমাদের এত বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ ভবনের নকশা আমাদের কাছে থাকাটা জরুরি বলেই আমরা এই নকশাটি চার সেট এনেছি। গণপূর্ত বিভাগ ও জাদুঘরে নকশার কপি দেওয়া হবে এবং সংসদেও এর কপি জমা থাকবে।

 

জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের দরকার আছে কি?

হ্যাঁ, দরকার আছে। আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু আমাদের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য সংবলিত সংবিধান দিয়ে গেছেন। একদিকে নারীরা সংরক্ষিত আসনে নির্বাচন করতে পারেন অন্যদিকে একজন নারী সরাসরি নির্বাচন করতে পারেন। এটা আমাদের সংবিধানের বিশাল বৈশিষ্ট্য, যা পৃথিবীর অনেক সংবিধানেই নেই। অনেক দেশেই সংরক্ষিত আসন করার জন্য তারা এখন চেষ্টা করছে। দুটি পথই নারীদের জন্য উন্মুক্ত আছে, বর্তমানে নারীদের জন্য ৫০টি সংরক্ষিত আসন আছে এবং আমাদের একটি বিল কমিটিতে পরীক্ষাধীন রয়েছে, যেখানে আগামী আরও ২৫ বছর সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা থাকা। সেটাকে আমি সমর্থন করি।

আপনার সমালোচক কে?

আমার কঠোর সমালোচক আমার ছেলে।

 

তরুণ প্রজন্ম নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

তরুণ প্রজন্ম বাংলাদেশের শক্তি। আমাদের জনসংখ্যার বেশির ভাগ যেহেতু তরুণ প্রজন্ম, সেই জন্য সব আশার জায়গা, সব সম্ভাবনার জায়গা এই তরুণ প্রজন্ম। কাজেই তরুণদের সব ধরনের সুযোগ দেওয়া, তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, তাদের মেধা প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। ঠিক তেমনিভাবে তারা আমাদের দেশকে নেতৃত্ব দেবে, এগিয়ে নিয়ে যাবে— সেটাই তাদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা।

  • বাংলাদেশ প্রতিদিন