পাল্লা দিয়ে চলা : সড়ক যেন নরক না হয়-মোমিন মেহেদী

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৩:৩৮ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৮, ২০১৮ | আপডেট: ৩:৩৮:অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৮, ২০১৮

আমাদের রাস্তা ক্রমশ সমস্যার জালে আবদ্ধ হচ্ছে। আমরা প্রতিদিন গড়ে ৩৬ জন স্বজন-প্রিয়জন-মা-বাবা-ভাই-বোন হারাচ্ছি। ছাত্র-শিক্ষক সহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের আহত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে গণমাধ্যমে। কারণ একটাই পরিবহনে নির্মম নৈরাজ্যযুক্ত বর্তমান। এই নৈরাজ্যযুক্ত সময়ে যাত্রী ধরার প্রতিযোগিতায় বেপরোয়া সব বাস। সড়কে গাড়ির অবস্থানই বলে দিচ্ছে চালকরা কতটা বেপরোয়া। আর তারই ধারাবাহিকতায় আমাদের রাজিব হাত হারিয়ে মৃত্যু শয্যায়।

প্রতিদিন হাজারো দূর্ঘটনা ঘটে চলছে। এমনই একটা দুর্ঘটনার কথা বলি- নিউমার্কেট-সংলগ্ন চন্দ্রিমা মার্কেটের সামনের রাসস্তা দিয়ে রিকশায় করে মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছিলেন আয়েশা খাতুন। ঠিক সেসময় আজিমপুরের দিক থেকে সায়েন্স ল্যাবরেটরির দিকে যাচ্ছিল দুইটি বাস। তাদের মধ্যে কে কার আগে যাবে সেই প্রতিযোগিতার মাঝখানে পড়ে রিকশা থেকে ছিটকে পড়েন আয়েশা খাতুন এবং গুরুতর আহত হন। চম্পট দেয় দুই বাসের চালকই। চরম সত্যি হলো- ‘দুই বাসের মাঝে চাপ খায় রিকশাটা। আমরা সাথে সাথে আয়েশা খাতুনকে বেসরকারি একটি হাসপাতালে নিয়ে যাই। বাস দুইটা পালিয়ে যায়। পরে একটি বাস ড্রাইভারসহ আটক করা হয়। অন্যটির চালককে ধরা যায়নি।

 

তথ্য-প্রমাণ আছে তারা পাল্লা-পাল্লি দিয়ে যাচ্ছিল।’ আর এই দুর্ঘটনায় শিশুটি অক্ষত থাকলেও তার মায়ের মেরুদন্ড মারাত্মকভাবে জখম হয় এবং অপারেশন করতে হয়েছে। দুটি বাসই ছিল বিকাশ পরিবহনের। এই ঘটনাটি ঘটল এমন সময় যখন ঢাকার কারওয়ান বাজার এলাকার রাস্তায় দুই বাসের প্রতিযোগিতায় এক তরুণের হাত কাটার পর ঘটনার এক সপ্তাহও পেরোয়নি। ওই ঘটনায় বাসের যাত্রী তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী রাজীব হোসেন তার একটি হাত হারিয়েছেন দুই বাসের প্রতিযোগিতার মাঝে পড়ে। কাছাকাছি সময়ের মধ্যে ঢাকার বাইরের এ ধরনের আরেকটি ঘটনা হতবাক করেছে অনেক মানুষকে। ময়মনসিংহ জেলার একটি স্থানে অটোরিকশা থেকে ছিটকে পড়ার পর মধ্যবয়স্ক এক নারীকে পিষ্ট করে দেয় বাসের চাকা। সেভাবেই গাড়ি চালিয়ে অনেকদূর চলে যায় বাসটির চালক। চাকার তলায় পিষ্ট মায়ের মৃতদেহ বের করার অসহায় চেষ্টারত তার সন্তানের ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। জানতে পারি রাস্তা-ঘাটে সাধারণ মানুষের জীবন কিভাবে অহরহ কেড়ে নিচ্ছে অদক্ষ আর পাষন্ড শ্রেণীর চালকেরা। একশ্রেণীর চালক থাকেন নিবেদিত দেশ ও মানুষের জন্য; তাদের বিপরিতে রয়েছে অদক্ষ এই ঘাতকশ্রেণীর চালকও। এই চালকদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি হওয়ায় আজ যখন তখন নির্মম পথ দূর্ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছি আমরা। কিন্তু তা আর হতে দেয়া যাবে না। লাগম টেনে ধরতে হবে বাংলাদেশে সেতু ও যোগাযোগ মন্ত্রীর দায়িত্বরত ওবায়দুল কাদের আর তার পরিবহন সেক্টরে কর্মরত লক্ষ লক্ষ সরকারী- বেসরকারী কর্মকর্তা, কর্মচারি ও চালকদেরকে। যাতে করে সবার আন্তরিকতায় আমরা পাই একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ; সড়ক-আকাশ- নৌ ও রেলপথ দুর্ঘটনামুক্ত মানচিত্র। এই মানচিত্রের প্রত্যয়ে আজ জনগনও সচেতন- সোচ্চার হচ্ছে। ঘুরে দাঁড়াতে তৈরি বাংলাদেশের ইঞ্চি ইঞ্চি মাটি। পরিপপাটি দেশ-মানুষের ইচ্ছে শক্তি আর ভালোবাসার পথচলা।

যেহেতু বাংলাদেশে বাস চালকদের বেপরোয়া গতির কারণে প্রাণহানি কিংবা আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেই চলেছে। কিন্তু চালকদের এই বেপরোয়া মনোভাব কেন? এমন প্রশ্ন নিয়ে অগ্রসর হতেই জানতে পারি, মহাসড়কে ড্রাইভারদের জন্য ঘণ্টাপ্রতি গতি-সীমা বেঁধে দিয়েছেন। কিন্তু ঢাকার রাস্তার ক্ষেত্রে চলেছে নৈরাজ্য। ‘লোকাল বাসগুলো প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালায়। সেজন্য অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে। চালকদের চাকরির নিশ্চয়তা নেই। তার ওপর মালিকদের দ্বারা তারা চাপে থাকে। কারণ মালিকদের ক্যাশ (নগদ টাকা) কম হলে অনেক ড্রাইভারের চাকরি চলে যায়। তাই যাত্রী ধরার জন্য তারা প্রতিযোগিতা করেন। বাসমালিকদের পক্ষ থেকে অবশ্য দোষারোপ করা হচ্ছে বাসের চালক ও শ্রমিকদেরকেই। একপক্ষ আরেকপক্ষ দোষারোপের রাস্তায় হেঁটে চলছে গত ৪৮ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে আমরারাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি শ্রমিক-মালিকদেরও পরিবর্তন দেখেছি। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন সেই সরকারের দালালীতে মত্ত হয়ে পরিবতন সেক্টরের রাজনীতিকরা রাজত্ব ধরে রাখে। আর একারনে চাইলেই অবশ্য সহজে যত সমস্যা দূর করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন নিবেদিত থেকে ক্রমশ এগিয়ে চলা। এই এগিয়ে চলায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি শিক্ষা-সচেতনতার জন্য যোগাযোগ মন্ত্রণালয় আমাদের দেশে সড়ক-নৌ- রেল ও আকাশপথকে নিরাপদ করার লক্ষ্যে বিভিন্নভাবে এগিয়ে চলা সংগঠন সেভ দ্য রোড-এর সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা কর্মীদেরকে কাজে লাগাতে পারলে কমবে দূর্ঘটনা-মৃত্যু মিছিল।

আরেকটি বিষয় কিন্তু খুবই দুঃখজনক এবং হতাশাব্যঞ্জক। আর তা হলো- ট্রাক ও বাসচালক থেকে শুরু করে রাজধানীর বাসাবো, মাদারটেক, হাজারীবাগ, মিরপুর, আজিমপুর, লালবাগ, শ্যামপুর, যাত্রাবাড়ি, ডেমরা, স্টাফ কোয়ার্টার সহ বিভিন্ন এলাকায় চলমান লেগুনা-ভটভটি-নসিমন-অটোর চালকদেরও একটি বড় অংশ মাদকাসক্ত। ৪০০-৫০০ টাকা হাতে পেলেই বাসের ড্রাইভার, হেলপাররা ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আর তারপর মাদকাশক্ত অবস্থাতেই পরিবহন চালায়, যে কারনে এ ধরনের দুর্ঘটনা নিরন্তর বেড়ে চলছে। আমরা হারাচ্ছি স্বজন-প্রিয়জন। ২০০৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালীন সময়ে আমার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন সেভ দ্য রোড-এর পক্ষ থেকে সারাদেশে সড়ক-রেল-নৌ ও আকাশপথকে নিরাপদ করার জন্য নিবেদিত থেকে কাজ করার সুবাদে বলতে পারি যে, দেশের ট্রাফিক সিস্টেমও দায়ী আমাদের পথ দূর্ঘটনার জন্য। এদের রুট পারমিট নিয়ে সমস্যার কারণেও বিভিন্ন কোম্পানির গাড়ির মধ্যে পাল্লাপাল্লি লাগে। যেখানে বিভিন্ন ট্রিপ প্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পায় একজন চালক এবং কনডাক্টর। ফলে তাদের লক্ষ্য থাকে যত বেশি সম্ভব ট্রিপ দেয়া। আর এই সুযোগে কোনোকিছুর তোয়াক্কা না করে বাস চালায় অনেক চালক। কিন্তু তাতে কি পাল্টাপাল্টি অভিযোগ থাকলেও বাসচালকদের প্রতিযোগিতার ফলে সড়কে মৃত্যু এবং জখম হওয়া যে থেমে নেই তার নজির সাম্প্রতিক এসব ঘটনা।
এমতবস্থায় চালকদের যে ধরনের প্রশিক্ষণ দরকার তা নেই। সচেতনতার মাত্রাও খুব করুণ।

তার ওপর তারা মালিকদের দ্বারা এমনভাবে পরিচালিত হয় তাতে তাদের অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয় এবং তাদের মানসিক চাপের মধ্যে থাকতে হয়। তাদের মূল লক্ষ্য থাকে দ্রম্নত বাস চালিয়ে টাকা রোজগার। সে তখন রুক্ষ্ণ আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। অধিকাংশ যাত্রীর অভিযোগ এভাবে হতাহতের ঘটনায় বাসচালকদের বড় কোনো শাস্তির নজির নেই। ফলে তাদের বেপরোয়া মনোভাও বহাল। তবে এদের শুধু শাস্তি দিলেও তাদের সুশৃঙ্খল করা যাবে না, বিধায়-ই এমনভাবে আইনী প্রয়োগ ও বুদ্ধির যোগ করতে হবে যে, চালকদের মধ্যে কখনোই যেন এই রাতারাতি ধনি হওয়া বা মাদকাশক্ত হওয়ার রাস্তা থেকে সরে আসে। যদি শক্ত কথায় বলতে চাই, তাহলে বলতেই হয় যে, কতজনকে শাস্তি দেবেন? তার আগে দেখতে হবে বাস অপারেটিং সিস্টেমের মধ্যে কারা আছেন? এখানে কোনো ধরনের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ নেই। গণ-পরিবহনকে বিশেষ করে শহরাঞ্চলে ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ছাড়া যাবে না।

লোকবল বাড়িয়ে সরকারি সংস্থার মাধ্যমে চালাতে হবে। সমাধানে নতুন প্রজন্ম বিশ্বাস করে। রাতভর টক শো, আর গোলটেবিল-লম্বা টেবিল করে টাকা হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টাকে ‘না’ বলতে তৈরি বিধায় আজ যাত্রী কল্যাণ সমমিতি বা নিরাপদ সড়ক চাইর মত নিজেদের স্বার্থ সংশ্লিষ্টতা আদায় হয়ে যাওয়ার পর আর রাস্তা-ঘাটকে নিরাপদ করার জন্য না নেমে ব্যাংকে আসা অর্থের হিসাব নিয়ে ব্যস্থ থাকার কথা ভাবে না। ভাবে বাং!লাদেশের মাটি ও মানুষকে নিয়ে। নিরাপদ পথ; তথা নিরাপদ দেশ গড়ার কথা। আর তাই সেভ দ্য রোডের সাথে একম হয়ে বলতে চাই বাংলা নতুন বছরে আমাদের শ্লোগান- সেভ দ্য রোডের অঙ্গীকার-পথ দূর্ঘটনা থাকবে না আর…
মোমিন মেহেদী : চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ-এনডিবি