বাংলা ও বাঙালিয়ানা: আমাদের দেশীয় পোশাক

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১:১৮ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৭, ২০১৮ | আপডেট: ১:১৮:অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৭, ২০১৮
বাংলা ও বাঙালিয়ানা: আমাদের দেশীয় পোশাক

বাঙালি নারীর কথা চিন্তা করলেই প্রথমে যে ছবিটি আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে তা হলো শাড়ি পরা এক স্নিগ্ধ অবয়ব। রকমারি মিষ্টি ও মুখরোচক সব খাবারের পর যে বৈশিষ্ট্যটি বাঙালির পরিচয় বহন করে তা হলো এই শাড়ি। বাঙালিদের পোশাকের ধরণ এবং অনুভূতির সাথে সাদা রং যেন একেবারে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বাঙ্গালী রমণীর শাড়ির কথাই ধরুন না। সাদা শাড়ি লাল পাড় শুধু বাংলার ঐতিহ্যবাহী পোশাকই নয়, এ যেন বাঙালী রমণীদের অহংকার। এর বুনোটের ধরনেও বেশ পার্থক্য দেখা যায় উত্তর ভারতীয় অথবা গুজরাটের শাড়ির থেকে।

পটভূমি

ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলোর মতই বাংলার ঐতিহ্যও বিভিন্ন সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত যারা কোনো এক সময় নির্দিষ্ট একটা সময়ের জন্য হলেও এ অঞ্চলে খুঁটি গেড়েছিল। ইতিহাস বলে বাংলার সাথে মৌর্য সাম্রাজ্যের এক গভীর যোগসূত্র ছিল। পরবর্তীতে সতেরশো শতাব্দীর দিকে বাংলা এবং বিহার রাজ্য মগধ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। মহাবীর এবং বুদ্ধর সময়ে ৪টি প্রধান রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল বাংলা তাদের মধ্যে একটি। এ কারণেই সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত বাংলার মূল্যবোধে আধ্যাত্মিক বিষয়টি জড়িয়ে আছে। বলা বাহুল্য যে, বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই পোশাক যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন সভ্যতার বিভিন্ন সংস্কৃতি থেকে অনুপ্রাণিত।

বৈচিত্রতা

বাঙালিয়ানা পরিচয়বাহী এই পোশাকের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দুটি বিষয়কে বিবেচনা করা হয়-

১. বাংলার ঐতিহ্য এবং মূল্যবোধ এবং

২. যুগ যুগ ধরে চলে আসা তাঁত শিল্পের ঐতিহ্য

বাঙালি নারী এবং পুরুষের পোশাকের ধরনকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়।

বিশেষ উপলক্ষ বা ঐতিহ্যবাহী পোশাক

বাঙালী নারী শুধুমাত্র ঐতিহ্যবাহী শাড়িতে তার বাঙালিয়ানার গর্ব পরিপূর্ণরূপে খুঁজে পায়। বাঙ্গালী রমণীর ঐতিহ্যবাহী শাড়ি পুরো বিশ্বে এমনই সমাদৃত যে তা ‘কাল্ট ফ্যাশন’ এর মর্যাদা অর্জন করেছে। একটি নির্দিষ্ট ধরনের শাড়ি বাঙালি নারীর নিত্যদিনের পোশাক হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। শাড়িগুলো মূলত হয় ভারী পাড়ওয়ালা সিল্কের কাপড়ের।

যে বিষয়টি বাঙালির শাড়িকে আরো অনন্য করে তোলে তা হলো দক্ষ বুননশৈলী এবং সূক্ষ্ম কারুকার্য। বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই শাড়ির মধ্যে গরাদের সিল্ক শাড়ি, জামদানি, তাঁত, স্বর্ণচুড়ি এবং বালুচুড়ি অধিক উল্লেখযোগ্য। বাঙালি রমণীদের কাছে বিশেষ রকমের তাঁতের এই শাড়ির বরাবরের মতোই একটু আলাদা কদর দেখা যায়। বাঙ্গালী রমণীর কাছে তাঁতের শাড়ির মার্জিত আবেদনকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে সুঁই এর ফোঁড় তোলা সোনালি রঙের পাড়। এই শাড়ি দেখতে অনেক ভারী মনে হলেও পরতে কিন্তু বেশ আরামদায়ক।

অন্যদিকে বাঙালি ছেলেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের জায়গা যুগ যুগ ধরে দখল করে রয়েছে পাঞ্জাবী এবং লুঙ্গি। আগে পুরুষরা একটু ঢিলাঢালা হাঁটু সমান লম্বা সিল্কের তৈরি পাঞ্জাবি পরতে বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতো। পাঞ্জাবি দেখতে অনেকটা কুর্তার মতো ছিল। নিত্যনৈমিত্তিক এই পোশাক এখন কিছুটা কম পরিধান করলেও বিশেষ বিশেষ দিনে কিন্তু এখনো এটি বেশি প্রাধান্য পায়। তবে পাঞ্জাবির ধরনে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। আগে পুরুষদের পছন্দের তালিকায় লম্বা ঢিলেঢালা ধাঁচের পাঞ্জাবি প্রাধান্য পেলেও এখন একটু চাপানো এবং খাটো পাঞ্জাবিই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।

অন্যদিকে লুঙ্গিও আমাদের জাতীয় পোশাকের মধ্যে অন্যতম। সুতি, সিল্ক অথবা বাটিকের কাপড়ের তৈরি বাহারি রঙের এই লুঙ্গি পরতে বেশ আরামদায়ক। বাংলার ঐতিহ্যবাহী পোশাকের ডিজাইনের সাথে ঐতিহ্যবাহী কাঁথার মেলবন্ধন দেখা যায়। তবে বাংলার তাঁতিরা মূলত কাঁথায় সুঁইয়ের ফোঁড়ের মাধ্যমে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য তুলে ধরতেন, যাকে বলা হয় নকশী কাঁথা। এই নকশী কাঁথা বানানোর পেছনে প্রয়োজন সুনিপুণ দক্ষতা এবং গভীর মনোযোগ। বিভিন্ন রকমের শীতবস্ত্র বাজারে থাকলেও এই নকশী কাঁথার চাহিদা কিন্তু এখনো আগের মতোই আছে।

বর্তমান সময়ের পোশাক-আশাক

যুগ যুগ ধরে চলে আসা ঐতিহ্যকে ছাপিয়ে বাঙ্গালীদের পোশাকে বেশ পরিবর্তন এনেছে আরামদায়ক এবং স্বাচ্ছন্দ্যবোধ ব্যাপারটি। বাঙালিরা এখন চলতে ফিরতে ঐতিহ্য থেকে বেশি আরামের দিকে বেশি মনোনিবেশ করেন। মহিলারা এখন সালোয়ার কামিজ অথবা সুতি শাড়ি পড়তে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। কারো কারো পছন্দের তালিকায় এখন পশ্চিমা পোশাকও বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী পোশাকের এই রীতি ঐতিহ্যবাহী অথবা ধর্মীয় কোনো উপলক্ষে এখনো বেশ প্রাধান্য পায় যার প্রতিফলন আমরা, বিয়ে, ফাল্গুন, পহেলা বৈশাখ অথবা দুর্গাপূজায় দেখতে পাই।

অন্যদিকে পুরুষদের পোশাকেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। লুঙ্গি বা পাঞ্জাবির পরিবর্তে এখন গোল গলা টি-শার্ট, শার্ট, ফতুয়া, পায়জামা, জিন্সের প্যান্ট, গ্যাবার্ডিন প্যান্ট বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

বিশেষ উপলক্ষে পোশাকের ধরন

বাঙালি পোশাকের ঐতিহ্যময় এই আবেদন এর পেছনে রয়েছে এর মৌলিকতা। বিশেষ কোনো মুহূর্ত অথবা উপলক্ষ্য উদযাপন করার জন্য পোশাক হিসেবে ঐতিহ্যবাহী এই শাড়ি বাঙালী নারীদের কাছে এখনো প্রথম স্থান লাভ করে আছে। দুর্গাপূজা অথবা বিয়ে-শাদীর মুহূর্তে এখনো একজন বাঙালি নারীকে বাংলার ঐতিহ্য এবং রঙে সাজতে দেখা যায়। সাদা রঙের লাল পাড় শাড়ি কুচি দিয়ে , বাম কাঁধ থেকে ওড়না ঝুলানো, এইরূপে বাঙালি নারীকে বেশি দেখা যায়। কুচিগুলো অসম্পূর্ণ হলেও, দেখতে কিন্তু বেশ মার্জিত।

মৌসুমভেদে পোশাক এর ধরণ :

আবহাওয়া পরিবর্তনের সাথে সাথে পোশাকের ধরন বেশ পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। খাঁটি সিল্কের তৈরি শাড়ি নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ায় বেশ মানিয়ে যায়। শীতের সময়ও এ শাড়ি বেশ আরামদায়ক বটে। কিন্তু গ্রীষ্মকাল অথবা অধিক আদ্রতা বিশিষ্ট আবহাওয়ায় এই শাড়ি আরামদায়ক নয়। এ সময় সুতি কাপড়ে তৈরি পোশাক ই বেশি প্রাধান্য পায়। শীতের সময় পছন্দের তালিকায় যোগ হয় উলের তৈরি পোশাক।

তবে সময় ও ঋতুভেদে পরিবর্তন যতই আসুক না কেন, বাঙালির ঐতিহ্যবাহী পোশাক যে বিশ্ব দরবারে নিজস্ব একটি জায়গা দখল করে নিয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। আধুনিকতার কারণে যতই ধরণ বদলাক না কেন ঘুরে ফিরে এসকল ঐতিহ্যবাহী শাড়ি পাঞ্জাবির প্রচলনই দেখা যায় বাঙালির যাপিত জীবনে।