আ. লীগে শামীম ওসমান, বিএনপিতে কে

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৮:০৮ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ৮, ২০১৮ | আপডেট: ৮:০৮:পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ৮, ২০১৮
আ. লীগে শামীম ওসমান, বিএনপিতে কে

ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনটি জেলার আলোচিত ও মূল আকর্ষণ। শিল্পাঞ্চল হিসেবে খ্যাত এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমান। আগামী নির্বাচনেও শামীম ওসমানই এই আসনে আওয়ামী লীগের একমাত্র প্রার্থী—এমনটাই বলছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা।

অন্যদিকে বিএনপি থেকে এ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আছেন জাতীয় নির্বাহী কমিটির দুই সদস্য—জেলা বিএনপির ১ নম্বর সহসভাপতি শিল্পপতি মো. শাহ আলম এবং জেলা বিএনপির সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন। দুজনই মনোনয়ন পেতে কেন্দ্রে লবিং করে যাচ্ছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ওসমান পরিবারের সদস্য শামীম ওসমানকে কেন্দ্র করে জেলায় আওয়ামী লীগে রয়েছে শক্ত বলয়; যাঁদের তিন পুরুষ ধরে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করে যাচ্ছে। বিএনপি, বামদল কিংবা জামায়াত কোনো দলই নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে শামীম ওসমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের ঘাঁটির ভিত নাড়াতে পারেনি। শামীম ওসমানের দাদা খান সাহেব ওসমান আলীর বাড়িতেই জন্ম নিয়েছিল আওয়ামী লীগ। দারুণ সাংগঠনিক ক্ষমতা থাকায় শামীম ওসমানের ডাকে আধা ঘণ্টায় লাখো লোক জড়ো হয়ে যায়। দলের জন্য এমন কোনো আত্মত্যাগ নেই যা শামীম ওসমান করেননি। দেশের প্রথম আরজেস গ্রেনেড হামলার শিকার হয়ে এবং বারবার প্রাণনাশের চেষ্টার পরেও শামীম ওসমান উঠে দাঁড়িয়েছেন। তাই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দলের জন্য ত্যাগী নেতা হিসেবে শামীম ওসমানের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ।

তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছেন, নিজ সংসদীয় এলাকা থেকে শুরু করে জেলার উন্নয়নে যুগান্তকারী পদক্ষেপ রেখেছেন এই সংসদ সদস্য। ধাপে ধাপে সংসদীয় এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। সাবেক সংসদ সদস্য সারাহ বেগম কবরীর সময়কালে ঝিমিয়ে পড়া উন্নয়ন কার্যক্রমে আবার গতি এনেছেন শামীম ওসমান।

শামীম ওসমানের উন্নয়ন কার্যক্রম বর্ণনা করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা বলছেন, পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে শামীম ওসমানের উন্নয়নের ছোঁয়া। রাস্তাঘাট, পুল-কালভার্ট, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মন্দির নির্মাণ ও সংস্কারে শামীম ওসমানের অবদান আগের রেকর্ডকেও ছাড়িয়েছে। ডিএনডি জলাবদ্ধতা নিরসনে তাঁর প্রচেষ্টায় এরই মধ্যেই শুরু হয়েছে ৫৫৮ কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ। শামীম ওসমানের প্রচেষ্টায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ডাবল রেললাইন উন্নয়নসহ ননা প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন। এ আসনে শামীম ওসমানই শামীম ওসমানের বিকল্প বলে এ পর্যন্ত অন্য কোনো সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম শোনা যায়নি।

এর আগে ১৯৯৬ সালে প্রথমবার আওয়ামী লীগ থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন শামীম ওসমান। ওই সময় তিনি এ আসনে রেকর্ডসংখ্যক ২৬০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ করেছিলেন।

তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছেন, নির্বাচনী প্রচারেও এগিয়ে আছেন শামীম ওসমান। এরই মধ্যে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কর্মিসভা শুরু করেছেন। তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিটি সভা-সমাবেশে যোগ দিয়ে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করছেন। ভোটকেন্দ্র কমিটি করার নির্দেশনাও দিয়েছেন স্থানীয় নেতাকর্মীদের, যে কারণে ওয়ার্ড পর্যায়ে তা গঠন করার তৎপরতা শুরু হয়ে গেছে।

এ ব্যাপারে ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী বলেন, ‘শামীম ওসমানই নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে একমাত্র যোগ্য প্রার্থী। তাঁর সাংগঠনিক ক্ষমতা, নেতাকর্মীদের প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ, দল ও নেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এসব বিষয়ই আমাদের আকৃষ্ট করে। এলাকার উন্নয়নে তিনি যে দৃষ্টান্ত রেখে চলেছেন তা কল্পনাতীত। শামীম ওসমান শুধু নারায়ণগঞ্জ-৪ এ নয়, পুরো নারায়ণগঞ্জেই সমান জনপ্রিয়। অন্যান্য এলাকার উন্নয়নেও তিনি বিশেষ অবদান রেখে চলেছেন।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শামীম ওসমান বলেন, ‘আমি রাজনীতি করি মানুষের জন্য। কেননা মানুষকে খুশি করলেই আল্লাহকে খুশি করা যায়। আমি এমপি হই কী হই না সেটা বড় বিষয় নয়। বড় বিষয় হচ্ছে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনা। দেশের স্বার্থে, দশের স্বার্থে শেখ হাসিনাকে আরেকবার ক্ষমতায় আনতে এই আসনে নৌকার বিজয় জরুরি প্রয়োজন।’

অন্যদিকে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী জাতীয় নির্বাহী কমিটির দুই সদস্য শাহ আলম ও মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন। সে ক্ষেত্রে আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে শামীম ওসমানের সঙ্গে গিয়াসউদ্দিন কিংবা শাহ আলমের লড়াই হবে বলে মনে করছে দুই দলের নেতাকর্মীরা।

তবে ফতুল্লায় প্রচার আছে—থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ বিশ্বাস ও সিনিয়র সহসভাপতি বৃহৎ কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুল আলম সেন্টু কাজ করছেন শামীম ওসমানের পক্ষে। আজাদ বিশ্বাস একই সঙ্গে জেলা বিএনপির সহসভাপতি হিসেবে আছেন এবং সেন্টু থানা বিএনপির আগের কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

গত ১৯ অক্টোবর ফতুল্লার দেলপাড়া এলাকায় ডিএনপি মেগা প্রকল্পের উদ্বোধনের প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাতে আয়োজিত সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি নেতা আজাদ বিশ্বাস ও মনিরুল আলম সেন্টু। বিএনপির এই দুই নেতা শেখ হাসিনা ও শামীম ওসমানের ব্যাপক প্রশংসা করেছেন।

আজাদ বিশ্বাস বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার নেতা শামীম ওসমান। আমি বিএনপি নেতা হয়ে শামীম ওসমানকে স্যালুট জানাই।’ এর আগে আরেক অনুষ্ঠানে আজাদ বিশ্বাস বলেছিলেন, ‘শামীম ওসমানের মতো সাংগঠনিক নেতা নারায়ণগঞ্জে আর কেউ নাই।’

সেন্টু ওই অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘শামীম ওসমান ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।’ এর আগে আরেকটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘শামীম ওসমান উন্নয়ন করে জনগণের পীর হয়ে গেছেন। তাঁকে আবারও জনগণ নির্বাচিত করবেন।’

তবে ফতুল্লা থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ বিশ্বাস বলেন, ‘আমি বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা চেয়ারম্যান। উন্নয়নের প্রশ্নে অনেক ক্ষেত্রেই অনেক জায়গায় উপস্থিত থাকতে হয়। তাই বলে দলীয় আদর্শ বিসর্জন দিইনি।’

আজাদ বিশ্বাস দাবি করেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এই আসনে বিএনপি প্রার্থী বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে।’ তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে থানা বিএনপির সভাপতি শাহ আলমই যোগ্য প্রার্থী। তিনি সুখে-দুঃখে নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন এবং আছেন।

এদিকে এ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশায় মাঠে নেমেছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য শিল্পপতি মুহাম্মদ শাহ আলম ও সাবেক এমপি মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন। এক সময় শাহ আলম কল্যাণ পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। দল ত্যাগ করে তিনি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে সারাহ বেগম কবরীর কাছে সামান্য ভোটে পরাজিত হন। এখন তিনি কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্যসহ নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি ও ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতির পদে রয়েছেন।

একইভাবে জাতীয় পার্টি থেকে আওয়ামী লীগে এবং আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে আসেন সাবেক এমপি গিয়াসউদ্দিন।

২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের মাত্র ২১ দিন আগে কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সহসভাপতির পদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে শামীম ওসমানের সঙ্গে নির্বাচন করে এমপি নির্বাচিত হন গিয়াসউদ্দিন। শাহ আলম এবং গিয়াসউদ্দিন—দুজনই দলছুট নেতা। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির প্রতিবাদে গত বছর ১০ অক্টোবর সোনারগাঁয়ের কাঁচপুর এলাকায় বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীদের মিছিলে নাশকতার অভিযোগে সোনারগাঁ থানায় একটি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা হয়। ওই মামলায় হুকুমের আসামি শাহ আলম ও গিয়াসউদ্দিন। তার পর থেকে নির্বাচনী এলাকায় তাঁরা দুজন গণসংযোগ আপাতত বন্ধ করে দিয়েছেন। এ দুই নেতা ও তাঁদের অনুগতদের মধ্যে তুমুল বিরোধ-বিভক্তি রয়েছে।

এ ব্যাপারে মো. শাহ আলম বলেন, ‘এমপি হইলাম কী হইলাম না সেটা বড় বিষয় নয়। তবে সমাজের উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছি, জনগণের জন্য কাজ করছি—এটাই বড় বিষয়। আমি মারামারি-কাটাকাটি পছন্দ করি না। দল যাকে নমিনেশন দেয় তার জন্য কাজ করব। আর নির্বাচন করার পরিবেশ এলে নির্বাচন করব। তবে রাজনীতিতে ভালো পরিবেশ আসা দরকার।’

তবে গিয়াসউদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য তাঁর মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন দিলে তিনি তা ধরেননি। সূত্র : কালের কণ্ঠ