রাশিয়ায় শপিং মলে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৬৪

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৮:১৬ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ২৭, ২০১৮ | আপডেট: ৮:১৮:পূর্বাহ্ণ, মার্চ ২৭, ২০১৮

রাশিয়ার এক শপিং মলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৬৪ জন। নিহতদের মধ্যে কয়েকজন শিশুও রয়েছে বলে জানা গেছে। শিল্পাঞ্চল সাইবেরিয়ার কেমেরোভো শহরের উইন্টার সিটি শপিং সেন্টার নামের একটি মলে রোববার এ দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত শপিং মলের পোড়া ধ্বংসস্তূপ থেকে হতাহতদের উদ্ধারে হিমশিম খাচ্ছিলেন উদ্ধারকর্মীরা। খবর এএফপি।

স্থানীয় রুশ টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত এক দৃশ্যে দেখা যায়, কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে উইন্টার সিটি শপিং সেন্টার। শপিং মলটিতে দোকানপাট ছাড়াও সনা, বোলিং অ্যালি ও মাল্টিপ্লেক্স সিনেমা হল ছিল। সাপ্তাহিক ছুটির দিন উপভোগের জন্য রোববার বিকালে সনা ও বোলিং অ্যালি ও সিনেমা হলে উপচে পড়া ভিড় ছিল।

ঘটনা তদন্তের জন্য গঠিত কমিটি সূত্রে জানা গেছে, অগ্নিকাণ্ডে সিনেমা হলের দুটি থিয়েটারের ছাদ ধসে পড়ে। অন্যদিকে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আগুন জ্বলে ওঠার পর সতর্কতামূলক ঘণ্টা বেজে উঠলেও অনেকে তা শুনতে পাননি। আবার অনেকে শুনতে পেলেও বিষয়টিকে পাত্তা দেননি। অন্যদিকে আগুন লাগার পর তা দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় অনেক শিশু তাদের পিতা-মাতার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

ঘটনার সময় শপিং মলে পিতা-মাতার সঙ্গে উপস্থিত কিশোরী মিলেনা জানায়, অ্যালার্ম সিস্টেম সঠিকভাবে কাজ করেনি। আগুন লাগার পর আতঙ্কিত মানুষ চিত্কার করতে করতে পালানোর চেষ্টা করছিল।

রাশিয়ার জরুরি সেবাবিষয়ক মন্ত্রী ভ্লাদিমির পুচকভ স্থানীয় একটি টিভি চ্যানেলকে বলেন, দুর্ঘটনার কারণে দুর্ভাগ্যজনকভাবে ৬৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন বলে আমরা নথিভুক্ত করেছি। এর আগে প্রকাশিত আরেকটি সংবাদে নিহতের সংখ্যা ৫৬ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।

ভ্লাদিমির পুচকভ জানান, নিহতের সংখ্যা হিসেবে ৬৪-ই চূড়ান্ত তথ্য। নিহতদের মধ্যে ছয়জনের মরদেহ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে রয়েছে বলে জানান তিনি।

তদন্ত চালিয়ে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, মাল্টিপ্লেক্সের কোনো একটি থিয়েটারে প্রথম আগুনের সূত্রপাত হয়। অগ্নিকাণ্ডে শপিং মলের এক হাজার বর্গমিটার জায়গা এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বলে স্থানীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে।

অন্যদিকে রুশ জরুরি সেবা মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় দপ্তরের দেয়া তথ্য বলছে, চারতলা শপিং মলের সবচেয়ে উপরের তলায় অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। আগুনের তাপে ভবনের মেঝে ও ছাদগুলো সব ধসে পড়ে।

আনাস্তাশিয়া ক্লেপোভা নামে আরেক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ভবন ত্যাগের সংকেত মাত্র দুবার বেজে উঠেই বন্ধ হয়ে যায়। আমরা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি, আমাদের ভবন ত্যাগের সংকেত দেয়া হচ্ছে। আমরা ভেবেছিলাম, সম্ভবত আবর্জনার স্তূপে আগুন ধরেছে। কিন্তু ২-৩ মিনিটের মধ্যে আমাদের ধোঁয়া এমনভাবে ঘিরে ধরল, আমরা কোনো কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমাদের গোটা শরীর কালো হয়ে গিয়েছিল।

তিনি আরো বলেন, এ সময় লোকজন দৌড়াতে শুরু করে। এদের মধ্যে অনেক শিশুও ছিল, যাদের সঙ্গে তাদের পিতা-মাতা ছিল না।

দানিলা প্লায়ুত নামে আরেকজন বলেন, আতঙ্কিত লোকজনের মধ্যে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক— সব ধরনেরই মানুষ ছিল। আমরা সেখান থেকে মানুষজনকে বের করে আনার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু সবচেয়ে উপরের তলায় ঝাঁঝাল ধোঁয়া আর তীব্র প্লাস্টিক পোড়া গন্ধের মধ্যে কাজ করা বেশ কঠিন। সেখানে সহজে যাওয়া যাচ্ছিল না।

রুশ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ভেরোনিকা স্কভরতসোভা জানান, দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে ১১ বছর বয়সী এক কিশোরের অবস্থা সবচেয়ে বেশি সংকটজনক। আগুনের হাত থেকে বাঁচতে ভবনের সবচেয়ে উঁচু তলা থেকে লাফ দিয়েছিল ছেলেটি। দুর্ঘটনায় তার পরিবারের সবাই প্রাণ হারিয়েছে। তবে এখনো তার বেঁচে থাকার আশা রয়েছে।

তিনি আরো জানান, একই তলা থেকে লাফ দেয়ার কারণে ১৮ বছর বয়সী এক তরুণও বেশ আহত হয়েছে। এছাড়া আরো আটজনের অবস্থা বেশ গুরুতর। এরা সবাই নিঃশ্বাসের সঙ্গে বিষাক্ত ধোঁয়া গ্রহণের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন।

স্থানীয় দমকল বাহিনীর পাঁচ শতাধিক কর্মীকে গতকালও ধোঁয়া ও উচ্চ তাপমাত্রার মধ্যেই ভবনের দেয়াল ভেঙে ও ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করে উদ্ধার কার্যক্রম চালাতে দেখা যায়। এছাড়া উদ্ধারকার্যে বর্তমানে ড্রোনও ব্যবহার করা হচ্ছে।

ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, বিষয়টিকে ফৌজদারি ঘটনা হিসেবে আমলে নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছেন তারা। যে প্রাঙ্গণে প্রথম আগুন ছড়িয়ে পড়ে, সেখানকার ভাড়াটে ও শপিং মল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে এরই মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে এ ঘটনায় নিহতদের জন্য শোক প্রকাশ করে এরই মধ্যে এক বিবৃতি দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এছাড়া জরুরি সেবাবিষয়ক মন্ত্রীকেও তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন বলে ক্রেমলিন জানিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাতের পর পরই ১২০ জনকে জ্বলন্ত ভবন থেকে বের করে আনা হয় বলে উদ্ধারকর্মীরা রোববার জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে উদ্ধার কার্যক্রম নিয়ে রুশ জরুরি সেবা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা আলেক্সান্ডার ইয়েরিমায়েভ এক বিবৃতিতে বলেন, ‘রোববার দুপুর থেকেই শপিং মলটির কয়েকটি তলা বেশ জনাকীর্ণ অবস্থায় ছিল। আগুন লাগার সময় ভবনটিতে ঠিক কতজন অবস্থান করছিলেন, তা কেউই বলতে পারছে না। এ অবস্থায় দমকল কর্মীদের জন্য এখন সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, হতাহতদের কোথায় কোথায় খুঁজতে হবে? এবং তারা এখন কোথায় রয়েছে? এর মধ্যে তাদের কার্যক্রম আরো কঠিন করে তুলছে ধোঁয়ার ঘনত্ব।

গত কয়েক বছরের মধ্যে এটিই রাশিয়ায় ঘটে যাওয়া সবচেয়ে ভয়াবহ ও প্রাণক্ষয়ী অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। এখন পর্যন্ত আধুনিক রাশিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ২০০৯ সালে। সে সময় মস্কোর ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত শহর পার্মের এক নাইটক্লাবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১৫৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। বণিক বার্তা

Print Friendly, PDF & Email