নাটক নির্মাণ ও প্রচার ইরানী বিশ্বাস

এ আল মামুন এ আল মামুন

বিনোদন প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩:৪৫ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৭, ২০১৭ | আপডেট: ৩:৪৫:অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৭, ২০১৭
নাটক নির্মাণ ও প্রচার  ইরানী বিশ্বাস

আমার জন্ম গ্রামে। খুব মনে আছে, সরকারী চাকরি বলে প্রথমেই মা’র পোষ্টিং হয়েছিল শহরে। বাসায় তখনো টেলিভিশন আনা হয়নি। আমি তখন অনেক ছোট। টেলিভিশনের সঙ্গে প্রথম পরিচয় মায়ের এক কলিগের বাসায়। সম্ভবত কোন নাটক প্রচারিত হয়েছিল বাংলাদেশ টেলিভিশনে। আমি ভীষণ টেনশানে পড়ে গেলাম। এত ছোট বাক্সের মধ্যে এত মানুষ ধরলো কি করে। পরে মাকে কথাটা বলতেই তিনি আমাকে সব বুঝিয়ে বললেন। শুধু আমি নয় টেলিভিশন নিয়ে এ রকম কৌতুহল কম বেশি সকল মানুষের মনে থাকাটাই স্বাভাবিক।

’৬০ দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্মের পর বাংলা নাটকের মাধ্যমে টেলিভিশন মিডিয়ায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। তখন বাংলা নাটক মানেই উৎসাহ নিয়ে টিভির সামনে বসে থাকা। বাংলা নাটক মানেই দর্শক মনের ভিন্ন ভিন্ন কৌতুহল। বলা যায় বাংলাদেশের নাটক দেখার জন্য এক সময় মুখিয়ে থাকতো পার্শবর্তী দেশের বাঙালী জনগণ। এত আলোড়ন আর আড়ম্ভর যে নাটক নিয়ে তার নির্মাণ সম্পর্কে রয়েছে সাধারণ মানুষের মনে বেশ কৌতুহল। টেলিভিশন খুললে কোন না কোন নাটকের অংশ চোখে পড়ে। সাধারণ দর্শক মনে মনে প্রশ্ন করেন, যে নাটক প্রচার হচ্ছে তা কি সরাসরি দেখানো হচ্ছে?

এক সময় মঞ্চ নাটকের মতো টেলিভিশনেও লাইভ নাটক টেলিকাস্ট হতো। ধীরে ধীরে উন্নত প্রযুক্তির কল্যাণে লাইভ নাটক বন্ধ হয়েছে। চালু হয়েছে রেকর্ড সিস্টেম নাটক প্রাচর। টেলিভিশনে ৩ প্রকার নাটক প্রচারিত হয়ে থাকে।

১. খন্ড নাটক বা একক নাটক : সাধারণত ৪০ থেকে ৪৫ মিনিটের মধ্যে নির্মাণ করা হয় একক বা খন্ড নাটক।

২. টেলিফিল্ম বা টেলিছবি : ৬০ থেকে ৯০ মিনিট পর্যন্ত নির্মাণ করা হয় টেলিফিল্ম বা টেলিছবি।

৩. ধারাবাহিক বা ডেইলি সোপ : ১৩ থেকে শুরু হয়ে চ্যানেল বা দর্শকের চাহিদা পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়ে থাকে ধারাবাহিক বা ডেইলি সোপ।

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে একটি নাটক নির্মাণ করাটা কখনো খুব সহজ আবার কখনো খুব ঝামেলাপূর্ন। একজন নাট্যনির্মাতা চাইলেই নাটক নির্মাণ করতে পারেন। কিন্তু নাটক নির্মানইতো আর নাট্যকারের সার্থকতা নয়। নাটকটি যথাযথ ভাবে যখন কোন চ্যানেলে প্রচরিত হবে তখন নাট্যনির্মাতার সফলতা। তবে এখানেই শেষ নয়। রয়েছে অর্থ লগ্নীকারকের লাভ সহ টাকা ফেরত দেয়ার দায়।

একটা সময় ছিল, যখন অর্থ লগ্নীকারক নিজস্ব প্রতিষ্ঠান খুলে বসতেন। তিনি চ্যানেলে ঘুরে নাটক প্রচারের অনুমতিপত্র নিতেন। তারপর খোঁজ করা হতো নাট্যকার এবং নাট্য পরিচালকের। সাধারণত চ্যানেল এবং নাট্যপরিচালকের মধ্যকার সমন্বয়ক ছিলেন অর্থ লগ্নীকারক বা প্রযোজক। কিন্তু বর্তমান সময়ে প্রযোজক শব্দটার অর্থ পরিবর্তন হয়ে গেছে। যে কেউ অর্থদাতা হিসাবে নাটক প্রযোজনায় আসতে পারছেন। মোদ্দা কথা একজন অর্থদাতা হয়েও নাট্য প্রযোজক হিসাবে পরিচিতি লাভ করছেন অনেকেই। বর্তমান সময়ে নাটক প্রযোজনা করতে কোন প্রতিষ্ঠান বা চ্যানেলে পরিচিতির কোন প্রয়োজন হয় না। কিছু টাকা কোন এক নাট্যপরিচালকের হতে তুলে দিয়ে তিনি নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে আছেন। চুক্তি অনুযায়ী ৩ মাস বা ৬ মাস পর লাভসহ টাকা ফেরত পেলেই তিনি খুশি। অনেকটা সুদে টাকা লগ্লীকরার মতোই বিষয়টা।

আমারদের দেশে এখন অনেক চ্যানেল। প্রতিদিন প্রচারের জন্য অনেক নাটকের দরকার হয়। এসব নাটক চ্যানেলে প্রাচারের জন্য বিভিন্ন প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ সরাসরি নিজস্ব পরিচালক দিয়ে নির্মাণ করেন। বিভিন্ন প্রযোজনা সংস্থা থেকে কিনে নেন। বিভিন্ন পরিচালদের নাটক নির্মাণরে জন্য অনুমতিপত্রসহ এ্যাসাইন্ট করা হয়। আবার কখনো চ্যানেল কর্তৃপক্ষ পরিচালক বা প্রযোজককে সময় বরাদ্দ দিয়ে থাকেন। এটাকে চাঙ্ক বলা হয়। চাঙ্ক কখনো শেয়ারিং এর মাধ্যমে বরাদ্দ দেয়া হয়। আবার কখনো টাকার বিনিময়ে সময় কিনে নেন প্রযোজক বা পরিচালক।

নাটক নির্মাণরে প্রধান উপজিব্য হলো বাজেট বা অর্থ বরাদ্দ। এর উপরই নির্ভর করছে নাটকটির গুনগত মান কেমন হবে। আবার অনেক সময় নির্মাতার নিজস্ব কোয়ালিটির উপরও নির্ভর করে নাটকটির গুনগত মান কেমন হবে। কারণ নাট্য নির্মাতার কোয়ালিটি না থাকলে বাজেট বেশি হলেও তিনি গুনগত মানের নাটক নির্মাণ করতে পারবেন না। আমাদের দেশে নাট্যপরিচালকদের কোন শ্রেনী নির্বাচন করা নেই। যে কারণে নাটক নির্মাণরে বাজেট বরাদ্দেও কোন পার্থক্য নেই। সিনিয়র নাট্যপরিচালক এবং জুনিয়র পরিচালকদের জন্য আলাদা কোন ক্যাটাগরি নেই। কর্তৃপক্ষকে বা প্রযোজককে খুশি করে যে যত পারছে নাটক নির্মাণে বাজেট বরাদ্দ নিচ্ছে। এতে এক শ্রেনীর অপেশাদার লোক নিজেকে পরিচালক পরিচয় দিয়ে ফায়দা লুটে নিচ্ছে। এ ধরণের তথাকথিত পরিচালকরা সাধারণত নতুন কোন ব্যাবসায়ী বা বিত্তশালীকে বিভিন্ন চাকচিক্য লোভ দেখিয়ে অর্থলগ্নীকরতে উৎসাহিত করেন। তারা মনে করছেন একজন ভাল ক্যামেরাম্যান এবং একজন ভাল সহকারী পরিচালক নিলেই নাটক নির্মাণ হয়ে যায়। এভাবে নাটক নির্মাণরে নামে চলছে প্রহসন। যার ফলে এই সব পরিচালকের নাটক অনেক সময় প্রচারিত হয় না। নির্মিত নাটক পড়ে থাকে ড্রয়ারবন্দী হয়ে। ফলে নতুন প্রযোজকরা নিরুৎসাহিক হচ্ছেন।

নুতন প্রযোজকদের মিডিয়ার নাটক নির্মাণ এবং প্রচারের জন্য বিক্রির বিষয়টি অজানা থেকেই যাচেছ। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অনেকেই ইচ্ছামতো নাটকের বাজেট নিয়ে নাটক নির্মাণ করছেন। কিন্তু প্রত্যেক টেলিভিশন চ্যানেল একই বজেটের নাটক প্রচার করছে না। আমাদের দেশে বর্তমানে প্রোগ্রাম ভিত্তিক চ্যানেল আছে বেশ কিছু। তবে সব চ্যানেলে একই মানের নাটক প্রচার করে না। যে কারণে নাটকের মান বা নাটকের বাজেটে থাকে ব্যবধান। তাছাড়া এক চ্যানেল কমেডি ভিত্তিক নাটক প্রচারে আগ্রহ বেশি। অন্য অনেক চ্যানেল শহুরে প্রেমের নাটক প্রচারে আগ্রহ বেশি। আবার অন্য চ্যানেল সময়োপযোগি ম্যাসেজধর্মী নাটক প্রচারে আগ্রহ বেশি। এছাড়াও কোন কোন চ্যানেলে বিদেশি আদলের নাটক প্রচারের আগ্রহেরও কম নেই।

রয়েছে আর্টিস্ট নির্বাচনের বিষয়। এক চ্যানেলে এক এক শিল্পির চাহিদা বেশি। এছাড়াও রয়েছে এইচ ডি ক্যামেরার চাহিদা। নরমাল ক্যামেরা এবং ফুল এইচ ডি ক্যামেরার ভাড়ায় রয়েছে পার্থক্য। ক্যামেরা অপারেটরের মধ্যেও রয়েছে পার্থক্য। যে কারণে সব মিলিয়ে নাটকের বাজ