ঢাকা, ||

হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক পালকি


এক্সক্লুসিভ

প্রকাশিত: ৫:১৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৮, ২০১৭

আব্দুল্লাহ আল নোমান

বরগুনা প্রতিনিধি

অপর্ণা সাহা:   আধুনিক প্রযুক্তি আর যান্ত্রিক বাহনে যুগে হারিয়ে যেতে বসেছে হাজার বছরের প্রাচীন বাংলার  ঐতিহ্যের ধারক “পালকি”। একসময়ে বিয়ের দুলহান-দুলহানীকে বাহনের  অন্যতম মাধ্যম ছিল পালকি। আজ দেখা নেই। প্রত্যান্ত অঞ্চলসহ গ্রাম গঞ্জ থেকে কালেগর্ভে হারিয়ে গেছে বাংলায় সে ঐতিহ্য।

আগামি প্রজম্মকে দেখাতে পালকিকে পঠিয়ে দেওয়া হয়েছে যাদুঘরে। বাংলার সবুজ শ্যামল মেঠো পথের এক সময়ে নিত্য দিনের বাহন ছিল পালকি। পালকির সঙ্গে ছিল বাংলাদেশের তরুন-তরুনীদের আবেগ গাঁথা এক সম্পর্ক। এর সঙ্গে মিশে ছিল এক মধুময় স্বপ্ন গাঁয়ের পথে পালকিতে করে নববধূকে নিয়ে দৃশ্য দেখতে যুবতী মেয়ে সহ অনেকেই বাড়ির মধ্যে থেকে উঁকি-ঝুঁকি মারত। পালকির মধ্যে বসা বৌকে দেখে তারাও হারিয়ে যেত কল্পনার রাজ্যে রাজকুমারকে নিয়ে। ছয় বেয়ার পালকি কাঁদে নিয়ে অদ্ভুত ছন্দ তুলে বৌকে নিয়ে শ্যামল বাংলার মেঠো পথে চলত। তখন গ্রাম-বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কয়েকগুন বেড়ে যেত। হরিশ মন্ডল, রবি মন্ডল, হরি জিৎ সিং সহ কয়েকজন বলেন,  আমদের বাপ-দাদারা গ্রামে-গঞ্জে পালকির বেয়ারা হিসাবে কাজ করতেন। যৌবনে গায়ে শক্তি থাকতে আমরাও সে  পেশাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহন করেছি। বর্তমানে পালকির ব্যবহার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিববার-পরিজন নিয়ে বহু কষ্টে দিনতিপাত করছি। বর্তমানে সে পেশা ছেড়ে বৃদ্ধ বয়সে কাঠ মিস্ত্রী হিসাবে জীবিকা নির্বাহ করিছি। আগেরকার দিনে নতুন বধু নাইয়র যেত সাজানে গোছানো পালকিতে ছড়ে। এখনকার বধুরা আর পালকিতে লাজ রাঙা মুখে শশুর বাড়ি যায় না। আমাদের সেই শ্যামল গ্রাম, সেই নতুন বধু সবই আছে। শুধু নেই কেবল পালকি।

পালিকির ব্যবহার কখন কিভাবে এদেশে শুরু হয়ে ছিল তার সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায়না। মৌঘল ও পাঠান আমলে বাদশাহ, সুলতান, বেগম ও শাহাজাদীরা পালকিতে যাতায়াত করত। দেশী-বিদেশী পরিবাহক ও ঐতিহাসিকদের তথ্য ও গবেষনা থেকে এ তথ্য পাওয়া যায়। ইংরেজ আমলের নীলকররা পালকিতে করে একস্থান থেকে অন্য স্থানে চলাফেরা করত। আর সেজন্যই পালকি অভিজাত শ্রেনীর বাহন হিসেবে গণ্য করা হত। মোগল আমলে পালকির কারুকাজ রীতিমত একটা কারু শিল্পে পর্যায়ে পৌঁছেছিল। পলকি দেখতে কাঠের নৌকা কাঠামো। দৈর্ঘ্য ৬ফুট  প্রস্থে তার অর্ধেক কাঠামোটি লম্বা দু’পাশে বাঁশের সাহেয্যে বাঁধা। উপরে ভেলবেটের কাপড়ে মোড়ানো। রেশনের জলর দিয়ে সাজানো।  তৎকালীন মুসলিম সমাজ ব্যবস্থায় এবং বাঙালির সংস্কৃতিতে পালিকির অবস্থান ছিল সুদৃঢ়। মুসলিম কুলিন সম্প্রদায়ের মেয়েদের পর্দা- পুশিদা রক্ষার জন্য পালকিতে ছড়ে বাড়ির বাহিরে যেত। আগে বিত্তশালী পরিবার গুলোতে নিজস্ব পালকি ও বেয়ারা থাকত। আর নিম্মবিত্তরা তাদের বৌ-মেয়েদের আনা নেওয়ার জন্য পালকি ভাড়া নিত। অন্যসব বাহনে চলা ফেরার ছেড়ে বিয়ে-সাদিতে পালকির ব্যাবহার ছিল অপরিহার্য।

নতুন বধুকে নিয়ে বেয়ারার নানান সুখ-দুঃখের গান গেয়ে দুলকি চালে চলত। আর ভেতরের বর এবং বধু তাদের প্রথম সাক্ষাত সেরে নিত স্বলজ্জভাবে। যুগ পাল্টে গেছে রাজা নেই বাদশাহ নেই, নেই পালকিও ও বেয়ারারা। এখনকার নববধূরা পালকিতে ছড়ে শশুর বাড়ি যাওয়া স্বপ্ন দেখে না। তারা এখন জাঁকজমক ভাবে সাজনো কার, মাইক্রো, বাসে করে দৃঢ় প্রত্যেয়ে শুশুর বাড়ি যায়। মানবিক জীবনের এসব যান্ত্রিকতা ব্যাক্তিগত জীবনকে ছুঁয়েচে অনেকাংশে। কালেভদ্রে এখনও কোন গ্রামে বিলসিতা হিসাবে সাজানো মাইক্রোর সঙ্গে হয়তো দেখা মিলে কোন পালকির। তবে সেইদিন আর দূরে নেই, যেদিন আমদের নতুন প্রজম্মরা পালকি নামক মানুষের গাড়ে ছড়া বসা কোন বাহনের কথা বই-পুস্তকে পড়বে এবং লোক শিল্পের যাদুঘরে গিয়ে সাজানো গোছানে কৃত্রিম পালকি দেখবে।-লেখক: সাংস্কৃতিক কর্মী

Top