ঢাকা, ||

হাটগঞ্জ কথা


সাহিত্য

প্রকাশিত: ১:৩৯ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ৫, ২০১৬

আব্দুল্লাহ আল নোমান

বরগুনা প্রতিনিধি

ক.
ধারাবাহিকতা থাকে না। ধারাবাহিক হয়ে উঠবার তীব্র আর্তিতে ধারাবাহিকতার ধারাবর্ণনার মধ্য দিয়ে একধরনের ধারাবাহিকতাই হয়তো এসে যায়। ঝাঁপসা সব গোলোকধাঁধার বৃত্তায়নে কবেকার এক কাঠপুল আর পুল থেকে নেমে এসে হাটগঞ্জের ভিতর যাওয়া। ধুলো ওঠার ব্যঞ্জনাময়তায় আটকে থাকা বিষণ্ণ বিবর্ণ ইটচাপা ঘাসের মায়াবন থেকে ভেসে আসে মোরগলড়াই পর্ব। এইসব ঘটনাক্রম থেকে জটজটিল ধাঁধার মতো এক পৃথিবী আবহমানের কালখণ্ড হয়ে জেগে উঠতে থাকে। মোরগলড়াই শেষ হয় তবে মোরগডাক থামে না। হাটের বিস্তার পেরিয়েও বিস্তারময়তার অচেনা কুয়াশাঘোরে বহু দূর থেকে দূরাগত হাওয়ার অনন্য নকশার সাজে সেজে ওঠে সবকিছু। ডুবে যাওয়ার অবকাশটুকুও দেয় না, কেবল জলজলায় কোরাসের অনবদ্যতায় সন্ধ্যেগুলি রাত্রিগুলি ভোরগুলি হাতড়ে হাতড়ে তুলে আনতে চাওয়া ব্যাঁকুল সব পুঁথিপত্র, কথকথা।

কথকথাগুলি তুলোবীজ ফেটে উড়তে থাকে আকাশময়। আঞ্চলিক ইতিহাসের অনুসন্ধান করতে গিয়ে ধানমাঠ এলুয়া কাশিয়ার ফুল লোকগাঁথার পুতুল ভগ্নসব হর্ম্য অট্টালিকা দালানকোঠার বহুস্বরিক এক ভুবনায়ন বর্ণময় হাটগঞ্জকোরাসের উষ্ণতর উত্তাপের ওম পোহাতে পোহাতে বসন্ত মালির ঢোল ও বাঁশিতে ঢেউ তুলতে থাকে। এইভাবে গানসমগ্রের মধ্যে এসে দাঁড়াতে হয়। পথঘাট জুড়ে অনন্যতার ধুলো ওড়ে। ধুলোতে ঢেকে যাওয়া স্মৃতিসকল ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে অংশত দৃশ্যমানতা অর্জন করতেই কৌম সমাজের যৌথতার লীনতাপটুকু অন্তত টের পাওয়া যায়। রাতের পাখিরা ডেকে ওঠে বন্ধ চোখের ভিতর। বাঁশবনে সংখ্যাতীত জোনাক জ্বলে। মোমবাতি জ্বেলে কারা যেন খুলে বসে কবেকার সব ধারাবাহিকতা হারিয়ে বসা মেঘনদীবাজনার গান।

খ.
হেরম্ব হেঁটে যাচ্ছে শূন্য সব মাঠপ্রান্তরের মধ্য দিয়ে। হেঁটে যাওয়াটা তার নেশা, জীবনের সাথে তীব্র জড়িয়ে থাকা; যেন অন্তহীন এক ভবিতব্য। হেরম্বর ঝাঁকড়া চুল সুপারিগাছের মতো পেশীবহুল নির্মেদ শরীর। ধারালো বল্লমচোখ। মঙ্গোলয়েড মুখ। দু’চোখে ঢের মগ্নতা আপাতবিষাদছোঁয়ানো। হেরম্ব হেঁটে যেতে থাকে মাইলের পর মাইল হেলাপাকড়ি বাঁকালী রামসাই জোড়পাকড়ি ভোটবাড়ি রাজারহাট চূড়াভাণ্ডার পদমতীর চর বরুয়াপাড়া জল্পেশ ছুঁয়ে ছুঁয়ে ধান, পাট, তামাকের অত্যাশ্চর্য জনপদগুলির মধ্য দিয়ে। হাঁটতে হাঁটতে ধরলা জর্দা বালাসন সানিয়াজান এইসব আঞ্চলিক নদীর জলে নেমে পড়ে সাঁতার কাটে, আবার কখনো ঘোড়াহাগা বিলে দু’দণ্ড নিজের মুখ দেখে আবারো হাঁটতে থাকে হাওড় বিল কুড়াদহের দিকে। হাঁটাই হেরম্বের নিয়তি, যেন নিশিডাক। হাঁটা শেষ হয় না তবে একসময় হাঁটাটাই যেন এসে ঢোকে বিষহরা গানের আসর জল্পেশ মেলা কিংবা ভাণ্ডানী ঠাকুরের থানে। এইভাবে উত্তরের এক ভূমিপুত্র শ্রী হেরম্বচন্দ্র বর্মন তার আত্মপরিচয় ও উৎস খুঁজতে শুরু করে একধরনের ঘুমঘোরের বাধ্যবাধকতাহীন অনিবার্যতায়। তখন পাটখেত গমখেতে বৃষ্টির জমা জলে কিলবিল করে হেলেসাপ জলঢোড়া সোনাব্যাঙ কোলাব্যাঙ আর লোকজসুরের বহতায় বেজে ওঠে আদিঅন্তহীন সব গান। তিস্তাপাড়ের গ্রামে গ্রামে তিস্তার চরে চরে সারাটা বৈশাখ মাস জুড়ে তিস্তাবুড়ির গান জাগে, মেচেনী খেলায় মেতে ওঠে মেয়ে বউয়ের দল। অলংকৃত ছাতা মঙ্গলকলস দলবদ্ধ নাচের মোহগ্রস্থতায় সীমাহীনতায় হাই তুলতে তুলতে এগিয়ে আসে নদীজলবাহিত চিরায়ত কুয়াশার দলাপাকানো শূন্যতারা। এতকিছু ঘটে যায় হেরম্বের আপাত নিরীহ পদযাত্রার প্রায় পুরোটা জুড়েই।

গ.
হাট বসে হাটের মতো। হাটের পরিসর এসে, স্পর্শ করে মন্দির, বৃহৎ জলাশয়। হাতের মধ্য দিয়ে মেচেনী খেলতে যায় মেচেনী দল। ঢাক বাজে। মুখাবাঁশি। সানাই। হাটের নিজস্বতায় মিশে যেতে থাকে লোকবাজনার সমগ্রটুকু। এতসবের যথাযথ হেরম্ব এসে পড়ে। দু’দশ বিশ পঞ্চাশ হাটগঞ্জ ঘোরা হেরম্ব হাটের রকমফের ও বদলটুকু অনেক অনেক আগে কিছু কিছু হাটে সে দেখেছিল কোচবিহারের মহারাজার শিকারযাত্রার মিছিল, কামতাপুরের জুলুস, রাণী অশ্রুমতীর জলসত্র উদ্বোধন, নুরুদ্দিন জোতদারের সফেদ হাতি, ঝামপুরা কুশানীর কুশানযাত্রা আরো আরো অনেক কিছু। আবার হেরম্বের সাথে জলধোয়া বসুনিয়ার প্রথম দেখাসাক্ষাৎ এরকমই কোন হাটে। হাটের খণ্ড অণুখণ্ড উপখণ্ড জুড়ে কতরকমের মানুষজন কথাবার্তা খোসপাঁচালি। হাটের নিজস্ব ভাষায় হাটকথা বলে যায়। কথাবার্তার সূত্র ধরে না দিলেও কথাবার্তা গড়াতে থাকে যেভাবে রাত গড়ায়। সকালের হাট বিকেলের হাট সন্ধ্যের হাট সব ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে ওঠে ভাঙা হাট। হাট ভাঙার অবসরে কূপির ছড়ানো ছড়ানো খণ্ড আলোর দোলাচলে হেরম্বর মনে পড়ে জলধোয়া বসুনিয়ার গরুর গাড়িতে চড়ে আরো আরো পাইকার ব্যাপারীর সাথে ভাঙা হাটের ধুলো ও বিষাদ মেখে গন্তব্যহীন কোন গন্তব্যের দিকে চলে যাওয়া। হেরম্ব বসে থাকে না; দাঁড়িয়েও না। আসলে থিতু হতে না পারার অনাবশ্যকতায় সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে শরীরময় শ্যাওলার বহুবর্ণতা নিয়ে আবহমান জীবনের দিকে পা বাড়ায় হেরম্ব। তখন তার কোন অতীত বর্তমান থাকে না, ভাবনাস্রোত লুপ্ত হয়ে যায়। হাটের চারপাশে ধানমাঠসরসেবাগিচা পুকুরদহ সবই গ্রাস করতে এগিয়ে আসে গাঢ় এক অন্ধকার, যা চিরায়ত। হাট থাকে হাটের মতো। হাটের গভীর থেকে গহন এক হাটই যেন উঠে আসে।

ঘ.
হেরম্ব হেঁটে যায়। কান্নার পর কান্না পেরিয়ে শীত বর্ষা বজ্র ঝড় সবকিছু সঙ্গে নিয়ে মাইলের পর মাইল। যাত্রাকালীন সময়পর্বে কত কত মানুষের সঙ্গে তার দেখা হয়। দেখা হওয়াটা বড় নয়। দেখা তো হতেই পারে। দেখা হওয়ার মধ্যে আবশ্যিক সূত্রসংযোগ অতিজরুরি ভাষ্যপাঠের মতো সংগত হয়ে উঠতে থাকে। একেক হাট থেকে গোলকধাঁধার বৃত্তায়ন ভেঙে ভেঙে বিচিত্রতর সব হাট হেরম্বর উল্লম্ফন ধ্বনিপ্রতিধ্বনির চিরন্তনতার মতো ঘোর তৈরী করে। জলধোয়া বসুনিয়া আব্রাহাম মিনজ অথবা মেচেনীবুড়ি বুধেশ্বরীর উষ্ণতায় আন্তরিক হয়ে উঠতে থাকার এক রসায়নে নদীমাঠ প্রান্তর গঞ্জহাট টাট্টুঘোড়া গরুর গাড়ির হ্যাঁচোর প্যাঁচোড় সমস্ত আবডাল টপকে পুনরাবৃত্তির মধ্যে ডুবে যেতে চায় বারবার। হেরম্ব হাঁটতে থাকে, সর্বাঙ্গে মাখতে চায় কেবল জীবন আর জীবন। নদীর শুকনো খাতে ভাবনাকাশিয়ার বনের মধ্যে মানুষের পায়ে পায়ে জেগে ওঠা নতুন নতুন সব পথ ধরে ধরে তার হেঁটে যাওয়া অন্তহীন ও অতিজীবন্ত ছবির মতো আবশ্যিক হয়ে ওঠে। আবশ্যিকতার বাঁকানো অংশগুলিতে কুশান পালার মেয়েরা কখনো নেচে ওঠে গানের সুরে সুরে। নদীর কিংবা নদীখাতের খুব গোপনতা থেকে দোতারা বাঁশিও বেজে উঠতে পারে। বেজে ওঠার সাবালকত্বের জন্য অপেক্ষা না করে হেরম্ব এগিয়ে যেতে থাকে হাঁটাপথে। জলধোয়া বসুনিয়ার সখ্যতাকে অস্বীকার করা যায়; উপস্থিতিকেও। এই মতন ভাবনাকে প্রামাণ্যতার সহজিয়ায় ভাসিয়ে দেবার সুযোগ কখনো আসলেও সেটাকে প্রতিষ্ঠিত করার আগ্রহকে সামগ্রিক এক জলবর্ষায় মিশিয়ে দিতে চাইবার প্রাণপণ আকুতিটুকু বুকের খুব নিজস্ব নিভৃতিতে ক্রমাগত আগলে রাখতে চায় হেরম্ব। আত্মপরিচয় খুঁজতে গিয়ে রহস্যময় জীবনকথার জালে প্রবেশ করতে গিয়ে সে কিন্তু তার সততাটুকু হারায় না। হেরম্ব হেঁটে যায় অতিবিরল এক দৃশ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে।

ঙ.
জেগে থাকা হাটগুলি নদীনালার কোলে। হাট ঘুমোয় না। হাটতলা শান্ত হয় তবে ঘুমোয় না। না ঘুমোবার তত্ত্বতালাস দু’একটা বেড়াল কুকুর গরু ছাগলের সযত্ন রচিত বিশ্রামাগারে পরিণত হয়ে উঠতে পারে। তখন হাটতলায় বেড়াতে বেরোয় মহাকালের ষাড়। বাইসনের মতো বাঁকানো শিংয়ের গাম্ভীর্যতায় মহামহীম দৃশ্যের মতো দৃশ্যান্তর যেন। শাকের আঁটি বিক্রি করতে আসা ধনবালা বর্মন, খইচালু দাস বিভ্রম ভেঙে দৌড়াতে পুনর্বার বিভ্রমেই ফিরে আসে তারা। হাট ঘুমোয় না, তবে আড়মোড়া ভাঙে, পাশ ফিরে শুয়েও পড়তে পারে খানিকক্ষণ। মাইক বাজিয়ে জড়িবুটির কবিরাজি ঔষধ বিক্রি করতে থাকে নিয়ামত কবিরাজ। কবিরাজের কিসসাকথন থামতে না চাওয়া ফুরোতে না চাওয়া গল্পগুলিকে প্রসারিত করে পল্লবিত করে। কবিরাজের গলার শিরা ফুলে ওঠে, কাঁপুনি কম্পন এসে যায় খানিকটা। তার শাগরেদরা চা খায়, ঢোল বাজায়, জমায়েতকে সংগঠিত হতে দেবার সুযোগ দেয়। হাট ঘুমোয় না, হাটে হাটে গড়াতে থাকে দাঁতব্যথার ঔষধ যৌবনবর্ধক টনিক বাতব্যাধির মালিশমলম। জমায়েত হাসে। হাসির লহর ওঠে। যেন ধানখেতে হলখল, বাতাসফেরি। জমায়েত শুনতে থাকে মিঞা-বিবির কিসসা, আলাদিন দেউনিয়ার চার নম্বর বিবির নিশিযাপন বৃত্তান্ত, চোরচুরনীর গান আরো আরো কত কি। হাটের মূল অংশ বলে তো কিছু নেই, গলি তস্য গলি গলিপথের যোগবিয়োগ প্রশাখার মতোন ছড়ানো অংশগুলির অধঃক্ষেপ জড়ো হতে হতে একসময় হাট মূলগত ঐক্যের রূপধারণ করে। তখন কালো কালো মাথার জনসমাবেশ থেকে বোঝাই দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে যে কোনটা হাটমুখি আর কোনটাই বা হাটফেরত। কৌতুকপ্রবণ এক সমাবেশ থেকে প্রবেশ প্রস্থানের লোকপুরাণের মাথা তুলে দাঁড়ানো। লোকপুরাণ কী তবে অনিবার্য অংশ রূপে হাটকে স্বীকৃতি দেয় নাকি স্বীকৃতির অপেক্ষায় না থেকে হাটই হাটপুরাণে রূপান্তরিত হয়ে লোকপুরাণের অভিনব ভাষ্য রচনা করে।

চ.
এইভাবে জঙ্গলঘেরা এক জনপদের ভিতর এসে পরে হেরম্ব। ভয়াবহ সব জঙ্গল। দূরে দূরে ভূটান পাহাড়ের দৃশ্যঘের। জঙ্গল সন্নিহিত অনেক অনেক জলাভূমি। বড় বড় মহিষের পাল শরীর ডুবিয়ে বসে থাকে। এসব জঙ্গলের অনেকটাই কোচবিহারের রাজাদের রিজার্ভ ফরেস্ট ছিল, একদা স্বাধীন পরে করদ মিত্র রাজ্য। রাজা মহারাজা জমিদার ব্রিটিশ রাজপুরুষেরা শিকার খেলতেন। বাঘ বাইসন হরিণ শুকর মারতেন। আগুন জ্বালিয়ে বিদেশি মদের গ্লাসের সহযোগে ‘ক্যাম্প ফায়ার’ হত। শিকারের হাঁকোয়ালী করানো হত স্থানীয় গ্রামবাসীদের দিয়ে। হেরম্বর স্মৃতিতে আছে এক রাজার শিকারযাত্রার বর্ণময় দৃশ্য। কাছেই ছিল রাজার দীঘি। শুটিংক্যাম্প। সাহেবপোতা। চিলারাজা বা নলরাজার গড়। মহারাজার শিকারতাঁবু পড়তো শুটিং ক্যাম্পে। রাজারদিঘিতে স্নান সারতো রাজাবাবুর যত হাতি ও ঘোড়াদল। কোচবিহার রাজবাড়িও হেরম্বর দেখা। সে এক আলোয় আলোয় আতসবাজিতে জেগে থাকা রাজনগর। উৎসবমুখর। রাজাবাহাদুরের ছোটবোনের বিয়ে বলে কথা। সেই পাঁচশ’ বছরের জৌলুসময় রাজতন্ত্র আর নেই। রাজরাজেরাও কবে উধাও। হেরম্ব কি সামান্য স্মৃতিকাতরতা টের পায়! স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ার জন্য বিশেষ কোনো আন্তরিকতা আছে বলে মনে হয় না। তবু জীবন্ত, মৃত, অতিজীবিত স্মৃতিসমগ্রতা বিস্তৃত এক স্মৃতিখন্ডে হাত বোলাতে থাকে সদাতৎপরতায়। হেরম্ব তার সুপারীগাছের মতো মেদহীন সতেজ শরীর নিয়ে স্মৃতিকাতরতার এ এমনই সংযোগসমাধানসূত্রহীন জটিলতাময়তা যার কোন প্রতিশব্দ হয় না; আর খেই হারানো মানুষের স্মৃতিমুখরতার আশ্রয়ের নিবিড় নৈকট্যে হেরম্বচন্দ্র তার ভবিষ্যতকে বুঝি ভবিষ্যতহীনতায় যুক্ত করে দেয়।

ছ.
হাট আবহমানের। হাট চিরন্তন। হাটের কোলাহল থেকে সরে এসে হেরম্ব নেমে যাচ্ছে মাঠঘাটের ভিতর। দোলাজমি অতিক্রম করছে সে। অতিক্রমণের নির্দিষ্ট কোন মাপকাঠি না থাকলেও দ্রুতগামী হবার সমূহতর সম্ভাবনা হেরম্বকে তাড়িত করে। একা হতে হতে একসময় সে একাকীত্ব সংশয় ঝড়জল ও ঘামের নোলকঝোলানো মদিরতায় মেদুর সত্যকথনের পাশে গলা ঝাড়ে। ফাঁকা ফাঁকা পাথারবাড়ির পথ ভাঙতে ভাঙতে কাশিয়াঝোপ ভাবনাবন আল আলি গলিপথ সরাতে সরাতে একসময় জাতীয় সড়কের মসৃণ ঝকঝকে পিচপথে উঠে পড়ে। এইভাবে ঘটনার কালপরিসীমা দ্রুততায় অতিক্রম করতে করতে হেরম্ব হাওয়ার বিরুদ্ধে নিজস্ব এক শোকসংগীত রচনা করতে চায়। যদিও জলাভূমির আবেষ্টনী তাকে আটকে রাখতে চায়। অথচ অবিচল নির্বীকার হেরম্ব জলাভূমির পাশে পাশে, একদা মহিষেরা গা ডুবিয়ে থাকতো যেখানে আশ্চর্যতায় হেঁটে যেতে থাকে। হাটপর্ব অতিক্রান্ত না হলেও আগামীর কোন আসন্ন ঝড়জলক্লান্ত হাটের অভিমুখেই হয়তো অনির্দিষ্ট এই যাত্রাপথ। পথ পথের মতো, পথের টানেই এগিয়ে যাওয়া। সাবলীল হতে পারাটা অসম্ভব তবু হেরম্ব মাদকতাময় হেঁটে যেতেই থাকে। হেঁটে যাবার ভঙ্গীতে আদ্যন্ত এক জীবন ধরা থাকে, তবু নদীতীরবর্তী অঞ্চলগাঁথায় সুরতাললয়হীন ব্যপ্ততায় কবেকার সব হাটবন্দরের প্রচ্ছায়া এসে জড়ো হয়। জমাট বাঁধে, যদিও নদীমাতৃকায় পলিমাটিপীড়িত এক সমাহার এসে যাবতীয় অন্ত্যজ উপকরণের ঢেউভাঙা আবিলতা এসে আবহমানতা লিখে রেখে যায় আর নকশাচাদরের অনবদ্যতা এড়িয়ে দিনের পিঠে দিন যায়, অতিক্রান্ত হয়। যদিও কাদামাটিলেপা জীবনের গভীরে স্পর্শযোগ্য বিভ্রম এসে যুক্ত হতে থাকে আর দ্বিধাদ্বন্দ্ব এড়িয়ে পুনর্বার আকাশমাটিজলের তীব্র সহাবস্থান নিয়ে সংহত হতে থাকে কতরকমের সব হাট।

জ.
হেরম্ব কি উপকথা মিথ ভেঙে আসা মানুষ? তবে কেন সে হাটে হাটে নদী নালা মাঠে মাঠে ঝোপ ঝাড়ে ঘুরে বেড়াবে! আত্মপরিচয় খুঁজতে খুঁজতে ক্রমশ সে এক সংকটের আবর্তে জড়িয়ে যাবে। কত কত মানুষ, প্রান্তিক ধানপথ, রোদবৃষ্টির কোরাসের মধ্য দিয়ে তার ধারাবাহিকতা না থাকা ধারাবাহিক আত্মভ্রমণ। একটা পর্বে সে চরাঞ্চল পেরিয়ে যায়। মোল্লাবাড়ির দিকে এগোতে থাকে। চাষাবাদে ব্যস্ত সব মানুষজন তাকে চোখ তুলে দেখলেও দেখার ভিতর ব্যস্ততা বা বিভ্রম থাকে না, যেন চিরচেনা দৃশ্য। যেরকমটা কাছেপিঠের সব হাটেই হয়। অভিজ্ঞতার ভিতর দাঁড়িয়ে থাকাটা বড় কথা নয়। অভিজ্ঞতার দিকে ভেসে যাওয়াটাই সারসত্য। ভিতরবাড়ির এগিনা হোক, বাহিরের খোলান হোক সে সব মুখ্য নয়; মেয়ে বউরা ধান ঝাড়ে ঢেকিপাড় দেয় চিড়া কোটে, ধান সেদ্ধ করে গুনগুন বা সমবেত গানও গাইতে থাকে কখনো প্রান্তসীমায় আকাশ ভেঙে নেমে আসা বৃষ্টির মতো এসবই চিরকালীন, প্রদীপ্ত। প্রদীপ্ততার আবেশটুকুও লুপ্ত হয়ে গেলে আর কিছুই ধারেকাছে থাকে না। হেরম্বের যাত্রাপথে কিছুই কি আলোড়ন তোলে না? দ্বিধাহীন নির্বিকার হেঁটে যাওয়াটুকু থাকে তার। মসজিদ, বনভূমি, হাইরোড, কবরখানা, চা-বলয়, আদিবাসী পাড়া, পূর্ববঙ্গ কলোনি, বর্মণটাড়ি, পর্যটক, কাঠের বাড়ি, জোড়াশিমুলগাছ সব, সবকিছু সে অতিক্রমণ করতে থাকে দু’দশ একশ’ দুশ’ বছরের কালখণ্ডে সে তার সমগ্র অতিক্রমণটুকু ধরে রাখতে চায়। হেরম্ব কি ক্লান্ত হয় না! খেঁজুরপাতার চাটাই বিছিয়ে তার কি জিরিয়ে নেবার সাধও জাগে না! বিষাদের বিষণ্নতার, অবসর থাকা না থাকার পৌনোপুনিকতায় মেঘগর্জনসম বর্ষানদীর প্লাবনপর্ব স্মৃতিবিস্মৃতি হয়ে জেগে থাকতে চায়। উপকথা মিথ ভেঙে হেরম্ব কেবল হেঁটে যেতে থাকে বাঁশবাড়ি লাইন, কলাবাগান, পাইকারকুঠি, ধানকল, কামতাপুরের মিছিল ওঠা কোন এক হাটগঞ্জের দিকে।

ঝ.
সমস্ত কিছুর ভেতর হেরম্ব থাকে। থাকা না থাকবার উপকথার শূন্য এক বৃত্ত রচিত হয়। যেন বাস্তব থেকে পরাবাস্তবতার দিকে চলে যাওয়া। যাওয়া বলে কিছু হয় না, হতে পারে না। অনেক অনেক নদী অনেক অনেক মানুষজন মিলে একধরনের যাদুবাস্তবতা তৈরী করে। হেরম্বকে কিঞ্চিত উঠে দাঁড়াতে হয়। দাঁড়াবার ভঙ্গিটা ঠিকঠাক হয় না, এটা সে বুঝতে পারে। আর অতিসত্বর হাঁটা শুরু করে। গন্তব্য ঠিক না থাকলেও আসলে সে কিন্তু একধরনের গন্তব্যই প্রত্যাশা করে। উপকথা ভেঙে ভেঙে মিথের ভিতর আত্মগোপন করা আর ইচ্ছে সত্বেও হয় না। কেবল মাঠঘাট, ঘরবাড়ি, গাছপালা, ঝোপঝাড় এসবের সম্মিলনে জীবন খোঁজার চেষ্টা। জীবন আদতে কী? আদিঅন্তহীন এক ভ্রমণসংগীত! হেরম্ব হেঁটে যায়, হেঁটে যেতে থাকে। এটা কি আত্মভ্রমণ! জীবনের অর্থ খোঁজার আপ্রাণ প্রয়াস। পুরোনো সময় থেকে ঘোড়াদল ছুটে আসে, বিরতিপর্ব শেষ হতেই বিস্তৃতি ফুরিয়ে বিস্তৃতির ঢালেই নেমে যাওয়া। গন্তব্যহীন অফুরান সময়যাত্রায় তালগোলপাকানো পরিপার্শ্বটুকু উজ্জ্বলতর হয়ে উঠতে পারে এমন সম্ভাবনা দুঃখকষ্ট ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে আসে। অগণন পাখি ওড়ে। গান ভাসে বাতাসের ভিতর। উপকথা দুমড়ে মুচড়ে খাবি খাওয়া মাছেদের মতো মৃতপ্রায় হয় আর আকাশ ভেঙে উপচানো আলো তার সময়যাত্রার প্রাথমিকটুকু সীমায়নে বাঁধা পড়ে; তবু মশামাছির দুর্গন্ধময় উপকথায় ধারালো অংশটুকু কখন যে ধারালো বল্লম হয়ে হত্যাকাণ্ডের মতো উদ্যত হতে চায় সেকথা হেরম্ব জানে না। সে কেবল পারিপার্শ্বীকতায় হাতড়ে বেড়ায় মহামহিম এক জীবনগাঁথা। স্বপ্নবৃত্তান্তের পর্ব থেকে পর্বান্তরে বৃত্তান্তের হাঁসগুলি মেঠোপথে নেমে আসে, মেঠো ইঁদুরের সাথে এক আবশ্যিক সান্নিধ্যতায়। এরকমভাবে বৃত্ত ভাঙা, বৃত্তরচনার খেলা চলতে থাকে। সমস্ত কিছুর ভেতর হেরম্ব থাকে, তাকে থাকতেই হয়; সে থেকেই যায়।

ঞ.
বদলে যাওয়া নদী কিংবা বদলানো নদীখাত সংযোগসূত্র হিসাবে যুক্ত হতে পারে, সংযুক্তির অধোক্ষেপটুকু দোলাচলে থেকে যায়; এমনটা হয় হতে থাকে, তবু আকাশের নেমে আসা নদীবুকে আশ্চর্য এক সুবর্ণ ক্যানভাস। নদীখাতের উর্বরতায় পলিসঞ্চিত শষ্যহিন্দোল নদী নদী দিয়ে বয়ে যাওয়া আবহমানের ইতিহাস হয়ে কিংবা ইতিহাসের গর্ভ থেকে নতুনতর নবীকৃত স্তরে স্তরে সাজানো আঞ্চলিকতায় ডুবে যেতে চায়। খাত বদলানো নদী হাট ঘাট বদলে দেয়। মানুষের চলাচল থেকে জেগে ওঠা চরাঞ্চল আদি ও অন্তের অদ্ভূত এক সহাবস্থানই রচিত হয় হয়তো। গোপন গানের মতো নিজস্ব মন্ত্রের মতো গতিহীন হয়ে যাওয়া না যাওয়ার প্রাসঙ্গিকতায় আলোআধাঁরি কুয়াশাকুহক কেটে হেঁটে যেতে থাকে খুটুরাম প্রধানী আব্রাহাম মিনজ এতোয়ারী এক্কা জঙ্গলে পাতা কুড়োতে থাকা পুষনী রাভার দল। এক খাত ছেড়ে নতুনতর সদ্যরচিত নদীখাতে নাব্যতায় দাঁড়িয়ে অপলক দেখে যাওয়া নতুন নতুন জনপদ চা-খেত গরু মোষ হাঁস মুরগী উঠোনের কইতর এতসবের সাবলীল গার্হস্থ্যযাপনচিত্র। ছবির মধ্য দিয়ে হাসি হুল্লোড় ও শব্দাবলী গড়িয়ে নামে, স্থিরতর না হতে পেরে দৈনন্দিনতায় মিলিয়ে যায়। রহস্যময়তার বিন্যাসটুকু জমে যাওয়ার অবকাশই হয়তো পায় না, কেবল সর্টকাটে ঝাড়ঝোপজঙ্গল পেরোয়। নদীর ব্যপ্ততার গড়ানে আবশ্যিক এক ভবিতব্যের অমোঘ সম্ভাবনা স্ফূরিত হতে থাকলেও নদীর দু’পাশে তালনারকেলসুপারীর অন্তরঙ্গতায় জনপদটাই প্রাধান্য পেয়ে যেতে থাকে। এরকমভাবে হয় না, হবে না জেনেও সাহেববাড়ির প্রাচীনতায় প্রবীণ কোন গ্রন্থের মতো জাপটে ধরতে চায়। অথবা মাইল মাইল বেতবাঁশবন থেকে অপ্রাকৃত সব সুর ও স্বর ধেয়ে আসতে চায় সম্ভাবনাকে উস্কে দিতে চেয়ে। সমূহতার ধারাবর্ষণে যুক্ত হতে গিয়ে শেষপর্যন্ত বদলে যাওয়া নদীখাতগুলিই অনিবার্য হয়ে জেগে থাকে দূরবর্তীতায় চেয়ে থেকে থেকে।

ট.
কান্না কি গানের মতো! মহিষের দুলুনি সওয়ারী চালের বিষণ্ণ এক গান অনেক অনেক গানটুকরোর ছড়িয়ে পড়া চারপাশের নৈঃশব্দে। নিশি পাওয়া ভূতগ্রস্থ মতো গান প্রসারিত হয়, আবর্তিত হয়, পাক খায় আর ধুলো ওড়াতে ওড়াতে প্রবল ঢুকে পড়ে জমজমাট হাটের বৃত্তে। হেরম্ব দাঁড়িয়ে থাকে সবজিহাটা ও গরুহাটির সংযোগরেখায়। তার সাথে খুটুরাম প্রধানীর দেখা হয়। খানেক কথাবার্তা, মুচকি হাসির বিনিময়ও হয়। বিনিময়পর্ব সমাপ্তীর আগেই ঘটনাস্থলে দলবলসহ এসে পড়ে খড়ম জোতদার তার অতিকায় মাথা কচুপাতের মাথাল কাঁঠালকাঠের সর্পমুখী জোড়া খড়ম সমেত। এখন জোতদারী নেই তবু খড়ম জোতদারের জোতজমি ও পঞ্চায়েতি আছে। আছে কুষাণ লোকগানের দল। হাটগুলোতে জনসংযোগ, লোকসংস্কৃতি ও বিনোদন সবই একযোগে সেরে নেওয়া যায়। দোতারার ডোল ডোল ডোল ডং সুরটুকু আবহবিস্তারকারী উপকরণ হয়ে তীব্রভাবে থেকে যায় গোটা হাটেই; কুশাণের সুর ভাসে, হাটকে জড়িয়ে রাখে, জমজমাটও! এভাবে হাটে হাটে আলোড়ন জাগে। হাটের শ্রেণীচরিত্র বিভাজিত হতে গিয়েও নতুন এক কার্যকারণের পাকেচক্রে অস্থির প্রতিপন্ন হয়, হয়ে পড়ে। হাটের পাশে হাট। হাটের মধ্যে কতরকমের হাট। সবজিহাটির কোণাকোণী হেরম্ব ও খুটুরাম দাঁড়িয়ে থাকতে না চাইলেও ঘটনাক্রমের প্রাসঙ্গিকতায় তাদেরকে দাঁড়িয়েই থাকতে হয় যতক্ষণ না জলধোয়া বসুনিয়া গামছাবান্ধা দই শালিধানের চিড়া নদীখাতের খই নিয়ে হাজির না হয়। বিকেলের আকাশ সমস্ত প্রাকৃত রঙ মুছে ফেলতে ফেলতে সমূহ সম্ভাবনার সম্ভাব্যতায় অপরূপ নশ্বরতাময় সকরুণ এক দিনাবসান চিরকালীন জলছবির মহার্ঘ্য ও সংরক্ষণযোগ্য এক স্মৃতিজাগানিয়া মহাজগতকথার আলিসায় হাটের বিষাদের পরতে পরতে গানের মতো মহামহিম হয়ে উঠতে থাকে।

ঠ.
সব হাটই কি একই রকম! বর্ণ গন্ধ রূপ রস আলাদা আলাদা হলেও আসলে একেক হাট একেক রকম। কিছু কিছু বড় গাঙ অতিক্রম করে যেতে হয়। অথবা বড় বড় নদী ঘেরা সেই সব হাট। ছোট নদী বাঁশের সাঁকোই ডিঙিয়েও কোনো কোনো হাট। চা-বাগান বনাঞ্চল চরাঞ্চল সর্বত্রই হাট আর হাট। আবার পাট তামাকের নির্দিষ্ট হাট ভাঙতেই, সবজিহাটা বসে যায়। সবজিহাটা দুপুর গড়িয়ে বিকেল অব্দি চললেও সন্ধ্যেবেলাগুলি অবশ্যই গরু ছাগল হাঁস মুরগির। দোদুল্যমানতার ফোঁকড়ে অসামান্য এক নিশ্চিন্ততায় নির্দিষ্ট গন্তব্যহীন মহাজীবনের দোলায় দূরন্ততর গতিময় রংবেরং মানুষেরা হেঁটে যেতে থাকে। তখন নাথুয়ার হাটে মথুরার হাটে আব্রাহাম কিসকু মোহন দেউনিয়া হাড়িয়ার তালে ধামসা মাদলের বোলে সুনিশ্চিত নাচতে থাকে, গাইতে থাকে গান- ‘হাওয়া লাগাই দে/সাইয়া হাওয়া লাগাই দে’। নাচগানের সমস্বরে অপার্থিব এক জীবন তার যাবতীয় আহ্বান আমন্ত্রণ মেলে ধরে, ছড়িয়ে দেয় দিক ও দিগন্তের অথৈ শূন্যতায়। জড়িবুটি বিক্রি করতে এসে হাড়িয়াহাটার দিকে আকুলি বিকুলি এক হাঁটা শুরু করে নাথুরাম পাইকার। হাঁটাটা একসময় মান্যতা পেয়ে যায় জাড্য ভেঙে ফেলে উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠে যখন একে একে জড়ো হয় বিলপুক নার্জিনারি, খোকা বর্মন, মন্দাদর মল্লিক, জার্মান রাভার দল। হাট থাকবে হাট গড়াবে, হাট হাটেরই বৃহত্তর সীমানাপ্রহর টপকে অন্যরকম হাটবাজার নির্মাণ বিনির্মাণ করবে না এটা তো হতে পারে না! যেকোনো হাট থেকে গান ভেসে আসতে পারে। গানের পর গান। গানের পিঠে গান। গানের ভিতর গান। গানের মন্দমন্থরতায় সুরতাললহরের খুব গহন থেকে জীবনের সব বিচিত্রতর নকশা গাঁথাতত্ত্বমোড়কে হাজির হতে থাকে। যেকোনো হাটেই এমনটা হয়, হতে পারে। সে নাথুয়া হোক মরিচবাড়ি হোক গোঁসাইহাট হোক, টাকোয়ামারি নিশিগঞ্জ ভবেরটাড়ি প্রেমচাঁদ যেকোনো হাটেই। সব হাটই কি একই রকম!

ড.
ভুলে যাওয়ারও তো একটা ইতিহাস থাকে। ইতিহাস থেকে ভুলে যাওয়া চাপা পড়া অংশগুলি অংশত আংশিক এক ভুলে যাওয়ার রদবদল এনে দেয়। হেরম্ব কি ইতিহাসের কেউ হতে পারে! হতে পারাটা সম্ভব নয় কারণ নিম্নবর্গের কোন ইতিহাস হয় না, হলেও মান্যতা পায় না। নদী নালা জঙ্গল জলা জনজাতি ভাষা বিভাষা কথা উপকথার প্রান্ত প্রান্তরের গানবাজনা পূজা লোকাচার সবকিছু নিয়ে অন্য ও অনন্য এক ইতিহাস মান্য ইতিহাসের সমান্তরালে তীব্রভাবে রচিত বিনির্মিত হয়ে উঠতে থাকে। মান্যতা এখানে গৌণ। মানুষের অংশগ্রহণ আবার অংশগ্রহণের সম্প্রসারণযোগ্য পটভূমির মধ্যে চিরকালীন ভোরবেলার মতো ইতিহাসের ভুলে যাওয়াটাকেই বিদ্রুপ করে; নির্মাণ বিনির্মাণ নিয়ে ইতিহাসেরই ইতিহাস রচিত হতে থাকে শব্দ-নৈঃশব্দে। নৈঃশব্দ খান খান করে কাঁচ ভাঙার যুদ্ধযাত্রার চক্রান্তকারীদের দরবারী ঝাড়লণ্ঠন ব্রাত্যমানুষের বিক্ষোভ-সংহত হতে হতে ইতিহাসের সংযোজিত অংশ হয়ে প্রাচীন প্রবীণ বৃক্ষশাখার হাওয়াবাতাসে সংকেতময়তার পরিসরটুকুতে ঠোক্কর দিতে থাকে। হাতিডোবার খাল কাজলীকুড়া সাহেবেরহাট দইভাঙ্গির দহ আশ্চর্য আঞ্চলিকতার মিথ ও গন্ধে প্লুত হতে হতে হেরম্ব নদীর সকল অংশগুলিই অতিক্রম করতে থাকে। অতিক্রমণের আবহমানতাটাই চিরসত্যি সূর্য ওঠা চাঁদ ডোবার মতো। ইতিহাসের চিরচেনা পথের প্রান্তরেখা ছুঁয়ে ইতিহাস চলতে চায়। অথচ আঞ্চলিকতার চোরা টানে চোরাবালির ভিতর ইতিহাসের আবশ্যিক নিয়মটুকুই বড় হয়ে ওঠে। যেন নিয়তিতাড়িত মানুষের হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন খোয়াব ইতিহাসেরই মহাবৃত্তান্তের রূপ ধরে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। প্রলোভনের ফাঁদ এড়িয়ে হেরম্ব জলধোয়া খড়ম জোতদার নিয়ামত কবিরাজ ধনবালা খইচালু সবাই মহার্ঘ্য এক ছবির ফ্রেমে গিয়ে ঢোকে মহাকালের চূড়ান্ততম কথাছবির মতো। ভুলে যাবার ইতিহাসটা যেমন সত্যি ঠিক ততটাই ইতিহাস ভুলে যাওয়াটাও।

ঢ.
এত সব ইতিহাস অঞ্চলকথা প্রান্তজনের আঞ্চলিক হয়ে উঠতে চাওয়ার মধ্যে কোথাও কি হেরম্ব ছিল? নাকি তাকে খুঁজে আনতে হবে? সেই যে এক বনাঞ্চল পর্বতরেখাবেষ্টিত জলাভূমির উপকথায় হেরম্ব দাঁড়িয়ে ছিল সেখান থেকে সকল আলস্য ভেঙে হেরম্ব আবার তার একক যাত্রা শুরু করে। শুরুর স্থবিরতা বাঁক নেবার অপ্রচলিতে আলস্যের আংশিকতার ঘনত্ব এনে দিতে চাইলেও তাকে অগ্রাহ্য করে জঙ্গলপথই হেরম্বর পূর্বনির্ধারিত। হেরম্বকে এভাবেই পেরিয়ে যেতে হবে দিবালোকের জঙ্গল আদিবাসীদের গ্রাম ঝোরা নালা চা-ফ্যাক্টরি হাসপাতাল নদী নদীপারের কুলবন, উঁচু উঁচু বাঁধ শেয়ালকাঁটার ঝাড় ঘণ্টাফুল লতানো গাছলতা বুনো ফল- সব, সবকিছু। এই যাত্রাপথে হয়তো জলধোয়া বসুনিয়া থাকবে না, তবে আরো আরো নতুন নতুন মানুষেরা তাকে সঙ্গ দেবে; সখ্যতাও। সখ্যতায় ঘনত্ব সেভাবে থাকবে না। অনন্ত এক উদাসীনতা তাহলে কি জড়ানো থাকবে হেরম্বর শরীরমনে! উদাসীনতা পাকেচক্রে শরীরে শ্যাওলাজড়ানো অনুভূতির দিকে আকাশমাটির বাস্তবতার বাস্তবতাটুকুই মেলে ধরবে। বৈশাখ আষাঢ় কার্তিক বর্ষা হিম বারমাস্যার গান হয়ে পথে পথে পাকাধানের খেতখামারে মাছধরার জালজালকের কৃষিকর্ষণ আদিবাসীদের করমপুজা নাচগান জঙ্গলের হাতি বাইসনের আগুনচোখ হরিণশাবকের নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে পড়া মেঘের ডাকে পেখমমেলা ময়ূরের নাচের অনবদ্যতায় জীবনের আপাতসরল সরলীকৃত ধারাবাহিক গতিময়তায় সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে থাকে। থাকাটাও আঞ্চলিক হয়ে উঠতে পারবে কিনা সেটা অনুধাবনের প্রয়োজনীয়তা অগ্রাহ্য করে হেরম্ব চলতে থাকে। তাকে ঘিরে ধরে বনবাদাড়ের যত পাখপাখালি হাতির মাহুত মাহুতের স্মৃতিজড়ানো সব হাতিগান; মহিষের পিঠে শুয়ে থাকা কিশোর, নদী পেরিয়ে নদী সাঁতরে জঙ্গলের নিশ্চিন্তিতে ঢুকে পড়া দশ কুড়ি বরাহ, বাইসন। থাকতে না চাইলেও সমস্তকিছুর হেরম্বকে কিন্তু থেকে যেতেই হয়, কেননা থেকে যাওয়া ব্যতীত তার আর কোনো উপায় নেই।

ণ.
প্রাত্যহিকতায় দৈনন্দিনে ভোরের ভেতর জেগে উঠতে চাওয়া ভোরগুলির ভাঁজে ভাঁজে কেমনতর দেহতত্ত্ব এসে পড়ে। তখন ফজরের নামাজ ভাঙে মোল্লাবাড়ির মসজিদে। জামাতের জমায়েত ভেঙে গেলে ভাঙা জমায়েতের টুকরোগুলির বিভ্রম থেকে ভ্রমবশত ভ্রামণিক লোকজতা বিনির্মিত হতে থাকে। কবেকার আভিজাত্য বনেদীয়ানা প্রাচীনতা নিয়ে মোল্লাবাড়ি যেন তার প্রবীণত্বকেই প্রতিধ্বনি ধ্বনির আবর্তে টেনে আনে। তামাকের হাট বল পাটাহাট বল গরুহাটি বল সব সবকিছুকেই মোল্লাবাড়ির চৌহদ্দীতে এনে ফেলতে হয়। কথিত আছে সেই কবেকার ওয়াহাবী ফরাজী খিলাফতের দিনগুলিতে মোল্লাবাড়ির রুকনুদ্দিন জয়নাব ইলিয়াস মইনুদ্দিনেরা দুধসফেদ ঘোড়া ছুটিয়ে চলে যেতেন দিকদিগন্তের পানে। মোল্লাবাড়ির ফরিদা ফুপু আঞ্জুমা নানীর ‘বিয়ের গীতের’ নিজস্ব দল ছিল যার কথা ৫০/৭০ মাইল ব্যাসার্ধের গ্রামগুলির পুরোনো নতুন মানুষেরা প্রায় সকলেই জানে। জানা অজানার পর্ব পর্বান্তর পেরিয়ে যেতে যেতে পটভূমির ভিতর মোল্লাবাড়ি ঢুকে পড়তে চায়; ঢুকে পড়ার পর্যাপ্ত অনুষঙ্গ প্রামাণ্যতা উপযোগী কিনা সেটা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে যখন মোল্লাবাড়িই প্রকৃতপক্ষে প্রাকৃতজনের এক পটভূমি হয়ে উঠতে থাকে। পটভূমি কি স্থিরচিত্র হয়ে পটভূমির ভিতর বসে থাকতে পারে! বসবাস করলেই কিংবা বসতি বসালেই তো আর হবে না; তাকে চলমানতা দিতে হবে। হাটবাজারের ব্যস্ততাও; লোকাচার লোকবৃত্ত কাঁথাসেলাইয়ের দিনগুলি বসতির প্রান্তিক রেখার স্পর্শযোগ্যতা স্বত্ত্বেও স্পর্শযোগ্য মনে না করার দ্বিধা দোলাচলে ভিন্নমুখি পটভূমির কথাই পটভূমির নতুন জেগে ওঠা অংশরূপে বিবেচ্য বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে থাকে; গড়ানো বেলার আকাশের গুটিয়ে নেয়া আলোর নিঃসঙ্গতায় জল জলা জনভূমির বিষাদের মহাশুন্যতায় বিলীয়মান সামগ্রিকতাটা লুপ্ত হতে হতে বিলুপ্তির সান্নিধ্যটুকু বেলা-অবেলার দিনবদলের ধরতাইটুকুই জাগিয়ে রাখতে চায়। জাগৃতির প্রাণময়তায় জলে ভাসা নুড়িপাথরের মতো চিরকালের সত্যিকথন হয়ে মোল্লাবাড়ি নামাজ জামাতের বহুস্বরিকতায় জেগে থাকে তীব্র এক জমায়েত হয়ে।

উপসংহারের বদলে
হেরম্বের কোন শেষ নেই। ফুরিয়ে যাওয়া নেই। উপসংহার নেই। হাটগঞ্জলোকজীবনের আবহমানতায় মিশে গিয়ে হেরম্বের চলাচল চলতে থাকে। মিথ ও ইতিহাসের শিকড়বাকড় জড়িয়ে নিয়ে প্রান্তবাসীর ইতিহাস লিখতে লিখতে বাড়িটাড়ির পাশ দিয়ে আঞ্চলিক নদীটদী টপকে টপকে হেরম্বের অন্তহীন এক কথকথার ইতিবৃত্ত।

Top