ঢাকা, ||

সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়াচ্ছে


অর্থনীতি

প্রকাশিত: ১১:৩২ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৪, ২০১৭

দীন মোহাম্মাদ দীনু

বাকেরগঞ্জ প্রতিনিধি

 

ব্যাংক আমানতের সুদহার মূল্যস্ফীতির নিচে নেমে যাওয়ায় সঞ্চয়পত্র কিনতে ব্যাংকগুলোয় হুমড়ি খেয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। কেবল গত পাঁচ বছরেই ১ লাখ ৩১ হাজার ২৭৭ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করেছে সরকার। চলতি জুলাই মাসেই সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে সরকারের ঋণ ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ কমলেও বছর বছর বেড়ে চলেছে সঞ্চয়পত্রে দেনার পরিমাণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০০৭-০৮ অর্থবছর শেষে সঞ্চয়পত্র খাত থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৬ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা। এর পাঁচ বছর পর ২০১২-১৩ অর্থবছর শেষে সঞ্চয়পত্র খাতে সরকারের দেনা দাঁড়ায় ৬৪ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। তবে পরের পাঁচ বছরে এ খাত থেকে সরকারের ঋণ বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জুনে সঞ্চয়পত্রে সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।

সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে নেয়া ঋণে ১০ থেকে ১২ শতাংশ সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে সরকারকে। যদিও ট্রেজারি বিলের বিপরীতে ২ দশমিক ৯০ শতাংশ সুদে ৯১ দিন মেয়াদি এবং ৫ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ সুদে পাঁচ বছর মেয়াদি ব্যাংকঋণ নিতে পারত সরকার। সঞ্চয়পত্র থেকে চাহিদার অতিরিক্ত ঋণ পাওয়ায় ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ তো নিচ্ছেই না, উল্টো ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আগের বকেয়া থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করেছে বিভিন্ন ব্যাংককে। এতে ব্যাংক ব্যবস্থায় সরকারের ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯০ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। অথচ এক বছর আগে অর্থাত্ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ব্যাংক খাতে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৮ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা।

সরকার সঞ্চয়পত্র স্কিম থেকে লক্ষ্যচ্যুত হওয়ার কারণেই সঞ্চয়পত্র বিক্রি অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে বলে মনে করেন অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জায়েদ বখত। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, সমাজের বিশেষ শ্রেণীর মানুষের উপকারের জন্য সঞ্চয়পত্র প্রকল্প চালু করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সব শ্রেণীর মানুষ সঞ্চয়পত্র কিনছে। দুর্নীতি ও কালো টাকায় সঞ্চয়পত্র কিনে দুর্নীতিবাজরা উপকৃত হচ্ছে। ফলে ঘাটতি বাজেট পূরণের নিয়ামক সঞ্চয়পত্রে সরকারের ব্যয় বাড়ছে। এটি রোধ করতে হলে সঞ্চয়পত্র কেনায় বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে। প্রকৃত গ্রাহকদের কাছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দেশে ২ হাজার ৫১৮ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল। ওই অর্থবছর শেষে সঞ্চয়পত্রে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৬ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা। বছরটিতে সঞ্চয়পত্র বিক্রির প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ। অর্থবছরটিতে মোট ৩ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়। ২০০৯-১০ অর্থবছরে হঠাত্ করেই সঞ্চয়পত্র বিক্রি ২৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেড়ে যায়। ওই অর্থবছর মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয় ১১ হাজার ৫৯০ কোটি টাকার। ২০১০ সালের জুনে সঞ্চয়পত্র খাতে সরকারের দায়ের পরিমাণ ৬২ হাজার ৫ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। এর পরের দুই অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র ক্রয়ে খুব বেশি উত্সাহ দেখা যায়নি সাধারণ মানুষের মধ্যে। তবে ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকেই হু হু করে বেড়েছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি। মূলত ওই সময় অতিরিক্তি তারল্যের দোহাই দিয়ে আমানতের সুদহার কমাতে থাকে ব্যাংকগুলো। দেশের ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদহারও কিছুটা কমিয়ে আনে। অব্যাহতভাবে আমানতের সুদহার হ্রাস করতে গিয়ে তা মূল্যস্ফীতিরও নিচে নামিয়ে আনে ব্যাংকগুলো। এ অবস্থায় আমানতের সুদের ওপর নির্ভরশীল মানুষ সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকে পড়ে।

২০১৩-১৪ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয় ১১ হাজার ৭০৭ কোটি টাকার। সে হিসেবে অর্থবছরটিতে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে ১৮ দশমিক ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ঘটে। ওই অর্থবছর শেষে সঞ্চয়পত্রে সরকারের দেনার পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৬ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকায়।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয় ২৮ হাজার ৭৩২ কোটি টাকার। ২০১৫ সালের জুনে সঞ্চয়পত্রে সরকারের দেনার পরিমাণ এক লাফে ১ লাখ ৫ হাজার ১৩০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। বছরটিতে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ে ৩৭ দশমিক ৬১ শতাংশ।

এর পর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৩৩ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকার। অর্থবছরটিতে সঞ্চয়পত্র বিক্রি ৩২ শতাংশ বেড়ে এ খাতে সরকারের ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮১৮ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।

দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে সদ্য সমাপ্ত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে। চলতি বছরের মে পর্যন্ত অর্থবছরের ১১ মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয় ৪৬ হাজার ৯৬৯ কোটি টাকার। অর্থবছরের শেষ মাস জুনে সবচেয়ে বেশি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। একক মাস হিসেবে শুধু জুনেই প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর ও পোস্ট অফিস থেকে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের পুরো হিসাব এখনো হাতে পায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। সে হিসেবে ২০১৬-১৭ অর্থবছর শেষে সঞ্চয়পত্র খাতে সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছরটিতে সঞ্চয়পত্র বিক্রির প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ। যদিও গত অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে ১৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল সরকারের।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেট পাস হয়েছে। এর মধ্যে অনুন্নয়ন বাজেট ২ লাখ ৪৫ হাজার ১৪ কোটি টাকার। সুদ পরিশোধে রাখা হয়েছে ৪১ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা, যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদই ৩৯ হাজার ৫১১ কোটি টাকা। সে হিসেবে মোট বাজেটের প্রায় ১৭ শতাংশ অর্থই ব্যয় হবে ঋণের সুদ পরিশোধে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৯ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে সঞ্চয়পত্রের সুদে।

চলতি অর্থবছর শেষে দেশী-বিদেশী মিলিয়ে রাষ্ট্রের মোট ঋণ দাঁড়াবে ৭ লাখ ৬১ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এর মধ্যে দেশের ভেতর থেকে নেয়া ঋণের পরিমাণ ৪ লাখ ৭১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ২ লাখ ৯০ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর শেষে দেশের জনসংখ্যা দাঁড়াবে ১৬ কোটি ৫০ লাখ এবং মাথাপিছু ঋণ দাঁড়াবে ৪৬ হাজার ১৭৭ টাকা। বর্তমানে মাথাপিছু ঋণ ৩৯ হাজার ৯৬৩ টাকা।

Top