ঢাকা, ||

লম্বা ঘন কালো চুলের জন্য সানস্ক্রিন !


ভ্যারাইটিস

প্রকাশিত: ৯:৩৫ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৫, ২০১৭

আব্দুল্লাহ আল নোমান

বরগুনা প্রতিনিধি

 

হ্যা, চুলের সানস্ক্রিন বলেও কিন্তু একটা জিনিস আছে। জানি অনেকেই এখনও ত্বকের জন্য সানস্ক্রিন কতটা জরুরি সেটাই অনুধাবন করতে পারেননি। আর অনেকে আছি আমরা যারা সান প্রটেকশনের ব্যাপারে সব জেনে বুঝেও দিনের পর দিন সানস্ক্রিন ইউজ না করে ত্বকের অসামান্য ক্ষতি করেই চলেছি। আমরা সবাই ভাবি-

‘যাই না আজকে বাইরে চলে, কি-ই বা এমন হবে?

আমার কিছু হয় না…!’ এরপর ত্বকের উপরের লাল বাদামি তিল আর মেছতার দাগগুলো দূর করার জন্য যে সেকি আপ্রাণ চেষ্টার সূচনা হয়…!! সেটা সানস্ক্রিনের জন্য একটু করলেও এই দিন দেখার প্রয়োজন হয়ত হত না, তাই না?

এমন সময়ে কেউ যদি বলে শুধু নিজের ত্বকের স্বাস্থ্য সৌন্দর্য বজায় রাখতেই নয়, চুলের স্বাস্থ্যের জন্যও আলাদা ভাবে হেয়ার সানস্ক্রিন ইউজ করতে হবে তখন অনেকে আমার কথা হেসেই উড়িয়ে দেবেন তাই না? চুলের সানস্ক্রিনের কনসেপ্ট অনেকের কাছেই নতুন মনে হতে পারে, কেনই বা হবে না? শীতের দুপুরের রোদে ঠায় বসে থেকে চুল শুকানোর জাতি যে আমরা, কিন্তু সানস্ক্রিনের অভাবে চুলের যে ক্ষতিগুলো হয় সেগুলো কিন্তু আমাদের অনেকেরই খুব পরিচিত… দেখুন তো আপনার চুলের দশার সাথে নিচের লক্ষণগুলো মিলিয়ে… নিজেই বুঝে নিতে পারবেন, সান ড্যামেজ অলরেডি আপনার চুলের সঙ্গী হয়েছে কিনা-

চুলের সান্সক্রিন, কেন?

রং ঠিক রাখার জন্য

চুলের রঙের এই যুগে লম্বা ঘন কালো এক ঢাল চুলের সখ এখন সবার হয় না। বিভিন্ন রং নিয়ে নিজের লুকের উপর এক্সপেরিমেন্ট চালানোই আজকাল ফ্যাশন।

কিন্তু আপনি জানেন কি? আপনার চুলের ন্যাচারাল রং যে দেয় সেই পিগ্মেনটের নাম হচ্ছে ‘মেলানিন’ সে আপনার চুলকে সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মির হাত থেকে বাচায়, ফ্রি র‍্যাডিকাল থেকে রক্ষা করে। কিন্তু চড়া UVA সূর্য রশ্মি এই মেলানিন কণাকে ক্ষতিগ্রস্থ করে। এর ফলে কি হয়? চুলের রং বদলাতে থাকে। মেলানিন নষ্ট হয়ে চুলের রং তামাটে হতে থাকে…

অনেকেই দেখবেন ছোটবেলায় চুলের রং ছিল কালো, কিন্তু যত বড় হচ্ছেন চুল ফিনফিনে হচ্ছে, আর তামাটে হচ্ছে। দেখে মনে হয় যেন চুলের সারা বডিই ফেটে গেছে… এমন চুল নিয়ে কি করবেন অনেকেই ভেবে পান না… তাই না?

কিন্তু আমার চুলতো কালার করা, সো চুল কালো রাখা নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই

ভুল। চুল কালার করা মানে অলরেডি আপনি আপনার চুলের উপরের প্রটেকটিভ লেয়ারের অপূরণীয় ক্ষতি করে ফেলেছেন। এই চুল যতদিন আপনার মাথায় থাকবে আপনাকে বাইরে থেকে তার প্রটেকশন দিতে হবে। নয়ত চুলের কালার চেঞ্জ তো হবেই (যেমন, পার্লার থেকে সখ করে অ্যাশ ব্লনড কালার করে এসে ক্যাম্পাসে বেশ চুল দুলিয়ে ঘুরে বেড়ালেন ১০-১৫ দিন, কালারটা এরপর একদিন কড়া কমলা হয়ে গেল)

অনেকেই এমন ঘটনা এক্সপেরিএন্স করেছেন তাই না? কালারড চুলের জন্য সানস্ক্রিনের কোন বিকল্প নেই।

রুক্ষ, শুষ্ক আর ফাটা চুলের গাছি

সূর্য রশ্মির UVA চুলের রঙের কি দশা করে সেটা তো জানলেন, এবার শুনুন UVB কি করছে। সে চুলের গঠনের উপরে আঘাত করছে। চুলের বডি যে কেরাটিন দিয়ে তৈরি তা মেলানিনের প্রটেকশনে থাকে। মেলানিন যেহেতু নষ্ট হয়েই গেছে, কালার/ সান ড্যামেজে। UVB এখন একটা একটা করে কেরাটিন কনা নষ্ট করতে শুরু করে… ফলে কি হয়? চুল ভয়ঙ্কর ড্রাই হয়ে যায়, চুল ফ্রিজি হয়ে থাকে (যেটাকে আমরা মুখের ভাষায় কাকের বাসা চুল বলি) আর চুল মাঝখান থেকে ভেঙ্গে যেতে শুরু করে। এবং চুলের আগা ফাটা তো আছেই…

সো সব মিলিয়ে আমরা কি পাচ্ছি, লালচে একগাছা ফিনফিনে পাতলা দুর্বল রুক্ষ ফাটা কাকের বাসা চুল…

এই কি আমি চেয়েছিলাম…?

কিছু হেয়ার সানস্ক্রিন : প্রায় প্রতিটি ব্রান্ডেরই আছে নিজস্ব হেয়ার সানস্ক্রিন , কিছু বিখ্যাত ব্র্যান্ড হচ্ছে-

ব্যানানা বোট হেয়ার সানস্ক্রিন , বাম্বল অ্যান্ড বাম্বল হেয়ার প্রাইমিং স্প্রে, ট্রেসেমে হেয়ার প্রটেকটিং স্প্রে…

এগুলোর দাম মোটামুটি ২০০০-৩০০০ টাকার ভেতরে। যেটা অনেকে স্কিনের সানস্ক্রিনের জন্যই কখনও ব্যয় করতে রাজি থাকেন না। চুলের জন্য খরচ করাটা অনেকের জন্যই সম্ভব না। কিন্তু তারপরেও যদি কেউ কিনতে চান এই ব্র্যান্ডগুলো ট্রাই করতে পারেন।

ঘরে বসে কি কিছু করা সম্ভব?

হ্যা। সম্ভব… চুলের জন্য ঘরে থাকা বেশ কিছু উপাদানই খুব ভালো সানস্ক্রিন হিসেবে কাজ করে। এমন কিছু উপাদানের নাম নিচে বলে দিলাম-

মেহেদি

চুলের উপরে একটি আস্তর ফেলে দিয়ে মেহেদি চুলকে বাইরের পলিউশন ধূলা ময়লা এবং সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে পুরোপুরি রক্ষা করতে সক্ষম… মেহেদির এই বেনেফিট পেতে হলে আপনাকে সপ্তাহে অন্তত একবার চুলে খুব ভালো করে মেহেদি (আসল) দিতে হবে। যাতে চুলের কোন অংশ বাদ না থাকে। চুলে আগে থেকে তেল দেয়া থাকা যাবে না। পরিস্কার চুলে মেহেদি দিয়ে অন্তত ৩-৪ ঘণ্টা রাখবেন। এতে মেহেদির রং পুরো চুল কাভার করবে। বেস্ট হচ্ছে যেদিন মেহেদি দেবেন সেদিন চুলে শ্যাম্পু না করা। সেদিন শুধু পানি দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলবেন। পরদিন শ্যাম্পু করবেন।

মেহেদির সাথে যা যা মেশাবেন তা হল-

আমলকীর রস/গুঁড়া
জবা ফুল (২-৩ টি) বাটা
চায়ের পাতা ফুটানো পানি (২ টেবিল চামচ চা পাতা ১ কাপ পানিতে ফুটিয়ে ঠাণ্ডা করে নেবেন)
অর্ধেকটা লেবুর রস

বিশুদ্ধ নারিকেল তেল

পিওর নারিকেল তেল চুলে এস পি এফ ৫-১০ পর্যন্ত প্রটেকশন দিতে পারে… ন্যাচারালি এর থেকে বেশি সান প্রটেকশন পাওয়া সম্ভব না। নারিকেল তেল দিয়ে চুল চপচপে করে ফেলাটা অনেকেরই পছন্দ হবে না।

এই জন্য কি কি করা যেতে পারে সেটার কিছু আইডিয়া দিচ্ছি-

১। ১ টেবিল চামচ পিওর নারিকেল তেল

কেউ কেউ জিজ্ঞেস করেন, অমুক হারবাল তেল, তমুক আমন্ড অয়েল নারিকেল তেল হিসেবে ইউজ করা যাবে কি না, না যাবে না। বাজারে খুব কম দামে পিওর নারিকেল তেল পাওয়া যায়। সো অমুক তমুক তেল ইউজ করার কোন দরকার নেই।

২। ১ টেবিল চামচ অ্যালোভেরা জেল

আসল অ্যালো জেল ইউজ না করাটাই বেটার। চুল আঠালো হয়ে যাবে। ট্রাই ন্যাচার রিপাবলিক জেল/ স্কিনক্যাফে/ ব্যানানা বোট… এগুলো সবই বেশ বাজেট ব্র্যান্ড।

৩। ১ চা চামচ তিলের তেল

কাচা বাজারে খুজলে পেয়ে যাবেন।

৪। পরিমান মতো পানি

পরিমান মতো বললাম কারণ একেকজনের চুল একেক পরিমান তেলে তৈলাক্ত হয়। সবার জন্য পরিমান সেইম না। নিজের চুলে কটটুকু তেল ইউজ করে আপনি হ্যাপি সেটা নিজেকেই ডিসাইড করতে হবে।

সব মিক্স করে একটা স্প্রে ক্যানে ভরে ফেলুন। খুব কম দামে স্প্রেয়ার গাউছিয়া/ মুস্তাফা মারটে পাবেন। বাইরে যাওয়ার আগে চুলের বডিতে এই স্প্রে দিয়ে স্প্রে করবেন। এবং এই সলিউশনটি অবশ্যই ফ্রিজে রাখবেন…

মেহেদি ইউজ রেগুলার করলে এই হেয়ার স্প্রে ইউজ করেই আপনি সূর্যের হাত থেকে চুলকে বাঁচাতে পুরোপুরি সক্ষম হবেন। কিন্তু আরও কিছু এঙ্গেল রয়ে গেল চিন্তা করার তাই না?

চুল যদি কালার করা হয়, মেহেদি ইউজ করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হবে না। সেক্ষেত্রে যেভাবেই হোক আপনি হোমমেড স্প্রে ইউজ করবেন। এবং বাইরে গেলে অবশ্যই ছাতা এবং স্কার্ফ ইউজ করে চুল কাভার করে রাখবেন। যার চুলের রং যত হালকা অথবা ব্লিচ করা তার চুলের যত্নে তত বেশি সচেতন হতে হবে। যদি না শখের কালারের পেছনে হাজার টাকা গচ্চা দিয়েও চুলগুলো হারাতে না চান।
যখন বেড়াতে যাবেন, স্পেশালি সি বিচে, বেড়াতে যাওয়ার আগে একবার হেনা ট্রিটমেন্ট করবেন। রোদে যাওয়ার সময় চুল কাভার করে নেবেন। এবং অবশ্যই অবশ্যই পানিতে নামার আগে, নারিকেল তেল চুলের আগা থেকে গোঁড়ায় খুব ভালভাবে লাগিয়ে নিয়ে তারপরে সমুদ্রস্নান করবেন। এতে সূর্যরশ্মি অথবা সমুদ্রের লোনা পানিতে চুলের কোন ক্ষতি হবে না। অনেকেই এটা না করে ২-৩ দিন বেড়াতে গিয়েই চুলের বারোটা বাজিয়ে ফেলেন। আশা করি এবার থেকে সচেতন হবেন।
ও আচ্ছা, কেউ যদি সুইমিং পুলে সাঁতার কাটেন তার জন্য কিন্তু একই টিপস, সাঁতারের আগে চুলের আগা গোঁড়ায় নারিকেল তেল ভালোভাবে দিয়ে চুল কাভার করে নেবেন। পুলের ক্লোরিন চুলের আর ক্ষতি করতে পারবে না।
আমি নিজে প্রতি উইকে মেহেদি দিয়ে পানি দিয়ে যেদিন চুল ধুই, সেদিন রাতে খুবই ভালোভাবে চুলে নারিকেল তেল মেখে রাখি… সকালে উঠে গোসল করি। এতে মেহেদীতে চুল একটু রাফ হওয়ার যে প্রব্লেমটা থাকে সেটা হয় না। যাদের চুল রিবনডিং করা তারা এই মেথড ইউজ করে উপকার পাবেন।

জানি হেয়ার সানস্ক্রিনের কনসেপ্ট অনেকের কাছেই একেবারেই নতুন। কিন্তু চুলের যে ক্ষতিগুলো হয়ে যাচ্ছে সেটা নিশ্চয়ই অনেকেই দেখছেন। কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারছেন না কীভাবে একটু কেয়ার নিলে চুলটা ভালো থাকবে তাই না? আশা করি আজ আপনাদের একটু হেল্প করতে পারলাম… এ বিষয়ে কোন প্রশ্ন থাকলে কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না কিন্তু। আজ এপর্যন্তই …

লিখেছেন – তাবাসসুম মিম

Top