ঢাকা, ||

রাম রহিমের পরী পালিয়েছেন এক কনস্টেবলের সঙ্গে?


আন্তর্জাতিক

প্রকাশিত: ৭:২৫ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৭

আব্দুল্লাহ আল নোমান

বরগুনা প্রতিনিধি

 

 

ভারতের বিতর্কিত ধর্মগুরু বাবা রাম রহিম তো জেলে। ‘পাপার পরি’ হানিপ্রীত কোথায়?‌ হরিয়ানা পুলিশ তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। জারি হয়েছে লুক আউট নোটিশ। নেপাল সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে ছড়াচ্ছে নানারকম খবর বা গুজব। একটি ‘‌খবর’‌ হলো, মুম্বই বিমানবন্দরে ধরা পড়েছেন হানিপ্রীত। গতকালই এই খবর রটেছে। কিন্তু কোনো সমর্থন পাওয়া যায়নি। রাম রহিমের এই পাতানো কন্যাটি নাকি ছদ্মবেশে অস্ট্রেলিয়া পাড়ি দেওয়ার চেষ্টায় ছিলেন। তার সঙ্গে নাকি রাম রহিমের আরও তিন অনুচর ছিল। গ্রেপ্তার করে তাকে নাকি গোপন জায়গায় নিয়ে গিয়ে জেরা করা হচ্ছে।
এদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে একটি চিঠি। তাতে হানিপ্রীতের সই। বলা হয়েছে এতে, ‘‌ফতেহাবাদের বিকাশের সঙ্গে আমি যাচ্ছি।’‌ এই বিকাশ নাকি একজন পুলিশ কনস্টেবল। তার একটি ঠিকানাও দেয়া আছে। ২৫ আগস্ট তারিখে চিঠিটি লেখা হয়েছে৷ ওইদিনই রাম রহিমকে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত৷ হেলিকপ্টারে জেলে নিয়ে যাওয়ার সময় রাম রহিমের পাশেই বসেছিলেন হানিপ্রীত৷ কিন্তু এরপর থেকেই তার আর কোনো খোঁজ মেলেনি৷ তবে যে চিঠিটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে তা আদতে হানিপ্রীতের কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে৷ পুলিসের ধারণা, এটি ভুয়ো।

একটি সূত্রের খবর, চিঠিটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকে হানিপ্রীতের নাম মুখে আনছেন না বাবা৷ অথচ কয়েকদিন আগেই হানিপ্রীতকে নিজের কাছে রাখার আবেদন জানিয়েছিলেন রাম রহিম৷ দুই সাধ্বীকে ধর্ষণের দায়ে আদালতের রায়ে ২০ বছর জেল হয়েছে রাম রহিমের। তার নানা কুকীর্তির কথা প্রকাশ্যে আসছে৷ দাদরির তিবালা গ্রামের এক পরিবার অভিযোগ করেছে, তাদের মেয়ে রেণু ওরফে শ্রদ্ধাকে ডেরাতে আটকে রাখা হয়েছে৷ ২০০৬ সালে ভাইয়ের সঙ্গে ডেরায় পড়াশোনা করতে গিয়েছিল শ্রদ্ধা৷ অনেক চেষ্টা করার পর শ্রদ্ধার ভাই জয়জিৎকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয় ডেরা৷ কিন্তু শ্রদ্ধা একবারও বাড়ি আসতে পারেনি। এখনও পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ মেলেনি৷ পরিবারের অভিযোগ, তাকে বন্দী করে রাখা হয়েছিল৷ এখন সে বেঁচে আছে কিনা সেটাও অনিশ্চিত। সাত বছর ধরে শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পরিবারের সদস্যরা৷ চিঠি লিখেছে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিকে৷

সিরসায় ডেরার সদর দপ্তর ঘিরে রেখেছে সেনাবাহিনী। ভেতরে তল্লাশি অভিযান চলছে। জানা গেছে, আশ্রম থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিস। সেই সঙ্গে ১৮ জন নাবালিকাকেও উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে তল্লাশিতে কিছুই না মেলায় হরিয়ানা প্রশাসনের বিরুদ্ধে গাফিলতি ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ওঠে। পুলিস রাম রহিমের পরিবারকে পালানোয় মদত দিয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে। অবশ্য পুলিস দাবি করে প্রায় ১০০০ একর জায়গার ওপর এই আশ্রমে তল্লাশি চালানো একদিনের কাজ নয়। অপরদিকে রোহতক জেলে চিৎকার, কান্নাকাটি করছিলেন রাম রহিম। এখন খানিকটা ধাতস্থ। জেলে বাগানের কাজেও লেগেছেন তিনি। দৈনিক ৪০ টাকা মজুরি। তবে এখনও মাঝেমধ্যেই দেওয়ালের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। অভিযোগ করেছেন জেলের খাওয়াদাওয়া নিয়েও।

রাম রহিমের বিরুদ্ধে সাধ্বীর সেই চিঠি, পড়লে শিউরে উঠবেন

আমি পাঞ্জাব থেকে আসা মেয়ে। সিরসা (হরিয়ানা)-র ডেরা সচ্চা সৌদায় একজন সাধ্বী হিসেবে সেবা করে চলেছি গত ৫ বছর ধরে । আমার মতো আরও কয়েকশো মেয়ে এখানে রয়েছেন, যাঁরা প্রতি দিন ১৮ ঘণ্টা করে সেবা করে চলেছেন।

কিন্তু এখানে আমরা যৌন নির্যাতনের শিকার। ডেরায় মেয়েদের ধর্ষণ করেন ডেরা মহারাজ (গুরমিত সিংহ)। আমি একজন স্নাতক। ডেরা মহারাজের উপরে আমার পরিবারের অন্ধ বিশ্বাস। পরিবারের সেই অন্ধবিশ্বাসের জেরেই আজ আমি একজন সাধ্বী। সাধ্বী হওয়ার বছর দুয়েক পর এক দিন রাত ১০টা নাগাদ হঠাৎ এক মহিলা ভক্ত আমার ঘরে আসেন। জানান, মহারাজ আমাকে ডেকেছেন। মহারাজ স্বয়ং ডেকে পাঠিয়েছেন শুনে খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েছিলাম। সাধ্বী হওয়ার পর সেটাই তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে তাঁর ঘরে ঢুকি। দেখলাম ওনার হাতে একটা রিমোট এবং টিভিতে তিনি ব্লু ফিল্ম দেখছেন। বিছানায় তাঁর বালিশের পাশে একটা পিস্তল রাখা ছিল। এ সব দেখে আমি ভয় পেয়ে যাই। ভীষণ নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম। এর পর মহারাজ টিভিটা বন্ধ করে দেন। আমাকে ঠিক তাঁর পাশে নিয়ে গিয়ে বসান। খাওয়ার জন্য এক গ্লাস জল দেন। তার পর খুব আস্তে করে বলেন, ডেকে পাঠানোর কারণ আমাকে তিনি নিজের খুব কাছের বলে মনে করেন। এটাই ছিল আমার প্রথম অভিজ্ঞতা।

এর পরই তিনি এক হাত দিয়ে আমাকে জড়িয়ে তাঁর আরও কাছে টেনে নেন। কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলেন, আমাকে তিনি হৃদয়ের গভীর থেকে ভালবাসেন। আমার সঙ্গে সহবাস করতে চান। বলেন, তাঁর শিষ্যা হওয়ার সময়ই আমার সমস্ত সম্পদ, আমার শরীর এবং আত্মা তাঁর কাছে উৎসর্গ করেছি এবং তিনি তা গ্রহণও করেছেন। আমি বাধা দিলে তিনি বলেন, ‘আমি ঈশ্বর, এতে তো কোনও সন্দেহ নেই’। আমি তাঁকে বলি, ঈশ্বর কখনও এ রকম করেন না। আমাকে বাধা দিয়ে তিনি বলেন:
১) শ্রীকৃষ্ণও ঈশ্বর। তাঁর ৩৬০ জন গোপী ছিলেন। যাঁদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ প্রেমলীলা করতেন। আমাকেও সবাই ঈশ্বর বলে মানে। এতে এত অবাক হওয়ার কিছু নেই।
২) আমি তোমাকে এখনই এই পিস্তল দিয়ে খুন করতে পারি। তোমার লাশ এখানেই পুঁতে দেব। তোমার পরিবারের প্রতিটা সদস্য আমার অন্ধ ভক্ত। তুমি খুব ভাল করেই জানো, তাঁরা কখনই আমার বিপক্ষে যাবেন না।
৩) সরকারের উপরেও আমার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। পঞ্জাব, হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী এবং কেন্দ্রের অনেক মন্ত্রীও আমার কাছে আসেন। আমার প্রতি তাঁদের ভক্তি দেখান। রাজনীতিবিদরা আমার কাছ থেকে সাহায্য নিতে থাকেন। সুতরাং তাঁরাও আমার বিরুদ্ধে কোনও রকম পদক্ষেপ করবে না। আমি তোমার পরিবারের সদস্যদের সরকারি চাকরি কেড়ে নেব এবং তাঁদের সেবাদার দিয়ে খুন করাব। আর সেই খুনের কোনও প্রমাণ থাকবে না। তুমি খুব ভাল করেই জানো, ডেরা ম্যানেজার ফকিরচাঁদকেও আমি গুন্ডা দিয়ে খুন করিয়েছি। এখনও সেই খুনের কিনারা হয়নি। ডেরার দৈনিক আয় এক কোটি। এই টাকা দিয়ে আমরা রাজনীতিক নেতা, পুলিশ এমনকি বিচারক সকলকেই কিনে ফেলতে পারি।

ঠিক এর পরই মহারাজ আমাকে ধর্ষণ করেন। গত তিন বছর ধরেই মহারাজ এ ভাবে আমাকে ধর্ষণ করে আসছেন। প্রতি ২৫ থেকে ৩০ দিন অন্তর আমার পালা আসে। আমি জানতে পেরেছি, আমার মতো যত জন সাধ্বীকে তিনি তলব করেছেন, তাঁদের সকলকেই ধর্ষণ করেছেন। বেশিরভাগেরই বয়স এখন ৩০ থেকে ৪০। বিয়ের বয়স পেরিয়ে গিয়েছে। তাঁদের কাছে এখন ডেরার এই আশ্রয় ছাড়া আর কোনও অবলম্বন নেই।

এই সমস্ত মহিলার বেশিরভাগই শিক্ষিত। কারও স্নাতক তো কারও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে। কিন্তু তাঁরা তা সত্ত্বেও এই নরকবাস করছেন। কারণ একটাই, মহারাজের উপরে তাঁদের পরিবারের অন্ধ বিশ্বাস। আমরা সাদা পোশাক পরি, মাথায় স্কার্ফ বাঁধি, পুরুষদের দিকে চেয়ে দেখি না। পুরুষদের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন হলে ৫-১০ ফুট দূরত্ব বজায় রাখি। কারণ, এ সবই মহারাজের ইচ্ছা। তাঁর কথা মতোই আমরা এখানে চলাফেরা করি। সাধারণ মানুষ আমাদের দেবী গণ্য করেন। কিন্তু তাঁরা জানেন না, ডেরাতে আমরা আসলে রক্ষিতা। ডেরা এবং মহারাজের আসল সত্যিটা আমি আমার পরিবারকে জানানোর চেষ্টা করেছিলাম। তাতে তাঁরা আমাকেই বকাবকি করেন। জানান, ডেরায় স্বয়ং ঈশ্বরের (মহারাজ) বাস। সুতরাং এর থেকে ভাল জায়গা আর নেই। এবং ডেরা সম্পর্কে যেহেতু আমার মনে খারাপ ধারণা জন্মেছে, তাই আমার উচিত ‘সতগুরু’-র নাম করা। শেষ পর্যন্ত আমাকে মহারাজের সমস্ত আদেশ পালন করতেই হয়, কারণ আমি সব মিলিয়ে অসহায়।

এখানে কাউকেই অন্যদের সঙ্গে বেশি কথা বলতে দেওয়া হয় না। পাছে ডেরার সত্য ফাঁস হয়ে যায়, তাই টেলিফোনেও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয় না। কোনও সাধ্বী যদি মহারাজের এই আচরণ ফাঁস করে দেন, তাহলে মহারাজের আদেশ মতো তাঁকে শাস্তি দেওয়া হয়। কিছু দিন আগে, ভাতিন্দার এক তরুণী মহারাজের এই সমস্ত নির্যাতনের কথা পরিবারকে জানান। মহারাজের নির্দেশে সমস্ত সাধ্বী মিলে তাঁকে বেধড়ক পেটান। মেরুদণ্ডে গুরুতর চোট নিয়ে তিনি এখন শয্যাশায়ী। তাঁর বাবা ডেরায় কাজ করতেন। কাজে ইস্তফা দিয়ে বাড়ি ফিরে যান। মহারাজের ভয়ে এবং আত্মসম্মানের কথা ভেবে মুখ খোলেননি।

একই ভাবে, এই নির্যাতনের শিকার হন কুরুক্ষেত্রের এক তরুণীও। ডেরা ছেড়ে বাড়ি চলে যান তিনি। তাঁর কাছ থেকে এ সব কথা জানার পর তাঁর ভাইও ডেরার কাজ থেকে ইস্তফা দিয়ে চলে যান। পঞ্জাবের সঙ্গরুর এক তরুণী সাহস করে বাড়ি ফিরে ডেরার ভয়ঙ্কর দিকটা সবাইকে জানিয়েছিলেন। পর দিনই ডেরার অস্ত্রধারী সেবাদার বা গুন্ডারা তাঁর বাড়িতে পৌঁছে যান। মুখ খুললে তাঁকে খুনের হুমকি দেন।
একই ভাবে মানসা, ফিরোজপুর, পাতিয়ালা এবং লুধিয়ানা থেকে এখানে আসা তরুণীরাও ভয়ে ডেরা নিয়ে কিছু জানাতে চাননি। তাঁরা ডেরা ছেড়ে চলে গিয়েছেন। কিন্তু তার পরও খুন হওয়ার ভয়ে মুখ বন্ধ করে আছেন। সিরসা, হিসার, ফতেয়াবাদ, হনুমানগড় এবং মেরঠের তরুণীরাও মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছেন।

আমিও যদি আমার নাম জানাই, তাহলে আমাকে এবং আমার পরিবারকে খুন করা হবে। সাধারণ মানুষের স্বার্থেই এই সত্য আমি সামনে আনতে চাই। এই মানসিক চাপ আর নির্যাতন সহ্য করতে পারছি না। খুব বিপদে রয়েছি। সংবাদমাধ্যম বা সরকারি কোনও সংস্থা যদি তদন্ত চালায়, তা হলে অন্তত ৪০ থেকে ৫০ জন সাধ্বী এগিয়ে এসে এই সত্য জানাবেন আমি নিশ্চিত। আমাদের ডাক্তারি পরীক্ষা করা হোক। আমরা আদৌ সাধ্বী কি না তা জানা হোক। পরীক্ষায় যদি প্রমাণ হয় যে আমদের কুমারিত্ব নেই, তাহলে তদন্ত করে জানা হোক, কে আমাদের সতিত্ব হরণ করেছেন।
তাহলেই সত্য বাইরে আসবে। মহারাজ গুরমিত রাম রহিম সিংহই যে আমাদের জীবন নষ্ট করেছেন তার প্রমাণ মিলবে।

(২৫.০৯.২০০২ সালে ‘দেশ সেবক’ নামক পত্রিকায় এই চিঠিটা প্রকাশ পায়। মহারাজ রাম রহিমের নির্যাতন আর মেনে নিতে না পেরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে চিঠিটি লিখেছিলেন এক তরুণী সাধ্বী। সেই চিঠির খবর প্রকাশ্যে আসার পরই রাম রহিমের বিরুদ্ধে পঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে সিবিআই-কে তদন্তের নির্দেশ দেয়।)

Top