ঢাকা, ||

রমজান মাসের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ


ধর্ম ও জীবন

প্রকাশিত: ৩:৪২ অপরাহ্ণ, জুন ৩, ২০১৭

দীন মোহাম্মাদ দীনু

বাকেরগঞ্জ প্রতিনিধি

পবিত্র রমজান মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো এর একটি রাত—শবেকদর, যে রাতে মানবতার মুক্তির সনদ কোরআনে কারিম সর্বপ্রথম নাজিল হয়েছে। কোরআনে কারিমের একাধিক জায়গায় তা উল্লেখ রয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনা মতে, রাসুল (সা.)-এর ঐতিহাসিক মেরাজের ঘটনাও রমজান মাসে সংঘটিত হয়েছিল। এ ছাড়া ইসলাম ও মুসলিমদের ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা বুকে ধারণ করে আছে এ রমজান মাস। সেগুলো বিশেষভাবে মুসলমানদের ত্যাগ ও ত্যাগের বিনিময়ে বিজয় ও সফলতার ইতিহাসসমৃদ্ধ। এতে প্রমাণিত হয়, রমজান মাস শুধু রোজায় ক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্ত হয়ে যাওয়ার মাস নয়, নয় শুধু বাহারি ইফতার ও উত্কৃষ্টমানের খাবারদাবারের আয়োজনের জন্য। বরং রমজান মাসের ইতিহাস তো মুসলিমদের ত্যাগের ইতিহাস। তাই আমরা যেন সেই ইতিহাস ভুলে গিয়ে শুধু রমরমা ব্যবসা-বাণিজ্য ও বাহারি খাবারদাবারেই ডুবে না যাই।

ঐতিহাসিক বদরযুদ্ধ

ইসলামের চিরস্মরণীয় ও গৌরবময় একটি অধ্যায় হলো বদরযুদ্ধ। মক্কার অদূরে বদর নামক স্থানে এ মাসেই সংঘটিত হয়েছিল ঈমান ও কুফরের মধ্যে প্রথম যুদ্ধ। ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে তথা দ্বিতীয় হিজরির ১৭ রমজান এ প্রান্তরেই সংঘটিত হয়েছিল মুসলিম ও কাফিরদের মধ্যকার এ ঐতিহাসিক যুদ্ধ। এ যুদ্ধে মাত্র ৩১৩ জন প্রায় নিরস্ত্র মুসলমানের মোকাবেলায় শোচনীয় পরাজয় বরণ করতে হয় কাফির বাহিনীর সহস্রাধিক সশস্ত্র সৈন্যকে। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সরাসরি তিন থেকে পাঁচ হাজার ফেরেশতা দিয়ে মুসলমানদের সাহায্য করা হয়। এ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে মহাবিপ্লব সাধিত হয়েছে। তাই পবিত্র কোরআনে এ যুদ্ধকে ‘ইয়াওমুল ফোরকান’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বদরযুদ্ধে আবু জাহেল, উতবা, শায়বাসহ মোট ৭০ জন কাফির নিহত হয়। আরো ৭০ জন কাফির মুজাহিদদের হাতে বন্দি হয়। অন্যদিকে ১৪ জন মুসলিম মুজাহিদ বীরবিক্রমে লড়াই করে শাহাদাতের গৌরব অর্জন করেন। বন্দিদের সঙ্গে রাসুল (সা.)-এর ক্ষমাসুলভ আচরণ দেখে মুগ্ধ হয়ে পরবর্তী সময় অনেকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন।

মক্কা বিজয়

অষ্টম হিজরির ২০ বা ২১ রমজান জুমাবার রাসুল (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম মক্কা বিজয় করেন। একসময় কাবাগৃহ ছিল বিশুদ্ধ একত্ববাদের কেন্দ্রস্থল। একমাত্র আল্লাহর বন্দেগির জন্য আল্লাহর নির্দেশে এটি পুনর্নির্মাণ করেছিলেন হজরত ইবরাহিম (আ.)। এটি মুশরিকদের দখলে থাকায় শিরকের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল। রাসুল (সা.) তাওহিদের এ পবিত্র স্থানকে শিরকের নাপাকি থেকে মুক্ত করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কায় প্রবেশ করে কোনো প্রতিশোধ গ্রহণের কথা বলেননি। তিনি এ মর্মে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন—এক. যারা আপন ঘরের দরজা বন্ধ করে থাকবে তারা নিরাপদ। দুই. যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে থাকবে তারাও নিরাপদ। তিন. যারা কাবাগৃহে আশ্রয় নেবে তারাও নিরাপদ।

মক্কা বিজয়ের এই ঘটনার সঙ্গে আধুনিককালের কোনো রাজ্যজয়ের ঘটনা তুলনা করলেই ইসলাম ও জাহিলিয়াতের পার্থক্যটা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। জাহিলিয়াতের ঝাণ্ডাবাহীরা বিজয়কে মনে করে নিজেদেরই কৃতিত্বের ফসল। তাই বিজয় উৎসবের নামে তারা প্রকাশ করে দানবীয় উল্লাস। আর সে উল্লাসের শিকার হয় অসহায় ও নিরস্ত্র মানুষ।

তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) সেদিন কাবাঘরে প্রবেশ করে সর্বপ্রথম সেখানে রাখা মূর্তি বাইরে ছুড়ে ফেলার নির্দেশ দেন। তখন কাবাগৃহে ৩৬০টি মূর্তি বর্তমান ছিল। দেয়াল ছিল নানারূপ চিত্র অঙ্কিত। এর সবই নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়। এভাবে আল্লাহর পবিত্র ঘরকে শিরকের অপবিত্রতা থেকে মুক্ত করা হয়। এরপর রাসুল (সা.) তাকবির ধ্বনি উচ্চারণ করে কাবাগৃহ তাওয়াফ করেন। এ ছিল তাঁর বিজয় উৎসব। এত বড় একটি বিজয় উৎসবে বিজয়ীরা অত্যন্ত বিনয় ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে আল্লাহর কাছে অবনমিত হয়েছেন ও তাঁর প্রশংসাগীতি উচ্চারণ করেছেন। এটা ছিল মানবরচিত আইন-কানুনের বিরুদ্ধে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও একত্ববাদের মহা বিজয়।

নাখলা নামক জায়গার মূর্তি অপসারণ

রাসুল (সা.) অষ্টম হিজরির ২৫ রমজান হজরত খালেদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর নেতৃত্বে একদল সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন নাখলা নামক জায়গার একটি বৃহদাকার মূর্তি অপসারণের জন্য, কাফিররা এর পূজা করত, যার নাম ছিল উজ্জা। হজরত খালেদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) নিজ হাতে ওই মূর্তি অপসারণ করেন। এরপর তিনি বলেন, আর কখনো এখানে উজ্জার উপাসনা হবে না। (আলবিদায়াহ ওয়াননিহায়াহ : ৪/৩১৬)

তায়েফে লাত নামক মূর্তি অপসারণ

নবম হিজরির রমজান মাসে তায়েফের সাকিফ গোত্র স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং তারা নিজেরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেদের উপাস্য ‘লাত’ নামক মূর্তি অপসারণ করে। (আলবিদায়াহ ওয়াননিহায়াহ : ৫/৩১৬)

ঐতিহাসিক তাবুক যুদ্ধ

নবম হিজরির রজব মাসে তাবুক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কিন্তু তাবুক যুদ্ধের কিছু ঘটনা সংঘটিত হয় নবম হিজরির রমজান মাসে। (আলফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু : ৩/১৬২৭)

তাবুক মদিনা ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী একটি স্থানের নাম। মদিনা থেকে এটি ৬৯০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এ যুদ্ধ ছিল ইসলামের বিরুদ্ধে আরবের কাফির ও মুনাফিকদের শেষ চেষ্টা। মুসলমানদের বিরুদ্ধে তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম সাম্রাজ্যবাদী শক্তি রোমান ও আরবের কাফিরদের সমন্বয়ে ঘটিত যৌথ বাহিনীর রণপ্রস্তুতিই এ যুদ্ধের মূল কারণ। নবী করিম (সা.) মক্কা বিজয় ও হুনায়েনের যুদ্ধ শেষে যখন মদিনায় ফিরে এলেন, এর কিছুদিন পর সিরিয়া থেকে ফিরে আসা কিছু বণিকদলের কাছ থেকে খবর পেলেন, রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস মদিনা আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ লক্ষ্যে সিরিয়া ও আরব সীমান্তে তারা এক বিশাল বাহিনী মোতায়েন করছে। রোম ছিল তৎকালীন দুনিয়ার বৃহৎ শক্তি। মহানবী (সা.) ফয়সালা করেন, হিরাক্লিয়াসের আক্রমণের অপেক্ষা না করে মুসলমানরা নিজেরাই আগে তাদের ওপর আক্রমণ চালাবে। তিনি মদিনার সব মুসলিমকে এ যুদ্ধে শরিক হওয়ার নির্দেশ দিলেন। পরে রোমানরা মুসলমানদের ভয়ে যুদ্ধ না করেই পলায়ন করেছে।

কাদেসিয়া যুদ্ধ

এক বর্ণনা অনুযায়ী কাদেসিয়া যুদ্ধ ১৫ হিজরি সনের রমজান মাসে সংঘটিত হয়। সাদ বিন আবি ওয়াক্কাছ (রা.)-এর নেতৃত্বে মুসলমান ও রস্তুম ফাররাখজাদের নেতৃত্বে পারসিকদের মধ্যে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তবে ইবনে কাছির (রহ.) তারিখ উল্লেখ ছাড়াই বলেছেন, এটি ১৪ হিজরি সনে হয়েছিল। (আলবিদায়াহ ওয়াননিহায়াহ : ৯/৬১৩)

এ যুদ্ধে মুসলিম সৈন্য ছিল সর্বসাকল্যে ৩৬ হাজার বা তার চেয়ে কিছু বেশি। আর কাফিরদের সৈন্য ছিল দুই লাখ। চার দিন ও তিন রাত প্রচণ্ড যুদ্ধ চলার পর কাদেসিয়া যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। মাত্র ৩৬ হাজার মুসলিম সৈন্য দুই লাখ সুসজ্জিত পারসিক বাহিনীকে পরাজিত করে। এ যুদ্ধের ফলে ওই অঞ্চল ইরাকের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় এবং সেখানে ইসলামের প্রচার-প্রসারের সব বাধা দূরীভূত হয়। যুদ্ধের পর চার হাজার পারসিক সৈন্য সরাসরি ইসলাম গ্রহণ করে। এ ছাড়া বিভিন্ন গোত্র ও ইরাকে বসবাসরত ধর্মযাজক দলে দলে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাছ (রা.)-এর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেয়।

স্পেন বিজয়

সিপাহসালার তারেক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী ৯২ হিজরি সনের ২৮ রমজান সর্বপ্রথম রডারিকের সৈন্যকে পরাজিত করে স্পেন জয় করেন।

ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ

সুলতান সালাহউদ্দিন আইউবি (রহ.) ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সর্বশেষ যুদ্ধ শুরু করেন ১৩৯৩ সালের ১০ রমজান।

আইনে জালুতের যুদ্ধে বিজয়

৬৫৮ হিজরির ১৫ রমজান জুমাবার আইনে জালুত যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী তাতারিদের চিরতরে পরাজিত করে তাদের বলয় থেকে মুসলিম দেশগুলো মুক্ত করে।

ইহুদিদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিন রক্ষার যুদ্ধ

ফিলিস্তিনকে ইহুদিদের হাত থেকে পবিত্র করার জন্য সর্বশেষ যুদ্ধ হয় ১৩৯৩ হিজরির ১০ রমজান। ফিলিস্তিনি বীর যোদ্ধারা অস্ত্র ও জনবলের দৈন্য সত্ত্বেও ইহুদিদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। যদিও পরবর্তী সময় কিছু গাদ্দার ও দুনিয়ালোভী মুসলিম নেতার কারণে ইতিহাসের মোড় পাল্টে যায়। (আততারিখুস সিয়াসি লিদ্দাওলাতুল আরাবিয়্যা : ২/২০৪) এ ছাড়া আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এ রমজানে সংঘটিত হয়েছে।

 

লেখক : ফতোয়া গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার

Top