ঢাকা, ||

মাহে রমজানের তাৎপর্য ও উপকারিতা


ধর্ম ও জীবন

প্রকাশিত: ৯:২৪ অপরাহ্ণ, মে ২৭, ২০১৭

আব্দুল্লাহ আল নোমান

বরগুনা প্রতিনিধি

সাওম আরবি শব্দ। সাওম বা সিয়াম শব্দের আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা। শরীয়তের পরিভাষায় সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়ত সহকারে পানাহার এবং যৌনাচার থেকে বিরত থাকাকে সাওম বা রোজা বলা হয়। এ সম্বন্ধে কোরআনুল কারীমে এরশাদ রয়েছে, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিলো তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেজগারী অর্জন করতে পার” (সূরা আল-বাক্কারা-১৮৩)।

 
আলোচ্য আয়াতের মর্মার্থে জ্ঞাত হওয়া যায় যে, আদিকাল হতেই সাওম বা রোজা প্রচলিত ছিলো। তবে তার নিয়ম-নীতি ছিলো বিভিন্ন রকম। হযরত আদম (আঃ) হতে শুরু করে বিশ্বের সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) পর্যন্ত সব নবী-রাসূলগণই রোজা পালন করেছিলেন। হযরত মুসা (আঃ), হযরত ঈছা (আঃ) এবং তাঁদের উম্মতগণ সকলেই রোজা পালন করেছেন। যদিও ধরন ও প্রক্রিয়াগতভাবে তাদের ‘সাওম’ আমাদের থেকে কিছুটা ভিন্নতর ছিলো। আল্লামা ইমাদুদ্দীন ইবনে কাসীর (রহঃ) বলেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগে তিন দিন রোজার বিধান ছিলো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মদীনায় এসে দেখতে পেলেন, ইহুদীরা আশুরার দিন রোজা পালন করছে। হুজুর (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার তোমরা এদিনে রোজা পালন করো কেন? তারা বললো, এদিন অতি উত্তম। এদিনে আল্লাহতায়ালা বনী ইসরাইলকে শত্রুর কবল থেকে নাজাত দান করেছেন। তাই হযরত মুসা (আঃ) এদিনে রোজা পালন করেছেন। এ কথা শুনে রাসূলে খোদা (সাঃ) বললেন, আমি তোমাদের চেয়ে মুসা (আঃ)-এর অধিক নিকটবর্তী। অতঃপর তিনি এদিন রোজা পালন করেন এবং সহচরদেরও রোজা পালনের নির্দেশ দেন।

 
ইসলাম সাওমের ব্যাপারে অন্যান্য ধর্মের বিপরীতে বেশকিছু পরিবর্তন সাধন করেছে। যেমন ইহুদীদের দৃষ্টিতে রোজা ছিলো বেদনা ও শোকের প্রতীক। আবার কোনো কোনো ধর্মে একটানা চলি্লশ দিন পর্যন্ত খাদ্যগহণ নিষিদ্ধ ছিলো। কোনো কোনো ধর্মে গোস্ত জাতীয় খাদ্য বর্জনই রোজার জন্যে যথেষ্ট মনে করা হতো। এছাড়া যে কোনো প্রকার খাদ্য ও পানীয় গ্রহণের ব্যাপারেও কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিলো না। পক্ষান্তরে ইসলাম এসব মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি এবং প্রয়োজনাতিরিক্ত উদারতা সমর্থন করেনি। ইসলামের দৃষ্টিতে রোজা এমন এক সার্বজনীন ইবাদত যা রোজাদারকে দান করে সজীবতা, হৃদয়ের পবিত্রতা, চিন্তা ধারার বিশুদ্ধতা। এ পবিত রোজার মাধ্যমে বান্দা লাভ করে এক রুহানী তৃপ্তি, নূতন উদ্যমত্ত প্রেরণা। রোজার উপর আল্লাহতায়ালা যে পুরস্কার ঘোষণা করেছেন, তা এক মুহূর্তে মানুষকে করে তুলে ভোগে বিতৃষ্ণ, ত্যাগে উদ্বুদ্ধ এবং আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান। হাদিসে কুদসীতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এরশাদ করেছেন, ‘রোজা আমার জন্যে এবং আমি নিজেই এর পুরস্কার দান করবো’ অথবা ‘আমিই এর প্রতিদান’। ইসলামপূর্ব অন্যান্য ধর্মেও রোজা প্রচলন ছিলো সত্য। কিন্তু তাতেও কোনো কোনো ধর্মে রোজার ব্যাপারে বেশ স্বাধীনতা ছিলো। এ অবাধ স্বাধীনতা রোজার ভাবমূর্তি ও প্রাণশক্তি সম্পূর্ণরূপে শেষ করে দিয়েছিলো। চারিত্রিক মহত্ত্ব, নৈতিক পরিচ্ছন্নতা, চিন্তার বিশুদ্ধতা, আত্মিক পবিত্রতা এবং আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম রোজা কালক্রমে অন্তসারশূন্য নিছক এক অনুষ্ঠানে পর্যবসিত হয়ে পড়েছিলো। এরূপ নাজুক অবস্থা থেকে রোজাকে রহমত, বরকত, মাগফেরাতের দিকে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে এবং একে আত্মিক নৈতিক ও চারিত্রিক কল্যাণের ধারক বানানোর নিমিত্তে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন রোজাকে উম্মতের উপর ফরজ বা অবশ্য পালনীয় করেছেন। এ সম্বন্ধে আল্লাহ কোরআনুল কারীমে এরশাদ করেছেন, রমজানই হলো সে মাস যাতে নাজিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্যে হেদায়েত এবং সত্যপথযাত্রীদের জন্যে সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে সে এ মাসে রোজা রাখবে, আর যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে সে অন্য দিনে গণনা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্যে সহজ করতে চান, তোমাদের জন্যে জটিলতা কামনা করেন না। যাতে তোমরা গণনা করো এবং তোমাদের হেদায়েত দান করার দরুণ আল্লাহতায়ালার মহত্ব বর্ণনা করো। যাতে তোমার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো। (সূরা-বাকারা-১৮৫)

 
উপরোক্ত পবিত্র আয়াতটির মর্মার্থেই রোজার গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। মহান আল্লাহ্ রমজান মাসের রোজাকে মোমেনগণের উপর ফরজ অথবা অবশ্য পালনীয় করেছেন। নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজানের প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত রোজা রাখলো তার থেকে গুনাহগুলো অনুরূপভাবে ঝরে যায় যেনো সে সদ্য প্রসূত ভূমিষ্ঠ শিশু। অর্থাৎ নবজাতক শিশুর যেমন কোনো গুনাহ নেই, তদ্রুপ পবিত্র রমজানে সিয়াম পালনকারী ব্যক্তিরও কোনো গুনাহ থাকে না। বরং আল্লাহপাক তার পাপসমূহ মোচন করে দেন। অন্যত্র এরশাদ করেছেন, প্রত্যেক বস্তুরই যাকাত আছে, আর মানুষের শরীরের যাকাত হলো রোজা। অপর এক হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত আছে, আল্লাহতায়ালা বলেন, বান্দা কেবল আমার জন্যেই রোজা রাখে, আর রোজার প্রতিদান আমি নিজেই দেবো। অর্থাৎ এর পরিমাপ নির্ধারিত থাকবে না বরং আল্লাহতায়ালা মহা পুরস্কারে পুরস্কৃত করবেন। যার কোনো সীমা পরিসীমা থাকবে না।

 
নবী কারীম (সাঃ) এরশাদ করেছেন, রোজা হলো ধৈর্য্য বা ছবরের অর্ধেক আর ছবর হলো ঈমানের অর্ধেক। আরো বলেছেন, কোনো ব্যক্তি রোজাদারকে ইফতার করায় তবে সে রোজাদারের সমান সওয়াব পাবে এবং এতে রোজাদারের সওয়াব হতে সামান্য কিছুও কম হবে না। অন্য একটি হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি রমজান মাসে কোনো রোজাদার ব্যক্তিকে ইফতার করায় তবে সে ইফতার করানো তার গোনাহ মোচন ও জাহান্নাম হতে মুক্তির কারণ হবে।

 
মহান আল্লাহ এ পবিত্র মাসেই মহাপ্রজ্ঞাময় কোরআনুল কারীম নাজিল করেছেন। যা ন্যায়-অন্যায় ও সত্য-মিথ্যা পার্থক্যকারী। এ মহান মাসে শবে কদর নামে একটি রজনী রয়েছে যা সহস্র মাস অপেক্ষা উত্তম। এ রাতের ইবাদতে মহান আল্লাহ পাপী-তাপীকে সব রকম পাপ থেকে মুক্তি দেন। শবে কদর রাতের ফজিলত সম্বন্ধে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, বিশ্ব নবী (সাঃ) বলেছেন, শবে কদর আমার উম্মতকে দেয়া হয়েছে। অন্য কাউকে দেয়া হয়নি। কারণ পূর্বের উম্মতগণ বেশি আয়ু পাওয়ার কারণে বেশি বেশি ইবাদত করেছেন। আর উম্মতে মোহাম্মদী কম আয়ু পাওয়ার কারণে তা হতে বঞ্চিত হবে। তাই নবী করীম (সাঃ) মনক্ষুণ্ন হলেন। তখন আল্লাহতায়ালা উম্মতে মোহাম্মদীর জন্যে এ বরকতময় রজনী দান করলেন। যে রজনীতে ইবাদত করলে আটশ’ তেত্রিশ বছর চার মাসেরও বেশি সময় ইবাদত করার সওয়াব তার আমলনামায় লিপিবদ্ধ করা হবে। অন্য এক হাদিসে হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) বলেছেন, নবী করীম (সাঃ) এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কদর রাতে আল্লাহর উপর বিশ্বাস রেখে পুণ্যের আশায় ইবাদত বন্দেগীতে লিপ্ত থাকে, তার পূর্বে কৃত সমস্ত পাপ মোচন করে দেয়া হয়। অন্য একটি হাদিসে হজরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, হুজুর (সাঃ) এরশাদ করেছেন, তোমরা এমন মাস প্রাপ্ত হয়েছ যাতে এমন একটি রজনী রয়েছে, যা হাজার মাস হতেও উত্তম। যে ব্যক্তি এ পুণ্যময় রজনীতে বঞ্চিত রইলো সে যেন সকল মঙ্গল হতে বঞ্চিত হয়ে থাকে।

Top