ঢাকা, ||

মঙ্গলবার শুরু হচ্ছে চৌগাছার ঐতিহ্যবাহী পীর বলুহ দেওয়ান (রহ)মেলা


খুলনা

প্রকাশিত: ৮:২৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৭

আব্দুল্লাহ আল নোমান

বরগুনা প্রতিনিধি

মঙ্গলবার শুরু হচ্ছে চৌগাছার ঐতিহ্যবাহী পীর বলুহ দেওয়ান (রহ)মেলা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার

চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি: আজ মঙ্গলবার শুরু হচ্ছে যশোরের চৌগাছার ঐতিহ্যবাহী পীর বলুহ দেওয়ান (রহ) মেলা। মেলায় জননিরাপত্তায় নেয়া হয়েছে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মেলা ঘিরে এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ বছর মেলা পরিচালনা কমিটি, উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয়দের সহযোগিতায় পরিচালিত হবে। এজন্য নারায়ণপুর ইউপি চেয়ারম্যানকে সভাপতি এবং শিমুল হোসেনকে সাধারণ সম্পাদক করে ২১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে।

হাজরাখানা ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মনিরুজ্জামান মিলন বলেন, এবার মেলায় কাঠের আসবাবপত্র, খেলনা, প্রসাধনী, গার্মেন্টস, হোটেল-বেকারি, মিষ্টির দোকান, নাগরদোলা, যাদু প্রদর্শনী, সার্কাস, স্টিল সামগ্রীসহ প্রায় হাজারের অধিক দোকান বসেছে। এবারে মেলার বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে কপোতাক্ষ নদে স্পিডবোর্ড ও মৃত্যুকূপে প্রাইভেটকার চালানো। তিনি জানান আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ৪৭ সদস্য বিশিষ্ট স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া র‌্যাব, পুলিশ ও আনসার ভিডিপি আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে কাজ করবেন।

সূত্র জানায়, প্রতি বছর ভাদ্র মাসের শেষ মঙ্গলবার পীর বলুহ দেওয়ান (রহ.) এর রওজা শরীফকে ঘিরে যশোর জেলার সীমান্তর্তী চৌগাছা উপজেলার হাজরাখানা গ্রামে মধুকবি মধুসুদনের স্মৃতি বিজড়িত কপোতাক্ষ নদের তীরে বসে এই মেলা। হাজরাখানা গ্রামে কপোতাক্ষ নদের পাশে উঁচু ঢিবির ওপর এ অঞ্চলের পীরে কামেল বলুহ দেওয়ান (রহ.) এর রওজা শরীফ অবস্থিত। মেলার সময় এলে পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলিতে পড়ে যায় ব্যস্ততার ধুম। রেওয়াজ রয়েছে ঈদে-পূজায় না হলেও মেলায় মেয়ে-জামাই আনার।

যাকে ঘিরে এই মেলার তার সম্পর্কেও রয়েছে নানা মিথ। যা লোক মুখে প্রকাশ পায়। পীর বলুহ দেওয়ান (রহ) অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। লোক মুখে শোনা ‘তিনি যা বলতেন তাই হতো।’ তার জন্ম-মৃত্যুসহ জীবনের প্রতিটি মুহুর্র্ত ছিল রহস্যে ঘেরা। তিনি একই উপজেলার যাত্রাপুর গ্রামের ছুটি বিশ্বাসের ছেলে। তবে জন্মকাল সম্পর্কে আজও কোন সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। জেষ্ঠ ভক্তদের মতে ‘ তিনি ৩-৪ শ বছর আগে জন্মগ্রহণ করেন।’

তার সম্পর্কে মিথ প্রচলিত আছে, ‘যখন তাঁর বয়স ১০/১২ বছর তখন পিতার আদেশে গ্রামের পার্শ্ববর্তী মাঠে গরু চরাচ্ছিলেন। গরু দিয়ে ক্ষেত নষ্ট করার অভিযোগে ক্ষেত মালিক গরুগুলি ধরতে গেলে তিনি সব গরু বক বানিয়ে বটগাছে বসিয়ে রাখেন।’
পিতার মৃত্যুর পর তিনি উপজেলার হাজরাখানা গ্রামে মামার বাড়িতে থেকে অন্যের জমিতে দিনমজুর খাটতেন। একদিন শরিষা মাড়াই করতে মাঠে গিয়ে শরিষার গাঁদায় আগুন ধরিয়ে দেন। সংবাদ শুনে গৃহস্থ মাঠে গিয়ে দেখে শরিষার গাঁদায় আগুন জ্বলছে। তখন গৃহস্থ রাগান্বিত হলে তিনি হেঁসে ছাই উড়িয়ে দেখিয়েদেন শরিষা পোড়েনি।’

‘একদিন মামি খেঁজুর রসের চুলায় জ্বাল দিতে বললে তিনি জ্বালানির পরিবর্তে চুলায় পা ঢুকিয়ে আগুন জ্বাল দিতে থাকেন। এতে তাঁর পায়ের কোন ক্ষতি হয়নি।’
এমনি অনেক অলৌকিক ঘটনার জন্ম দিতে থাকলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহু মানুষ তাঁর নিকট এসে শিষ্যত্ব নেন। ‘অলৌকিক ঘটনার প্রেক্ষিতে বলুহ দেওয়ান পীর আখ্যা পান।’
তার মৃত্যুর পর গ্রামাঞ্চলের মানুষ জটিল ও কঠিন রোগ থেকে মুক্তি পেতে তাঁর নামে মানত করতে থাকে। এবং প্রতি বছর ভাদ্র মাসের শেষ মঙ্গলবার হাজরাখান গ্রামে অবস্থিত তাঁর রওজা শরীফে গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি, নারকেল ও টাকাসহ নানা দ্রব্যাদি ও টাকা দিয়ে মানত শোধ করতে থাকে। সেখান থেকেই একসময় এখানে আসা ভক্তদের নিত্ত প্রয়োজনীয় সামগ্রীর প্রয়োজনে গড়ে ওঠে পীর বলুহ দেওয়ান (রহ) মেলা। দীর্ঘদিন থেকে স্বল্প পরিসরে মেলা হতে থাকলেও বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে চলছে জমজমাট মেলা। প্রতি ভাদ্র মাসের শেষ মঙ্গলবার শুরু হয়।

এ বিষয়ে মেলা কমিটির সভাপতি ও নারায়ণপুর ইউপি জয়নাল আবেদীন মুকুল বলেন প্রতিবার মেলা হয় সাতদিন। এবার চলবে ১০ দিন (১২ সেপ্টেম্বর থেকে ২২ সেপ্টেম্বর)।
একসময় মেলায় বিশৃঙ্খলা ছিল নিয়মিত বিষয়। ২০০২ সালে মেলায় ব্যাপক বোমাবাজি করে তৎকালীন বিএনপি নেতাদের আশ্রিত সন্ত্রাসীরা। সেসময় মেলায় কয়েকজন দোকানী ও দর্শনার্থী হতাহত হয়। অন্যদিকে ২০০৯ সালে মেলাচলাকালীন চৌগাছা শহরে আওয়ামীলীগের অফিসে সন্ত্রাসীদের বোমা হামলা ও গুলিতে খুন হন উপজেলা আওয়ামীলীগের সেসময়ের সাংগঠনিক সম্পাদক ইমামুল হাসান টুটুল। পরে প্রশাসনিক ভাবে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়ায় সে পরিবেশ পাল্টে গেছে। মেলায় সারা দেশ থেকে ছোট-বড় বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা আসেন ব্যবসা করতে। এ অঞ্চলের যশোর-ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা ও সাতক্ষীরা জেলার ২০/৩০ টি উপজেলার মানুষ আসেন মেলা দেখতে এবং মেলা থেকে আসবাবপত্র সহ বিভিন্ন সামগ্রী ক্রয় করতে। আয়াতন ও পরিধিতে এটি সাতক্ষীরার গুড়পুকুরিয়ার মেলা থেকেও বৃহৎ।

এবারে মেলা উপলক্ষে নেয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা। মোতায়েন করা হয়েছে পুলিশ, র‌্যাব ও আনছার বাহিনীর সদস্যদের। এছাড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৪৭ সদস্যের একটি সেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করা হয়েছে। তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করবেন।
চৌগাছা থানার ওসি খন্দকার শামীম উদ্দিন জানিয়েছেন, ‘মেলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সকল প্রকার ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে।’
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার নার্গিস পারভীন জানিয়েছেন, ‘মেলা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। মেলায় যেন কোন প্রকার অপ্রীতিকর পরিবেশ তৈরি না হয় সে ব্যাপারে কঠোর দৃষ্টি রাখা হচ্ছে।’

Top