ঢাকা, ||

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে সবাই


ক্যাম্পাস

প্রকাশিত: ১০:৫২ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৬, ২০১৭

দীন মোহাম্মাদ দীনু

বাকেরগঞ্জ প্রতিনিধি

শুরুটা করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানরা। পরে উপাচার্য বিরোধী আন্দোলনের গতি বাড়াল মুক্তিযোদ্ধারা। শেষমেষ সুশীল সমাজের অংশগ্রহণে আন্দোলন বেগবান হল। বরিশাল নগরীর প্রাণকেন্দ্র সদর রোডের সেই আন্দোলন গিয়ে ঠেকলো ক্যাম্পাসে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উপাচার্যের অপসারণ চেয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। শিক্ষক, কর্মকর্তা আর কর্মচারীরাও আন্দোলনে একাত্বতা প্রকাশ করেছেন। শুধু একাত্বতা প্রকাশই নয়, তারা শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনের সমর্থনে বক্তব্যও দিয়েছেন। উপাচার্য বিরোধী আন্দোলনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে অচলাবস্থার সৃষ্ঠি হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের জন্য সংরক্ষিত কোটা না রাখা ও নিয়োগে দুনীতির অভিযোগ এনে উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে লাগাতার কর্মসূচি পালন করছে সুশীল সমাজ। সেই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন রাজনৈতিক নেতারা। তবে হঠাৎ করেই ববি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম ইমামুল হকের অপসারণ দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। উপাচার্যকে অপসারণের নেপথ্যে অন্তত ২২টি যৌক্তিক দাবির কথা শিক্ষার্থীরা উল্লেখ করেছেন। সেই যৌক্তিক দাবির প্রতি শিক্ষক, কর্মকর্তা আর কর্মচারীদের সংগঠন একাত্বতা প্রকাশ করে আজ বুধবার কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীর ৩৯টি পদে নিয়োগের জন্য চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারী একটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ষ্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, ‘সকল প্রার্থীকে প্রাথমিক বাছাইয়ের জন্য লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে। ’ অথচ অযোগ্যদের নিয়োগ দেওয়ার জন্য উপ-রেজিস্ট্রার ও উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে শুধুমাত্র মৌখিক পরীক্ষার আয়োজন করা হয়।

তাছাড়া সরকারী/ সায়ত্বশাষিত সকল প্রতিষ্ঠানের নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারী প্রজ্ঞাপনে রয়েছে যে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান/নাতি-নাতনির কোটা হিসাবে ৩০ শতাংশ পদ সংরক্ষণ করতে হবে। ওই সকল পদে আবেদনের বয়সসীমাও ৩২ বছর থাকবে। কিন্তু বিজ্ঞপ্তিতে কোটার বিষয়টি উল্লেখ নেই। এ নিয়ে গত ৯ জুলাই কালের কণ্ঠের  শেষ পৃষ্ঠায় ‘বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ; পরীক্ষা না নিয়ে বাছাই, প্রার্থী অযোগ্যরাও!’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশিত হয়। উপ-রেজিস্ট্রার ও উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে মৌখিক পরীক্ষার আগে ৩০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়।

ওই ঘটনার পর বরিশালের মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানরা সংরক্ষিত কোটার দাবিতে আন্দোলনের ডাক দেয়। উপাচার্যকে দুর্নীতিবাজ অবহিত করে নিয়োগ বাতিলের পাশাপাশি তার অপসারণ দাবি করেন। তাদের আন্দোলনের সাথে একাত্বতা প্রকাশ করেন মুক্তিযোদ্ধারা। তারাও উপাচার্যকে স্বাধীনতা পক্ষের শক্র বলে মন্তব্য করে তার অপসারণ দাবি করেন। এক পর্যায়ে রাজনৈতিক সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাও আন্দোলনে মাঠে নামেন। পাশে দাড়ান সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরাও। কয়েক দিন ধরেই উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা বলছেন, আমাদের এখন এক দফা, এক দাবি উপাচার্যের অপসারণ। আর এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীরা চাচ্ছেন। শুধু শিক্ষার্থী নন, শিক্ষক এমনকি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও উপাচার্যের অপসারণ চাচ্ছেন। কিন্তু তারা প্রকাশ্যে উপাচার্যের বিরুদ্ধে কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারছেন না। তারা মৌনভাবে সমর্থন দিচ্ছেন। এমনকি তারা উপাচার্যের পক্ষে আমাদের বিরুদ্ধে আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশ নেননি।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, সেমিস্টার ফি তিন হাজার ৫০০ টাকা। তবে তা সঠিক সময়ে দিতে না পারলে জরিমানা নির্ধারণ করে দিয়েছেন উপাচার্য। আর ওই জরিমানা প্রথম ১০ দিন ১০ টাকা করে। এরপরের প্রত্যেক দিনের জন্য ২০ টাকা করে নেওয়া হয়। তাতে এক সেমিস্টারের ফি এর সাথে প্রায় সমপরিমাণ বর্ধিত টাকা দিতে হয় অনেক শিক্ষার্থীকে। সম্প্রতি, মার্কশীট, মানোন্নয়ন পরীক্ষাসহ সকল ফী অসম্ভব হারে বাড়ানো হয়েছে। মার্কশীটে ১০০ টাকা নেওয়া হতো। কিন্তু এখন নেওয়া হচ্ছে ৫০০ টাকা।

তারা আরো বলেন, বিভাগ উন্নয়ন ফি দুই হাজার ৫০০ টাকা ছিল। যা ৪ বছরের (৮ সেমিস্টার) টাকা একবারে দেওয়া হত। সেখানেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন প্রতি সেমিষ্টারে ৫০০ টাকা করে একজন ছাত্রকে ৪ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কীর্তনখোলা অডিটরিয়াম ব্যহারের জন্য শিক্ষার্থীদেরকে প্রতিদিন দুই হাজার টাকা করে ভাড়া গুনতে হয়। তাই শিক্ষার্থীরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে বঞ্চিত। এমনকি মুক্তমঞ্চ ব্যবহার করলে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া হয়।

শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ২২টি যৌক্তিক দাবি আদায়ের আন্দলনে নেমেছে শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবির প্রতি একাত্বতা প্রকাশ করে সমিতির সভাপতি এম এ কাইউম আন্দোলনে বক্তব্য দিয়েছেন। শিক্ষকদের দাবি, সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংরক্ষণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। এ কারণে স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের উদ্বিগ্নতাকে যথাযথ সন্মান প্রদর্শন করছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জাতীর শ্রেষ্ঠ সন্তানদের সঠিকভাবে মূল্যায়নের জোর দাবি জানিয়েছে সমিতি।

এ প্রসঙ্গে অফিসার্স এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাহী প্রকৌশলী মুরশিদ আবেদিন কালের কণ্ঠকে বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো পর্যালোচনা করেছি। তাদের দাবিগুলো যৌক্তিক। তাই দাবির প্রতি একান্ততা প্রকাশ করেছি। শ্রেণি সংকটের পাশাপাশি তাদের অনেক সংকট রয়েছে। সেই সংকটের কারণে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে।

গত রবিবার পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ফজলুল হক মুঠোফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, অমি এ ব্ষিয়ে কিছু বলতে পারব না। উপাচার্য মহোদয়ের নিষেধ আছে। সবকিছু বিষয়ে কথা বলবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা।

এ প্রসঙ্গে জনসংযোগ কর্মকর্তা ফয়সাল আহমেদ রুমি বলেন, পরীক্ষা দপ্তরের কোন তথ্যই আমার কাছে নেই।

এ বিষয়ে রেজিস্ট্রার মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক উদ্ভুত পরিস্থিতির বিষয় আলোচনার জন্য সোমবার সন্ধ্যায় সিন্ডিকেটের জরুরী সভা হয়েছে। শিক্ষা ও প্রশাসনের সুষ্ঠু পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ায় সভা থেকে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করা হয়। সিন্ডিকেট এই অবস্থার নিরসনকল্পে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ঠ সকল মহলকে সহনশীল ও সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানায়।

এ ব্যাপারে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম ইমামুল হক মুঠোফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, শিক্ষার্থীদের নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত করতেই সেমিস্টার ফি সঠিক সময়ে পরিশোধ না করলে জরিমানার বিষয়টি অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে।

বিভাগ উন্নয়ন ফি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের আর্থিক চাপ কমাতে প্রতি সেমিস্টারে বিভাগ উন্নয়ন ফি দুই হাজার ৫০০ টাকার বিপরীতে চার হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। নম্বরপত্রসহ আনুষাঙ্গিক বিষয়ে বর্ধিত ফি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে নেওয়া হচ্ছে।

ছাত্রলীগের অনৈতিক দাবি মেনে না নেবার কারণেই তারা অপসারণ চাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

Top