ঢাকা, ||

বন্ধুপ্রতীম প্রতিবেশী করুনায় ভাসছি মোরা


মতামত

প্রকাশিত: ১০:১৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৯, ২০১৬

আব্দুল্লাহ আল নোমান

বরগুনা প্রতিনিধি

গত পক্ষকালের মধ্যে দেশের কোথাও ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে ? যদি বেঁহুশে না থাকি, তবে উত্তর হবে-না। তবে প্রশ্ন, ভারী বৃষ্টিপাত যদি নাই হয় তবে দেশের উত্তরাঞ্চলের ডজন দু’য়েক জেলা প্লাবিত হলো কিসের জলে ? কেন সেখানে বসবাসরত লাখো মানুষ পানির ওপরে ভেলায় ভেসে দিনাতিপাত করছে ? তাদের কাছে রান্না করার জন্য চাল থাকার সত্ত্বেও কেন তারা রান্না করার সক্ষমতা হারিয়েছে ? কেন লাখো লাখো মানুষ খ্যাদ্যাভাবে ভূগছে ? পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে তারা কেন মৃত্যুর মুখে পাড়ি জমাচ্ছে ? চিকিৎসা গ্রহনের জন্য চিকিৎসালয়ে পৌঁছানোর পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের ব্যবস্থাটুকু হারিয়ে কেন তাদের জীবন এমন অনিশ্চয়তায় ? সহায়-সম্বল যেটুকু ছিলো তা হারানোর হেতু কি ?
যদি কারনের কারন জানতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন তবে বলতে হচ্ছে, এ আমাদের বন্ধুপ্রতীম প্রতিবেশীর থেকে আমাদের প্রতি করুনার দান-কতটুকু জল ! তারা হয়ত জেদ করেই বলছে, সারা বছর জল জল বলে চিল্লাস ! নে এবার ! জনমের মত জল খেয়ে-ডুবে-নেয়ে মর। যখন আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র ভারতের কাছে করুণার বশে নয় বরং আমাদের ন্যায্য দাবীর পানির হিস্যাটুকু বুঝে পেতে চেয়েছিলো, তখন তাদের অনৈতিকতায় ভরা আচরণ এবং আস্ফালনে আমরা খুব অসহায় বোধ করেছিলাম। আমরা তাদের কাছে পানি ভিক্ষা চাইনি বরং নৈতিকতা প্রশ্ন এবং আন্তর্জাতিক আইন, সর্বোপরি বন্ধুসূলভ প্রতিবেশীত্বের দাবিতে আমরা আমাদের পাওনাটুকু চেয়েছিলাম। পাওনা পরিশোধের পথে তো তারা হাঁটেই-নি বরং কিভাবে বাংলাদেশকে মরুভূমিতে পরিণত করে সর্বতভাবে সূজলা-সূফলা, শস্য-শ্যামলা আমাদের সোনার দেশকে ভারতমুখী করা যায় তার সবটুকু প্রয়াস তারা চালিয়েছে। একের পর এক ষড়যন্ত্র করেছে। আন্তঃনদী সংযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের নদীনালা থেকে পানি প্রত্যাহার করেছে। বিভিন্ন নদীতে ড্রেজিং পর্যন্ত করতে দেয়নি বরং একের পর এক অযৌক্তিক শর্তারোপ করেছে। চরম বন্ধুত্বের(!) এমন প্রকাশ ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দেখিয়েছে যে, তারা সীমান্তের এক ইঞ্চি ভূমিও কাঁটা তার শুণ্য রাখেনি। মুখে মুখে বন্ধুত্বের ধ্বনি তুলে শুষ্ক মওসুমে পানি প্রত্যাহার ও বর্ষামওসুমে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে বাংলাদেশকে প্লাবিত করে দেয়ার নীতিতে ভারত বিশ্বাসী হয়ে উঠছে। আমাদের দেশের সন্ত্রাস বিষয়ক সমস্যা সমাধানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী বাবু যখন আমাদের সাথে আছেন বলে ঘোষণা এসেছে, তখন কিভাবে আমরা ভূখা থাকতে বাধ্য হবো-তার সকল পরিকল্পনার ছঁক তারা পূর্বে কষেই এখন তার নির্লজ্জ বাস্তবায়ণ ঘটাচ্ছে।
তিস্তার পানি চেয়ে এ দেশের মানুষ যত আন্দোলন করেছে, সে আন্দোলনের সংবাদ দেশবাসীকে জানানোর জন্য যতগুলো পৃষ্ঠা নষ্ট হয়েছে এবং বিদ্যুত জ¦ালিয়ে, সলতে পুড়িয়ে যত আলাপ-আলোচনা হয়েছে তার সবটাই যে ফলশুণ্য হয়েছে-তা এখন স্পষ্ট। বাস্তবিক অর্থে আমরা ভারতের গোলামির জিঞ্জির বোধ-অঙ্গে বেঁধে নিয়েছি-হোক সে জ্ঞাতে কিংবা অজ্ঞাতে। বিশ্বের কোথাও এমন কোন বন্ধুপ্রতীম দাবীদার রাষ্ট্রের সন্ধান পাওয়া যাবে না, যেখানে দু’টি সীমান্তবর্তী রাষ্ট্র একটির ওপর অপরটি এমন আগ্রাসন চালায়, যতটা চালাচ্ছে ভারত বাংলাদেশের ওপর। আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা মানসিকভাবে দুর্বল। যদি তাই না হত, ভারতের এমন অন্যায় সিদ্ধান্তের পরেও আমাদের চুপ থাকাটা অনেকটা কাকতালীয় উপলক্ষণ। আমরা আমাদের জাতীয় স্বার্থ বিষয়েও রাজনীতির মেরুকরন বিবেচনা করে কথা বলতে শিখে গেছি। জাতীয় র্স্বার্থ আজ চরমভাবে উপেক্ষিত। দলীয় এবং ব্যক্তি স্বার্থ চরমভাবে মাথাচাড়া দিয়েছে। খরায় যারা আমাদের জরা বানাবে আর বর্ষায় আরও স্নাত করবে-তাদের সাথে এমন বন্ধুত্ব রাখার কোন অর্থ নাই। এমন বন্ধুত্বের সাথে চরম শত্রুতার পার্থক্য কি ? যারা বন্ধুর দাবীদার হয়ে ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করে তারা কোনভাবেই মানুষের, মানবতার বন্ধু হতে পারেনা। উত্তরাঞ্চলের ভাসমান মানুষগুলোর আহাজারি-অসহায়ত্ব দেখে যদি বাংলাদেশীদের শিক্ষা না হয়, তবে এদের আর শিক্ষা হবে কিসে-তা অন্তত আমার জানা নাই। আমরা চাই, বন্ধুত্ব বেঁচে থাকুক কিন্তু এমন এক চেটিয়াভাবে বন্ধুত্ব বাঁচিয়ে রাখার সাধ্য কার ? এমন বন্ধুত্ব রক্ষার দায় হয়ত ঈশ্বরেরও নাই; আবার থাকতেও পারেন। আমরা তো সৃষ্টার সৃষ্টি অতি নগণ্য মানুষ নাম্নী জীব। আমাদের বহুমাত্রিক দূর্ণাম আছে। হয়ত সে দূর্ণামের সাথে বন্ধুত্ব বিনষ্টের আরেকটি অপবাদ যোগ হবে। বন্ধুত্বের ব্যানার ব্যবহার করে যারা কেবল নিতেই জানে তাদের সাথে বন্ধুত্ব রাখা আর খাল কেটে কুমির আনার মধ্যে বোধহয় খুব বেশি পার্থ্যক নেই। মানুষ যেনো তাদের অধিকারটুকু বুঝতে পারার বোধ অর্জন করে-শুধু সেই কামনায়।

Top