ঢাকা, ||

‘বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর কুকুর-বিড়ালের মত বেঁচে ছিলাম’


বরিশাল

প্রকাশিত: ৭:৫১ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৪, ২০১৭

আব্দুল্লাহ আল নোমান

বরগুনা প্রতিনিধি

১৫ আগস্টের নারকীয় হত্যার স্মৃতিচারণ করেছেন শহীদ জননী শাহনারা আব্দুল্লাহ। শোক দিবস উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের তিন দিনব্যাপী আয়োজনের প্রথম দিনে সন্ধ্যায় বরিশাল নগরের অশ্বিনী কুমার হলে আয়োজিত আলোচনা সভায় এ স্মৃতিচারণ করেন তিনি।

স্মৃতিচারণে শাহানারা আব্দুল্লাহ্ বলেন, ঢাকার ২৭নং মিন্টো রোডে আমার শ্বশুর তৎকালীন পানিসম্পদ মন্ত্রী আব্দুর রব সেনয়িাবাতের বাসায় ফজরের আজান পরপরেই গুলির শব্দে ঘুম ভাঙে আমার। তখন আবহাওয়াটা ছিল আলো এবং অন্ধকারের মিশ্রন। আমি দ্রুত উঠে আমার শ্বশুর কৃষক নেতা আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের রুমে যাই। তখন আমি মনি ভাইকে (১৫ আগস্টে নিহত শেখ ফজলুল হক মনি) ফোন করে গুলি করার শব্দের কথা বলি। এর মধ্যে আমার শাশুড়ি (বঙ্গবন্ধুর ছোট বোন আমেনা বেগম) আমার কাছ থেকে ফোন নিয়ে মনি ভাইকে আমাদের বাঁচানোর কথা বলে। সেসময় আমাদের সাথে বরিশালের একটি গানের দলও ছিল। তারা আমার শ্বশুরকে জিজ্ঞাসা করে তাদের কি হবে। তখন আমার শ্বশুর তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, আমার যা হবে- তোমাদেরও তাই হবে। এর মধ্যে আমাদের বাড়ির একটি কাঠের দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে আর্মিরা। রুমের মধ্যে ঢুকে সবাইকে ‘হ্যান্ড সাফ’ বলার সাথেই সাথেই আমরা হাত উপরে তুলে নেই। তারা সিঁড়ি দিয়ে আমাদের নিচে নামিয়ে আনে। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার শিশু সন্তান সুকান্ত বাবু বলছিল ‘মা আমাকে কোলে নাও’। আমি সুকান্তকে কোলে নিতে পারিনি। পরে শহীদ ভাই (১৫ আগস্টে নিহত শহীদ সেরনিয়াবাত) সুকান্তকে কোলে নিয়ে নিচে নামে। আর্মিরা আমাদের জিজ্ঞাসা করেন উপরে কেউ আছেন কিনা, তখন আমার শ্বশুরের ঈশারায় আমি না বলি। কারণ তখন উপরে আমার স্বামী আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ ছিল। আর্মিদের জিজ্ঞাসা করা হয় তাদের কমান্ডিং অফিসার কে? তারা জানায়, তারা নিজেরাই কমান্ডিং অফিসার। এর মধ্যেই আর্মিরা ব্রাশ ফায়ার শুরু করে। আমার শ্বশুরের বুকে একটা গুলি লেগেছিল, আমার পিঠে এবং শহীদ ভাইও গুলিবিদ্ধ হয়। আমার ছেলে সুকান্ত বাবুর সেখানেই মৃত্যু হয় তাদের সাথেই। আমার পিঠে গুলি লাগার সাথে সাথেই আমার দশ মাস বয়সী সন্তান সাদিককে আমি কোলের মধ্যে নিয়ে জড়িয়ে রাখি। এর মধ্যে রমনা থানার ওসি আমাদের বাসায় আসে। উপর থেকে নেমে আসে আমার স্বামী আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ্ সাহেবও। তিনি দেখতে পেয়ে পুলিশের সহায়তায় একটা জিপে করে আমাদের ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই ভর্তি করা হয় আমাদের। জিপ থেকে আমাদের নামানোর কিছুক্ষণ পরেই দেখি অপর একটি জিপ থেকে মনি ভাইয়ের নিথর দেহ নামানো হচ্ছে, আরজু মনিকে জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয় তখন। আমার শাশুড়ি বলার পর বুঝেছি আর কেউ বেঁচে নেই। ভেবেছিলাম, এ হত্যকাণ্ডের বিচার করবেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু ওরা বঙ্গবন্ধুকেও হত্যা করেছিল। এরপর আড়াই মাস পুলিশ হেফাজতে হাসপাতালে থাকতে হয় আমাদের। এছাড়া দীর্ঘদিন দেখা হয়নি আমার স্বামীর সাথেও।

শাহানারা আব্দুল্লাহ্ বলেন, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর আমরা কুকুর-বিড়ালের মত বেঁচে ছিলাম। আমার একটাই দুঃখ। বঙ্গবন্ধু যখন জেলে ছিলেন, তখন পাকিস্তানিরা চারবার তার জন্য কবর প্রস্তুত করলেও তাকে কেউ আঘাত করার সাহস পায়নি। কিন্তু আমাদের দেশের বাঙিালিরাই বঙ্গবন্ধুকে শেষ পর্যন্ত হত্যা করল। এখনো হত্যাকারীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে এ দেশের মাটিতে।

শোক দিবস উপলক্ষে এ আলোচনা সভায় মুখ্য আলোচক ছিলেন, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি তারানা হালিম।

-ঢাকাটাইমস

Top