ঢাকা, ||

প্রধান বিচারপতিকে সরে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী- মির্জা ফখরুল


ঢাকা

প্রকাশিত: ১১:৫৭ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২২, ২০১৭

দীন মোহাম্মাদ দীনু

বাকেরগঞ্জ প্রতিনিধি

অপছন্দের রায়ের কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে প্রধান বিচারপতিকে সরে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এটা বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে জনগণকে উসকে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

আজ মঙ্গলবার রাতে গুলশানের বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর এই দায়িত্বজ্ঞানহীনতা দেশের পরিস্থিতিকে আরও নৈরাজ্য করে তুলতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।’

গতকাল সোমবার রাজধানীতে আওয়ামী লীগের এক আলোচনা সভায় প্রধান বিচারপতিকে লক্ষ্যে করে প্রধানমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার প্রতিক্রিয়া জানাতে এ সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি। এ সময় দলের স্থানীয় কমিটির সদস্য খন্দকার দেলোয়ার হোসেন, মওদুদ আহমদ, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান ও মির্জা আব্বাস উপস্থিত ছিলেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় সভায় দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট, বিচার বিভাগ, এমনকি প্রধান বিচারপতিকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে আমরা বিচলিত এবং হতবাক হয়েছি। আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লাখ করছি, তাঁত বাক-সন্ত্রাস থেকে কোনো দায়িত্বশীল সম্মানিত নাগরিক, এমনকি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো রেহাই পাচ্ছে না।’

বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘সংবিধানের বিতর্কিত ষোড়শ সংশোধনী বাতিলে করে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া যুগান্তকারী রায়ের কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর দলের নেতা এবং মন্ত্রীরা উচ্চ আদালত, বিচার বিভাগ, সম্মানিত বিচারপতি এবং প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত বিষোদ্গার করে বক্তব্য দেওয়া শুরু করেছেন। বর্তমান ক্ষমতাসীনেরা রায়ের কারণে বিচার বিভাগকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে যে পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন, তা দেশ, জাতি ও রাজনীতির জন্য এক অশনিসংকেত বলে আমরা মনে করি।’

মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সংসদ ও সরকার জনগণের ভোটের নির্বাচিত নয় বলে তারা জনগণের সত্যিকারের প্রতিনিধিত্ব করে না। তবু যেভাবে হোক শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদে আছেন। এমন একটি দায়িত্বশীল পদে থেকে তিনি যেভাবে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রকাশ্যে পারস্পরিক সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, তা আগুন নিয়ে খেলার শামিল। ক্ষমতায় থেকে বিচার বিভাগ ও দেশের সর্বোচ্চ আদালতকে এভাবে হেয় করার পরিণাম কখনো শুভ হয় না।

মির্জা ফখরুল ইসলাম তাঁর দলের পক্ষ থেকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বাতন্ত্র্য ও মর্যাদার প্রতি দৃঢ় অবস্থা ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে আত্মঘাতী পথ থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।

বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়ই আমাদের আদালতের রায় মেনে চলার পরামর্শ দেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের রাজনৈতিক রঙে রঞ্জিত কিছু রায়ে শুধু বিএনপি নয়, দেশ ও জনগণও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা সরকারে থাকার সময়েও কিছু রায় বিএনপির রাজনীতি ও আদর্শকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবু আমরা বিচারক ও কোর্টের বিরুদ্ধে এমন আক্রমণাত্মক ভূমিকা নিইনি। কিন্তু আওয়ামী লীগ রায় পছন্দ না হলে বিচারকদের বিরুদ্ধে লাঠিমিছিল করেছে, সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণের বস্তি বসিয়েছে, প্রধান বিচারপতির এজলাস ভাঙচুর করেছে। এবার তারা প্রধান বিচারপতিসহ পুরো উচ্চ আদালতকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। বিচার বিভাগের ব্যাপারে তাদের নীতি হচ্ছে বিচার মানি তালগাছ আমার।’

এক প্রশ্নের জবাবে খন্দকার দেলোয়ার হোসেন বলেন, বিচার বিভাগের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগকে মুখোমুখি করে দেওয়া, ৪৬ বছর বয়সে বাংলাদেশ কখনো এ রকম পরিস্থিতিতে পড়েনি। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সংক্ষুব্ধ হলে রিভিউর আবেদনের সুযোগ আছে। এটা না করে সরকার ও তাদের মন্ত্রীরা রাজনীতিকরণের পদক্ষেপ নিচ্ছে। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে বিচার বিভাগকে খুব কঠোরভাবে মুখোমুখি করে দিয়েছে। এ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের নেই।

ক্ষমতাসীনদের এ আচরণ আদালত অবমাননার শামিল কি না, সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, নিশ্চয়ই, নিঃসন্দেহে আদালত অবমাননার শামিল। আর দলের জ্যেষ্ঠ নেতা মওদুদ আহমদ বলেন, ‘আমাদের সুপ্রিম কোর্ট তো বলেছেন, তারা অনেক ধৈর্য দেখিয়েছেন। আমার মনে হয়, এটা খুব ম্যাচিউরড কমেন্ট। কারণ তারা যদি চাইতেন, এদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা হতো, সুয়োমোটো হতো।’

প্রধান বিচারপতির দেওয়া পাকিস্তানের উদাহরণে বিএনপি কীভাবে দেখছে—প্রশ্নের জবাবে মওদুদ আহমদ বলেন, ‘আমরা তো একসময় পাকিস্তানের সঙ্গে ছিলাম। যাদের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ করতে হয়েছে। ফলে পাকিস্তানের প্রতি আমাদের ভালোবাসা থাকার কথা নয়। প্রধান বিচারপতি রেফারেন্স হিসেবে বলেছেন যে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট একটি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে সরিয়ে দিয়েছেন এবং পাকিস্তান মুসলিম লিগ ইচ্ছা করলে রায়ের বিরুদ্ধে মিছিল-সভা করতে পারতেন, কিন্তু করেনি। তারা রায় মেনে নিয়েছেন।’ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও (নেওয়াজ শরিফ) বলেছেন, ‘তিনি সুবিচার পাননি, কিন্তু রায় মেনে নিয়েছেন। এই যে স্পিরিট, সেটার কথাই আমাদের প্রধান বিচারপতি বলেছেন। সুতরাং এখানে পাকিস্তানের প্রতি ভালোবাসা থাকার তুলনা করার কোনো অবকাশ নেই।’প্রথম আলো

Top