ঢাকা, ||

প্রথমবার স্বামীর নাম ধরে ডাকলেন ভারতের নারী


এক্সক্লুসিভ

প্রকাশিত: ১০:৩৭ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৮, ২০১৭

দীন মোহাম্মাদ দীনু

বাকেরগঞ্জ প্রতিনিধি

ভারতের নারী অধিকারকর্মীরা গ্রামের মহিলাদের বুঝাচ্ছেন যেন তারা পুরনো অভ্যাস ছেড়ে স্বামীর নাম ধরেই ডাকেন। ভারতের লাখ লাখ বিবাহিত নারী কখনোই তাদের স্বামীর নাম মুখে উচ্চারণ করেননি- স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর উদ্দেশ্যেই এমনটি করেন তারা। কারণ স্বামীর নাম মুখে উচ্চারণ না করা তার প্রতি একরকম শ্রদ্ধা প্রকাশের শামিল মনে করা হয়। যুগ যুগ ধরে গ্রামাঞ্চলে এমন প্রথা কঠিনভাবে মেনে চলা হচ্ছে। কিন্তু এখন নারী অধিকারকর্মীরা গ্রামের এসব মহিলাকে বুঝাচ্ছেন যেন তারা পুরনো অভ্যাস ছেড়ে স্বামীর নাম ধরেই ডাকেন। বিবিসি’র গীতা পাণ্ডে ভারতের কয়েকটি গ্রাম ঘুরে এ নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। যদি প্রশ্ন করা হয় একটা বিশেষ নামের মধ্যে কী এমন আছে? ‘অনেক কিছু’ ভারতীয় বেশির ভাগ বিবাহিত নারীর উত্তর হবে এমন। তবে এই ‘অনেক কিছু’র পরিষ্কার ব্যাখ্যা তারা দিতে পারেন না। কারণ ছোটবেলা থেকে এমনটা শিখে এসেছেন তারা- ‘আমার বাবা-মায়ের ৭৩ বছরের বৈবাহিক জীবন। গত বছর বাবা মারা গেলেন। মায়ের বয়স যখন ১১ বছর তখন তাদের বিয়ে হয়। সে সময় বাবার বয়স ছিল ১৫ বছর। প্রথমে তারা উত্তর প্রদেশের একটি ছোট গ্রামে বাস করতেন। এরপর তারা কলকাতায় থাকতে শুরু করেন। যুগের পর যুগ একসঙ্গে বাস করলেও মা কখনো বাবাকে নাম ধরে ডাকেননি।

আমাদের সঙ্গে কথা বলার সময় মা বলতেন ‘তোমাদের বাবুজি’। আর সরাসরি ডাকতে হলে ‘এই শুনছো বা এই শুনো’ এমনটা বলতো মা। আমরা যখন কৈশোরে পা দিলাম মায়ের এমন আচরণে হাসতাম। মজা করতাম। বাবাকে নাম ধরে ডাকানোর অনেক চেষ্টা করলেও মা কখনো স্বামীর নাম মুখে আনেননি। মা ছাড়াও আমাদের আশপাশে যত বিবাহিত নারী ছিলেন কাউকেই স্বামীর নাম ধরে ডাকতে শুনিনি’। এমনটাই আসলে সারা ভারতের অবস্থা, দেশটির অন্তত দশ লাখ নারী ধর্মীয় বা সামাজিক কারণে নিজের স্বামীর নাম ধরে ডাকেন না। ভারতীয় সমাজে স্বামীর নাম মুখে আনা বা নাম ধরে ডাকা নিষেধ। প্রথা আছে এমনটা করলে স্বামীর অমঙ্গল হয় বা স্বামীর আয়ুু কমে যায়। এখন যে সমাজে স্বামীকে ঈশ্বরের আসনে বসানো হয়েছে সেখানে নাম ধরে ডাকাতো রীতিমতো অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। আর এ কারণে তারা স্বামীর নাম ধরে কখনো ডাকে না।

তাহলে কিভাবে ডাকে? ইংরেজিতে অনেকটা ‘হেই ইউ’ আর বাংলায় ‘এই শুনছো?’ তবে ভারতের শহুরে জীবনে এর প্রভাবটা অনেক কম। এই প্রথা মেনে চলার বিষয়টা গ্রামের দিকটাতে বেশ কড়াকড়ি। ভিডিও ভলেন্টিয়ার্স নামে একটি ক্যাম্পেইন গ্রুপ এখন ভারতের বিভিন্ন গ্রামের মধ্যে প্রচারণা শুরু করেছে যে, এই পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব ভাঙতে হবে। ওড়িশার মেয়ে মালতি মাহাতু তার জীবনের একটি ঘটনা বলছিলেন এই গ্রুপটিকে। তার জবানিতে- ‘একদিন ঘটনাক্রমে স্বামীর নাম ধরে ডেকেছিলাম। আমার ননদ জিজ্ঞেস করেছিল বাইরে কে কে বসে আছে। বাইরে আমার স্বামীসহ যত পুরুষ মানুষ ছিল সবার নাম ধরে বলেছিলাম তাকে’।

এরপর ননদ গ্রাম্য পরিষদের কাছে মালতির বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। গ্রাম্য সালিশ বসে এবং স্বামীর নাম মুখে আনার জন্য মালতিকে দোষী সাব্যস্ত কওে ছেলেমেয়েসহ একঘরে করে রাখা হয়েছে। ১৮ মাস ধরে একঘরে হয়ে থাকা মালতির এই ঘটনা ওই অঞ্চলে আলোড?ন ফেলে দিয়েছে। ‘পিতৃতান্ত্রিক অনুক্রম ও শাসন যে বিভিন্ন স্তরে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে এটা তারই নমুনা’- বলছেন সামাজিক নৃ-তত্ত্ববিদ অধ্যাপক এআর ভাসাভি। তার ভাষায়-‘স্বামীকে ঈশ্বরের সমান বলা হচ্ছে তাই তার আরাধনা করতে হবে। সামাজিকভাবে সে বড় এবং অর্থনৈতিকভাবে স্ত্রীকে সহযোগিতা করে। তাই সে মালিক ও তাকে শ্রদ্ধা জানাতে হবে’। নারীরা সাধারণত ‘ক বা খ এর বাবা’ বলে ডাকে। অনেকে স্বামীর পেশা উল্লেখ করে ডাকে, যেমন ‘ডাক্তার সাহেব’ বা ‘উকিল সাহেব’। তাদের মধ্যে এটাতো অবশ্যই থাকে- ‘এই শুনো’, ‘এই শুনছো’ অথবা ‘আমার কথাটা একটু শোনোতো দয়া করে’ বা ‘তুমি কি শুনছো’? ভারতের কিছু ভাষা অনুযায়ী স্বামীকে সাধারণত ‘ভাই’, ‘বড় ভাই’, ‘হ্যালো’ বা ‘মালিক’ বলে ডাকা হয়।

ভিডিও ভলেন্টিয়ার্স নামে স্বেচ্ছাসেবী গ্রুপটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেয়ে বুঝাচ্ছেন পিতৃতান্ত্রিক এই প্রথা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। তারা চেষ্টা করছেন নারীরা যেন এই প্রথা থেকে বের হয়ে আসেন। গত অক্টোবর মাসে এই নিয়ে প্রচারণা শুরু করেন রোহিনি পাবার। তিনি পুনের একটি গ্রামের বাসিন্দা। গ্রামটিতে মহিলারা যেন স্বামীর নাম ধরে ডাকেন সেই ইস্যু নিয়ে আলোচনা শুরু করেন তিনি। তবে সবার আগে রোহিনি সিদ্ধান্ত নেন বিষয়টি আগে নিজের ওপর প্রয়োগ করবেন তিনি, কারণ রোহিনি নিজেও কখনো তার স্বামীকে নাম ধরে ডাকেননি। বিবিসিকে রোহিনি বলছিলেন ১৫ বছর বয়সে তার বিয়ে হয় এবং গত ১৬ বছরের বিবাহিত জীবনে কখনোই স্বামী প্রকাশকে নাম ধরে ডাকেননি। ‘আগে আমি তাকে ‘বাবা’ বলতাম কারণ তার ভাতিজিরা তাকে এভাবেই ডাকতো। অথবা তার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তাকে ‘আহো’ বলে ডাকতাম (মারাঠি ভাষায় ‘আহো’ মানে তুমি)’-বলেন রোহিনি। প্রচারণা শুরুর সময়টায় স্বামীকে নাম ধরে ডাকা শুরু করেন রোহিনি। প্রকাশও বিষয়টা স্বাভাবিকভাবে নিয়েছে, তবে গ্রামের অন্য বাসিন্দারা বিষয়টা সহজভাবে দেখেনি। গ্রামের নারীরা নিজেদের স্বামীদের নাম ধরে ডাকার বিষয়টা নিয়ে খুব মজা পাচ্ছেন।

Top