ঢাকা, ||

নারীদের মারধর করে ঘরে তালা দিতেন রুমকি


রাজশাহী

প্রকাশিত: ১১:৪৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৭, ২০১৭

দীন মোহাম্মাদ দীনু

বাকেরগঞ্জ প্রতিনিধি

বগুড়ার লতিফপুর কলোনির মো. পলাশ চকসূত্রাপুরে মুদি দোকান চালান। স্ত্রী বেঁচে নেই। সংসারে দুই মেয়ে। বড়টিকে বিয়ে দিয়েছেন। ছোটটি স্থানীয় একটি স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ে। হঠাৎ বড় মেয়েটির ক্যান্সার ধরা পড়ে। অনেক কষ্টে চিকিৎসা শুরু করেন পলাশ। মাস চারেক আগে একদিন মেয়েকে কেমোথেরাপি দিতে হাসপাতালে নিয়ে যান তিনি। সন্ধ্যায় ফিরে দেখেন ঘরের দরজায় তালা। ঘরে ঢুকতে না পেরে দরজার পাশে বসে কাঁদছিল ছোট মেয়েটি।

আশপাশে খোঁজ নিয়ে পলাশ জানতে পারেন, রুমকি কাউন্সিলর তাঁর ঘরে তালা দিয়েছেন।

ছোট মেয়ে বাবাকে জানায়, রুমকি তাকে ও তার এক বান্ধবীকে বাসায় ডেকে নিয়ে মারধরও করেছেন। এরপর এসে ঘরে তালা দিয়ে গেছেন। কারণ কী জানতে চান পলাশ। মেয়ে জানায়, রুমকির ছোট ভাই মোবাইল ফোনে তাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল। তাই রুমকি তার বিচার করেছেন। সেই রাতে দুই মেয়ে নিয়ে পলাশ দীর্ঘ সময় ঘরের বাইরেই ছিলেন। পরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতার অনুরোধে রুমকি ঘরের তালা খুলে দেন।সম্প্রতি মা-মেয়ে নির্যাতনের চাঞ্চল্যকর মামলায় গ্রেপ্তার হলেও রুমকির সেই অপকর্মের কথা এখনো কাউকে বলতে সাহস পান না পলাশ। স্থানীয় লোকজনের কাছে ঘটনার কথা শুনে গতকাল রবিবার তাঁর কাছে জানতে চাইলে বলেন, ‘এই কথা আমি কাউরে বলিনি। আমার বেটিটারে বিয়া দিতে হবি। তাগো ক্ষমতা আছে করছে! এখন আল্লাহ বিচার করতাছে। ’

এলাকাবাসী বলছে, বেপরোয়া মারজিয়া হাসান রুমকি তাঁর বাসায় ‘টর্চার সেল’ খুলে প্রায়ই নারীদের নির্যাতন করতেন। তাঁর স্বামীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ তুলে বাসার গৃহকর্মীর মেয়েকেও নির্মমভাবে নির্যাতন করেন রুমকি। ঘরে তালা দিয়ে হুমকির পর সেই দরিদ্র পরিবারটি এখন এলাকাছাড়া। তবে পুলিশের তদন্তকারীরা বলছেন, জিজ্ঞাসাবাদে রুমকি নির্যাতনের কথা পুরোপুরি স্বীকার করেননি। মামলার প্রধান আসামি তুফান সরকারও ধর্ষণের অভিযোগ এড়িয়ে গেছেন। জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা নিজেদের মতো করে ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এ কারণে গতকাল তাঁদের আদালতে হাজির করে আরো পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। তবে আদালত রিমান্ড মঞ্জুর না করে জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে আগামী সাত দিনের মধ্যে জেলগেটে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দিয়েছেন আদালত।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সদর থানার পরিদর্শক (অপারেশন) আবুল কালাম আজাদ জানান, রিমান্ড শেষে গতকাল আসামিদের বগুড়ার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম শ্যামসুন্দর রায়ের আদালতে হাজির করে ফের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানানো হয়। আসামিপক্ষ জামিনের আবেদনও জানায়। আদালত জামিন নাচক করার পাশাপাশি রিমান্ডও মঞ্জুর না করে আসামিদের জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ দেন। এই পুলিশ কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে তুফান শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের কথা স্বীকার করলেও মেয়েটির সঙ্গে তার প্রেম ছিল বলে দাবি করছে। রুমকি চুল কাটার কথা স্বীকার করলেও নিজের পক্ষে যুক্তি দেখাচ্ছে। তারা আদালতে স্বীকারোক্তি দিতে রাজি হয়নি। বিষয়গুলো যাচাইয়ের জন্য আবারও রিমান্ডের আবেদন করা হয়। ’

সূত্র জানায়, তুফান সরকারকে তিন দফায় সাত দিন এবং রুমকিকে দুই দফায় ছয় দিন হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তুফান নিজের অপকর্মের কথা পুরোপরি স্বীকার করেননি। তিনি বলেছেন, বিবাহিত হয়েও তিনি ১৭ বছরের ওই তরুণীকে উত্ত্যক্ত করেছেন। এরপর বিয়ের প্রলোভন দেখান। তিনি তরুণীকে বাসায় ডেকে নেওয়ার কথা স্বীকার করলেও দাবি করেছেন, ‘উভয়ের ইচ্ছায় সব কিছু হয়েছে। ’ তবে তরুণীকে নির্যাতন এবং চুল কাটার সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন না বলে দাবি করেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদের সময়ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন রুমকি। বলেন, এ মামলায় কিছুই হবে না। বিচার করতে গিয়ে ঘটনা ঘটেছে। মারাটা একটু বেশি হয়েছে। চুল কাটা ঠিক হয়নি।

এ মামলায় অন্য তিন আসামি এরই মধ্যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে প্রধান দুই আসামির জবানবন্দি না মেলায় এলাকাবাসীর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তাদের কেউ কেউ বলছে, আসামিরা প্রভাবশালী হওয়ায় এমনটি ঘটেছে।

তবে বগুড়ার এসপি আসাদুজ্জামান বলেন, ‘মামলার তদন্তে সব আসামির স্বীকারোক্তি মুখ্য নয়। এখানে অনেক বিষয় আছে। সব বিষয়েই তদন্ত হচ্ছে। এজাহারের অভিযোগের সত্যতা আমরা পেয়েছি। ’

আসামিদের জেলহাজতে পাঠানোর পর গতকাল এলাকার মানুষের প্রতিক্রিয়া জানতে গিয়ে খুঁজে পাওয়া যায় মুদি দোকানি পলাশকে। তিনি ভয়ার্ত কণ্ঠে বলেন, ‘মোবাইল ফোনে রুমকি কাউন্সিলরের ভাই রহিত আমার মেয়েকে কী ম্যাসেজ দিছে। এ কারণে আমার মেয়েকে এবং তার এক সহপাঠীকে বাসায় ধরে নিয়ে যায়। ওই সহপাঠীর মাও তাদের সঙ্গে গেছিল। তিনজনকে মারছে রুমকি। মারার পর আমার ঘরে তালা দিছে। আমি ক্যান্সারের রোগী মেয়েটারে নিয়া ফিরা দেখি ছোট বেটি বাইরে কানতাছে। পরে মান্নান চাচার কাছে আসি। সে বললে তালা খুইলা দেয়। চার মাস আগে এ ঘটনা ঘটে। ’ প্রতিবেশীরা জানায়, মাস ছয়েক আগে রুমকি তাঁর বাসার গৃহকর্মীর কিশোরী মেয়ের ওপরও নির্যাতন চালান। রুমকির স্বামী জাহিদ হাসানের সঙ্গে ওই মেয়ের অনৈতিক সম্পর্ক আছে—এমন সন্দেহের বশে বাড়িতে নিজেই সালিস বসান রুমকি। সেখানে মা-মেয়েকে সবার সামনে মারধর করেন তিনি। এরপর বাদুড়তলায় ওই গৃহকর্মীর বাসায়ও তালা ঝুলিয়ে দেন রুমকি। পরে মেয়েকে নিয়ে এলাকা ছাড়েন ওই গৃহকর্মী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিবেশী এক নারী বলেন, ‘কিছু হলেই রুমকি মানুষের ঘরে তালা দেয়। কেউ প্রতিবাদ না করায় এত সাহস পেয়েছে। ’

গতকাল রুমকির বাসা তালাবদ্ধ ছিল। তাঁর স্বামী জাহিদ হাসানের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তাই ঘটনার ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

শহর আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মান্নান বলেন, ‘হ্যাঁ, একটি ঘটনা আমি জানি। দুটি মেয়েকে বাসায় মারধর করেছিল রুমকি। পরে ঘরে তালাও দেয়। তখন মেয়ের বাবা আমার কাছে আসে। আমি রুমকিকে তালা খুলে দিতে অনুরোধ করেছিলাম। ’

প্রসঙ্গত, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে গত ১৭ জুলাই এক কিশোরীকে বাড়িতে নিয়ে ধর্ষণের পর তাকে ও তার মাকে নির্যাতন করে বগুড়া শহর শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক (বহিষ্কৃত) তুফান সরকার, তুফানের স্ত্রী আশা খাতুন, আশার বোন ও নারী কাউন্সিলর রুমকিসহ তাঁদের সহযোগীরা। এ ঘটনায় মেয়েটির মা ১০ জনের বিরুদ্ধে বগুড়া সদর থানায় দুটি মামলা করেন। পুলিশ এজাহারভুক্ত ৯ জনসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এজাহারভুক্ত আরেক আসামি শিমুল এখনো পলাতক।

Top