ঢাকা, ||

ধর্ষণের বিরুদ্ধে চাই সামাজিক আন্দোলন


মতামত

প্রকাশিত: ৩:৩৮ অপরাহ্ণ, মে ১৩, ২০১৭

আব্দুল্লাহ আল নোমান

বরগুনা প্রতিনিধি

বনানীর ধর্ষণ ঘটনায় অনেকে অনেক কথা বলছেন, মতামত ব্যক্ত করেছেন। আমিও করেছি। তবে আমার মনে হলো আরেকটু গুছিয়ে যদি কথাগুলো বলা যায়। তাই আজকের লেখা।

আমাদের সমাজে বর্তমানে অন্য অনেক সময়ের চেয়ে ধর্মচর্চা বেড়েছে, শিক্ষার হার বেড়েছে তবুও থেমে নেই ধর্ষণের মত ঘটনা। কেন? এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমি কিছু সামাজিক দায়িত্বের অভাবকেই দেখতে পেয়েছি। সব কিছুর দায় সরকারের উপর না চাপিয়ে আমাদের দায়িত্বগুলো আমরা ঠিকমত পালন করছি কি না সেদিকে বেশি করে নজর দেয়ার সর্বোচ্চ সময় বোধহয় এখনি। আমরা সবাই সার্টিফিকেটে শিক্ষিত হয়েছি কিন্তু সচেতনতার শিক্ষা আমরা পাচ্ছি কি? ঐ শিক্ষা কোন বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না এটি পাওয়া যাবে পরিবারে।

সন্তানের প্রথম শিক্ষক তাঁর মা। আমরা যারা ছেলে সন্তানের মা, আমাদের বিশেষ করে একটি কথা মনে রাখতে হবে, আমরা শুধু ছেলে মানুষ করছি না, আমরা মানুষ করছি কারো ভবিষ্যত স্বামী, বাবা, জামাই, দুলাভাই, প্রেমিক, বন্ধু, সহকর্মী। তৈরি করছি ভবিষ্যতের পুরুষকে। যে পুরুষ নারীকে পণ্য নয় মানুষ মনে করবে। একইভাবে পরিবারের বাবাটি তাঁর স্ত্রীর সাথে যে আচরণ করবে তাঁর সন্তানেরাও সেটিই শিখবে। আজকাল বেশিরভাগ নারীরাই চাকরিজীবী কিন্তু সংসার থেকে আমাদের ছুটি আছে কি? নারী হোমমেকার হোক অথবা চাকরিজীবী সপ্তাহে একটাদিন অত্যন্ত আপনি সংসার থেকে ছুটি নিন। আপনার পুরুষ সঙ্গীটিকে পুরো দায়িত্ব দিন। এতে আপনার ছেলেটি শিখবে ঘরের নারীটির একটা নিজস্ব জগত প্রয়োজন, মেয়েটি শিখবে তাঁর জীবনসঙ্গী কি ধরনের বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হবে।

সারাদিনের কাজ ভাগ করে নিন কারণ সংসারটা দুজনের। ছেলে হওয়ার পর আমরা আমাদের দায়িত্ব গুলো ভাগ করে নিয়েছি। আমি সপ্তাহের চারদিন বিকালের শিফটে কাজ করেছি আর ওর বাবা অফিস থেকে যত দ্রুত বাসায় ফেরা যায় ফিরেছেন। এর মাঝের সময়টুকু আমার মা সামলে নিয়েছেন। এখন আমি সবদিনই মর্নিং শিফট করি। আমার মা ওকে স্কুল থেকে আনেন। মা না থাকলে আমার চাকরি করা হতোনা। বাবা মানসিক ভাবে অনেক সাপোর্ট দেয় কিন্তু আসল কাজটা মা-ই করেন। তবে আমি লাকি আমার অফিসও অনেক সাপোর্টিভ। তাঁরা একজন মায়ের সমস্যা বোঝার চেষ্টা করেন। ছেলের স্কুলের মিসরাও।

আমি সপ্তাহে একদিন স্কুলে যাই তাঁরা আমাকে সাহায্য করেন ছেলের ভালো-মন্দ সব একেকজন মা হয়ে সহ্য করে। আমার ছেলের কিছু বন্ধুর মায়েরা আছেন তাঁরা ওর দিকে নজর দেন, পড়া দিয়ে সাহায্য করেন। আসলে কর্মজীবী মায়েদের পাশে এভাবে যদি পুরো সমাজ মিলেমিশে থাকে তাহলে তাঁর জীবন অনেক সহজ হয়ে যায়। আর যেহেতু আমাদের ছেলেকে আমরা ভবিষত্যের সেই পুরুষ হিসেবে দেখতে চাই যে কিনা নারীকে মানুষ মনে করবে, সহযোদ্ধা মনে করবে। তার চর্চা আমরা নিজেদের জীবনাচরণ দিয়েই শুরু করতে চাচ্ছি। এবং খুব ছোট পরিসরে হলেও শুরু করেছি। যদিও আমি কেনো আমার সন্তানের সাথে সব বলি তাঁর জন্য প্রায়শই আমাকে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়।

আসলে আমার বাবা-মায়ের সাথে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিলোনা যে আমি তাদের কাছে নির্দ্বিধায় সব বলতে পারবো। আমার মনে হয় আমার বাবা-মায়ের সাথে যদি আমার এই সম্পর্কটি থাকতো তাহলে আমার জীবনে অনেক কম ভুল হতো। আমার মনে হয় আমার জেনারেশনের অনেকেই আমার সাথে একমত হবেন। তাই যেদিন থেকে আমি মা হবো বলে মনস্থির করেছিলাম সেদিন থেকেই অন্য সব আয়োজনের সাথে সাথে নিজেকে এই প্রমিজ করেছিলাম আমি আমার সন্তানের শেষ আশ্রয়স্থল হবো। আমি ওর বন্ধু হতে না পারি কিন্তু ওর আনন্দ, বেদনা, ব্যর্থতা, সফলতা, সবকিছুর সাথে যেন আমি থাকতে পারি। ওকে যেন সমস্যায় পড়লে ভাবতে না হয় আমার এই একান্ত গোপন কথা আমি কাকে বলবো।

আমি শুক্র ও শনিবার অফিস করি কিন্তু পারিবারিক কাজ থেকে আমার সেদিন মোটামুটি ছুটি। আমার মায়ের ছুটি তিনদিন শুক্র, শনি ও রবিবার এই তিনদিন তাঁকে নাতির কোন কাজ করতে হয় না। আমি ভাত ভালো রান্না করতে পারিনা। ভাত রান্না আমার সবচেয়ে কঠিন মনে হয়, আমি সূচে কেমন করে সূতা ভরে তাও পারিনা সেলাই তো অনেক পরের কথা। তাই আমাদের ছোটখাটো সেলাই আমার বরই করে থাকে আর বুয়া না আসলে ভাতও সেই রান্না করে। এসব থেকে আমার ছেলে যা শিখেছে তা হলো, একদিন ওর নানীর বাসায় সব মিলায়ে ১১ জন গেস্ট ছিলো ওর নানা আমরা কেউ বাসায় নেই। কিন্তু আমার বড় মামা ছিলো। ও কাউকে কিছু না বলে আমার বড় মামাকে বললো, ” তুমি কেমন ভাই হোলা? তোমার বোন যে এত কাজ করলো তুমিতো একটুও হেল্প করলানা আমাদের বাসায় তো বাবা-মা মিলে মিলে সব কাজ করে, বাবা ভাত রান্না করে, মা আমাকে পড়ায়।”

সে আরো শিখেছে রান্না কষ্ট করে করতে হয়, খুব সহজে কারো রান্না খারাপ বলা যায় না। আমরা নারীরাই কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম তৈরি করি, জানি এই জার্নি সহজ না। তারপরও আমাদের একটু সচেতনতাই পারে একটি সুন্দর সমাজ গঠন করতে। এখানে আমাদের পুরুষ সঙ্গীটি সাহায্যকারীর ভূমিকায় থাকতে পারেন কিন্তু মূল কাজটি আমাদের। আর বাবাদের বলছি আপনারা মায়েদের শক্ত হাতিয়ার হোন। আর যদি তা না পারেন অন্তত বাধা হয়েন না। এই মুহূর্তে অন্য যে কোন আন্দোলনের চেয়ে সামাজিক আন্দোলনের উপর জোর দিতে হবে। আমরা একটি একটি পরিবার করে যদি শুরু করি তাহলে আমাদের কাঙ্খিত সমাজ আমরা অবশ্যই পাবো। একদিন এই সমাজ হবে ধর্ষণমুক্ত সমাজ। এই অঙ্গীকার হোক প্রতিটি নারীর, প্রতিটি মায়ের, প্রতিটি পরিবারের।

লেখক : সংবাদকর্মী।

Top