ঢাকা, ||

জামালপুরে ব্রি ৫৮ ধান চাষে ফলন বিপর্যয়


কৃষি ও প্রকৃতি

প্রকাশিত: ১০:২৮ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১৮, ২০১৬

আব্দুল্লাহ আল নোমান

বরগুনা প্রতিনিধি

ঢাকা: জামালপুরে নতুন জাতের নিম্নমানের ধান চাষে বিঘা প্রতি ৩০ মণের জায়গায় মাত্র আট মণ ধান পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে শত শত কৃষক। মেলান্দহ উপজেলার মাহামুদপুর, নাংলা ও কুলিয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চলের এক ফসলি জমিতে এ বছর ব্রি ৫৮ বা ভিত্তি ৫৮ ধান চাষে এ ফলন বিপর্যয় দেখা গেছে। স্থানীয় বীজ ব্যবসায়ীরা শত শত কৃষকের মাঝে এ বছর অত্যান্ত নিম্নমানের অথবা মেয়াদ উত্তীর্ণ ভিত্তি ৫৮ জাতের সাত মেট্রিকটন ধানের বীজ সরবরাহ করায় এ ফলন বিপর্যয় হয়েছে বলে দাবি করছেন কৃষকরা।
সরেজমিন জানা গেছে, জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলার মাহামুদপুর, নাংলা ও কুলিয়া ইউনিয়নের মাঝে রয়েছে বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল। ওই নিম্নাঞ্চলের শত শত একর জমি বছরের ছয় মাস পানির নিচে তলিয়ে থাকে। তাই চাষিরা সেখানে শুষ্ক মৌসুমে কেবলমাত্র বোরো ধানের চাষ করেন। প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও ওই এক ফসলি জমিতে কৃষকরা ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ ধান চাষ করেছেন। আবার অনেকেই বেশি ফলনের আশায় এ বছর সেখানে নতুন জাতের ব্রি-৫৮ বা ভিত্তি ৫৮ ধান চাষ করেছেন। সম্প্রতি মাঠে ধান পাকতে শুরু করেছে। অনেকেই অধিক ফলন পাওয়ায় মহা উল্লাসে ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ ধান কেটে মাড়াই শুরু করেছেন। তবে নতুন জাতের ধান ব্রি-৫৮ বা ভিত্তি ৫৮ ধান চাষিরা নতুন ফসল কেটে মাড়াই শুরু করতেই ফলন বিপর্যয়ের মুখে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। মাহামুদপুর, নাংলা ও কুলিয়া ইউনিয়নের কৃষকরা এ বছরও ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ ধান চাষে একর প্রতি গড়ে ১০০ মণ ফলন পেয়েছেন। কিন্তু নতুন জাতের ব্রি-৫৮ বা ভিত্তি ৫৮ ধান চাষ করে কৃষকদের অনেকেই পাগল প্রায়। কারণ তারা নতুন জাতের ধান কেটে মাড়াইয়ের পর একরে ফলন পেয়েছেন মাত্র ২০ মণ। এতে কৃষকরা নতুন জাতের ব্রি-৫৮ বা ভিত্তি ৫৮ ধান চাষ করে পুরনো জাতের ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ ধানের চেয়ে একর প্রতি গড়ে ৮০ মণ ধান কম উৎপাদন করতে পারায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, নতুন জাতের ব্রি-৫৮ বা ভিত্তি ৫৮ ধান বীজ অত্যন্ত নিম্নমানের ছিল। আর কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃষকদের মাঝে নিম্নমানের ধান বীজ সরবরাহ করায় কৃষকরা এ বছর ফলন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। মেলান্দহ উপজেলার মাহামুদপুর ইউনিয়নের আগ পয়লা গ্রামের ষাটোর্ধ কৃষক বাদশা মণ্ডল জানান, এ বছর তিনি আগপয়লা গ্রামে তার এক একর এক ফসলি জমিতে ব্রি-২৮ এবং দেড় একর জমিতে উচ্চ ফলনের আশায় ভিত্তি ৫৮ জাতের বোর ধান চাষ করেছেন। তিনি পাশাপাশি দুটি ধান ক্ষেতে একই ধরনের পরিচর্যা ও একই অনুপাতে সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করেছেন। অথচ ব্রি-২৮ জাতের ধান গাছের চেয়ে ভিত্তি ৫৮ জাতের ধান গাছ দেখতে সবল হয়েছে। তবে ব্রি ২৮ জাতের ধান সুন্দরভাবে পাকলেও ভিত্তি ৫৮ জাতের ধান পাকার আগেই অধিকাংশ ধান গাছের শীষ শুকিয়ে মরে গেছে। এতে ভিত্তি-৫৮ জাতের ধানের ফলন অনেক কম হবে বলে তিনি জানান। বাদশা মণ্ডল দাবি করেন, মাহমুদপুর বাজারের বীজ ব্যবসায়ী আব্দুল হক আলম সরকারের সরবরাহকৃত ব্রি ৫৮ বা ভিত্তি ৫৮ জাতের ধান বীজ অত্যান্ত নিম্নমানের অথবা মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার কারণে তিনি ফলন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। মাহমুদপুর ইউনিয়নের পয়লা গ্রামের কৃষক আনিছুর রহমান জানান, মাহামুদপুর বাজারের ধানবীজ ব্যবসায়ী আব্দুল হক আলম সরকারের নিকট থেকে ধান বীজ নিয়ে তিনি দুই বিঘা জমিতে ব্রি ২৮ এবং চার বিঘা জমিতে ব্রি ৫৮ জাতের ধানের চাষ করেছেন। ইতিমধ্যেই তার দুটি প্লটের ধান পাকায় ১০ শতাংশ করে জমির ব্রি ২৮ ও ব্রি ৫৮ জাতের ধান কেটে মাড়াই করেছেন। সেই হিসেবে তাঁর জমিতে এ বছর ব্রি ২৮ একর প্রতি গড়ে ১০০ মণ ফলন হয়েছে কিন্তু ভিত্তি ৫৮ জাতের ধান একর প্রতি গড়ে ২০ মনের বেশি ফলন হয়নি। কৃষক আনিছুর রহমানের সঙ্গে কথা শেষ হতেই ওই গ্রামের বিধবা দুলালী বেগম কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তিনি বলেন, “মাহামুদপুর বাজারের ধানবীজ ব্যবসায়ী আব্দুল হক আলম সরকার বলেছেন, ‘ভিত্তি ৫৮ জাতের ধান বীজ নিয়া বোরো চাষ করেন। অধিক ফলন পাবেন। ধানের বোটা শক্ত হবে এবং ভাত খেতে সুস্বাদু হবে’। তাই বেশি ফলনের আশায় ভিত্তি ৫৮ জাতের বীজ নিয়ে ধান চাষ করেছি। ধান পাকার আগেই ক্ষেতের অর্ধেক ধান মরে গেছে, এখন দেখছি এক বিঘা জমিতে সাত মণ ধানও হবে না। আর ওই সাত মণ ধান বেইচা মেশিনের ভাড়া ও কামলার বেতন দিতেই শেষ হইবো। ভাই এখন আমি বাচমু কেমনে? একটি কন্যা সন্তান রাইখা আজ থেকে ১০ বছর আগে স্বামী মারা গেছে। স্বামী মারা যাওয়ার পর আগপয়লা গ্রামে ফিরে বাপ ভাইয়ের নিকট থেকে এক বিঘা এক ফসলি জমি নিয়ে কয়েক বছর ধরে ধান চাষ করি। ওই জমি থেকে প্রতি বছর ৩০ মণ ধান পাইতাম। তাই দিয়ে মা-মেয়ের জীবন বাঁচাইতাম। এখন আমাদের কি হবে ভাই?” মাহমুদপুর ইউনিয়নের বিশিষ্ট সমাজসেবক মো. বুলবুল আহম্মেদ জানান, একইভাবে ব্রি ৫৮ বা ভিত্তি ৫৮ জাতের ধান চাষ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ওই এলাকার কৃষক আলহাজ একাব্বর আলী, খট্টু মণ্ডল, বাক্কা মণ্ডল, হক্কু আমির, ভাদু লাল মুচি, ইন্তাজ আলী, আব্দুল মান্নান, নান্নু মিয়া, ছায়ের উদ্দিন ‌এবং আব্দুস সামাদ মণ্ডলসহ মেলান্দহ উপজেলার মাহামুদপুর, নাংলা এবং কুলিয়া ইউনিয়নের শত শত কৃষক। এ ব্যাপারে মাহামুদপুর বাজারের ধান বীজ ব্যবসায়ী আব্দুল হক আলম সরকার জানান, তিনি জামালপুর রোড, মধুপুর, টাংগাইলের মেসার্স মনিরা ট্রেডার্সের মালিক মতিয়ার রহমানের নিকট থেকে উচ্চ ফলনশীল ধানবীজ মনিরা সিড নামক ব্রি ৫৮ বা ভিত্তি ৫৮ জাতের ধান বীজ সংগ্রহ করেছেন। সেখান এ বছর সাত মেট্রিকটন ব্রি ৫৮ বা ভিত্তি ৫৮ জাতের ধান বীজ এনে মাহামুদপুর বাজারের সরকার বীজ ভাণ্ডারে মজুদ করে এলাকার কৃষকদের মাঝে সরবরাহ করেছেন। এদিকে, তার কাছ থেকে বীজ সংগ্রহপূর্বক ভিত্তি ৫৮ জাতের ধান চাষ করে শত শত কৃষক ফলন বিপর্যয়ের মুখে পড়ার কথাটি তিনি কৃষকদের মুখে শুনেছেন বলে স্বীকার করেছেন। তবে বীজ সরবরাহের দায় এড়িয়ে তিনি বলেন, “ভিত্তি ৫৮ জাতের ধান বীজ মেয়াদ উত্তীর্ণ বা নিম্নমানের ছিল কিনা- তা দেখার দায়িত্ব তার নয়, এটা কৃষির বীজ বিপণন বিভাগ এবং মেসার্স মনিরা ট্রেডার্সের। মেলান্দহ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহফুজুল ইসলাম জানান, ব্রি ৫৮ বা ভিত্তি ৫৮ জাতের ধান প্রতি বিঘায় ২৫ মণ হওয়ার কথা রয়েছে। অথচ মেলান্দহ উপজেলার মাহামুদপুর, নাংলা ও কুলিয়া ইউনিয়নের শত শত কৃষক ব্রি ৫৮ ধান চাষে বিঘা প্রতি আট মণের বেশি ফলন পাচ্ছেন বলে তিনি শুনেছেন। তবে তিনি খুব শীঘ্রই সরেজমিনে তদন্তপূর্বক ভিত্তি ৫৮ জাতের ধানের ফলন বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান করবেন বলে জানান।
আইআই

Top