ঢাকা, ||

জন্মদাতা পিতা সম্পর্কেও জানান রিজিয়া নদভী


মতামত

প্রকাশিত: ১১:১৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৬, ২০১৭

আব্দুল্লাহ আল নোমান

বরগুনা প্রতিনিধি

শেখ আদনান ফাহাদ’র আরও লেখা:

বাংলাদেশে কি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে বিশ্বাসী প্রকৃত আওয়ামীলীগ পরিবারের অভাব পড়েছে? এ প্রশ্ন আমার শুধু একার নয়; ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ খোদ আওয়ামী লীগের লাখ লাখ নেতা-কর্মী এবং কোটি কোটি সমর্থকের মনের প্রশ্ন এটি। মানুষের মুখে মুখে এ প্রশ্ন ঘুরছে; কারণ স্বাধীন বাংলাদেশের এক বড় জামায়াত নেতার মেয়ে এখন বাংলাদেশ আওয়ামী মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদ্যগঠিত কেন্দ্রীয় পূর্ণ কমিটির সদস্য।

জামায়াত নেতার মেয়ে রিজিয়া রেজা চৌধুরী ওরফে রিজিয়া নদভীর কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা বনে যাওয়া নিয়ে আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতা প্রকাশ্যে মুখ না খুললেও মূল দল এবং নানা সহযোগী সংগঠনের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা পার্টি অফিসসহ ফেসবুক এবং অন্যান্য পরিসরে তীব্র সমালোচনা করে চলেছেন। সবার একটাই জিজ্ঞাসা, যে নারী জীবনে ছাত্রলীগ করেন নাই, যুবলীগ করেন নাই, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কোন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন করেন নাই, তিনি কীভাবে মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হয়ে যান? ইউনিয়ন কমিটি নয়, উপজেলা-জেলা নয়, একেবারে সারা বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য!

তার বাবা বছরখানেক আগেও মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী এবং আলী আহসান মুজাহিদ এর গায়েবানা জানাজায় ইমামতি করেছেন। কেমন করে এত বড় জামায়াত নেতার মেয়ে এখন এত বড় আওয়ামী লীগ নেতা বনে গেছেন? যারা তাকে কমিটিতে স্থান দিয়েছেন, তারা কী ভেবে দিয়েছেন? আওয়ামী লীগে তাহলে এখন কাদের নিয়ন্ত্রণ?

মহিলা আওয়ামী লীগের ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ২১ জনকে সহসভাপতি, ৮ জনকে যুগ্ম সম্পাদক ও ৮ জনকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়। এ ছাড়া আরও ২৩ জনকে অন্যান্য বিষয়ের সম্পাদক ও ৮৯ জনকে সদস্য মনোনয়ন করা হয়। সদস্যদের তালিকায় ৬৮ নম্বরে মনোনীত হন চট্টগ্রামের রিজিয়া নদভী। রিজিয়ার নাম দেখেই তেতে উঠে আওয়ামী লীগ সমর্থক বড় এক অংশ। নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম এবং জায়গা হিসেবে বেছে নেয়া হয় ফেসবুককে। মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে জামায়াত পরিবারের সদস্য রিজিয়ার স্থান পাওয়া তাদের মধ্যে চরম বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে।

বছরের শুরুতে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের কমিটিতেও সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে রিজিয়া নদভীকে রাখা হয়েছিল। তখন ছাত্রলীগসহ নানা সহযোগী সংগঠনের তীব্র প্রতিবাদের মুখে রিজিয়াকে সরিয়ে দেওয়া হয়। যাকে মহানগর কমিটি থেকে আওয়ামী লীগ সরিয়ে দিয়েছিল, তাকেই আবার কোন যুক্তিতে, কিসের ভিত্তিতে একেবারে জাতীয় বা কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান দেয়া হলো? কীভাবে সম্ভব হলো এই অসম্ভব?

দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, রিজিয়া নদভীর বাবা মুমিনুল হক চৌধুরী জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য ছিলেন। বাঁশখালী আসন থেকে বারবার দাঁড়িপাল্লা নিয়ে নির্বাচন করেছেন। রিজিয়া নিজেও শিবিরের ছাত্রী সংগঠন ছাত্রীসংস্থার নেত্রী বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে, যদিও এক প্রেস রিলিজে তিনি তা অস্বীকার করেছেন। এমন একজন নারী কেন্দ্রীয় মহিলা আওয়ামী লীগের নেতা! ভাবতেই কেমন লাগে। এ কোন আওয়ামী লীগ? সামনের দিনগুলোতে কেমন হবে এই আওয়ামী লীগ? আর কী কী লেখা আছে বাংলাদেশের ললাটে?

বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী ২০১৬ সালের ১১ মে চট্টগ্রামে যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামীর গায়েবানা জানাজা পড়ান রিজিয়ার বাবা মুমিনুল হক চৌধুরী। এরপর ওই দিন বেলা দেড়টায় নগরের চট্টগ্রাম কলেজ-সংলগ্ন প্যারেড মাঠে নিজামীর দ্বিতীয় গায়েবানা জানাজার কর্মসূচি দেয় জামায়াত। সেই কর্মসূচি ঠেকানোর ঘোষণা দিয়ে চট্টগ্রাম কলেজ শাখা ছাত্রলীগ কলেজের ফটকে অবস্থান নেয়। পরে জামায়াতের নেতা-কর্মীর সঙ্গে ছাত্রলীগ ও পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল ছোঁড়ার ঘটনা ঘটে। এর আগে ২০১৩ সালের ২৫ এপ্রিল জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা শাখার আমীর জাফর সাদেককে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। দক্ষিণ চট্টগ্রামে পুলিশের ওপর হামলাসহ বিভিন্ন সহিংস ঘটনার পরিকল্পনার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। জাফর সাদেককে গ্রেপ্তারের ঘটনায় চট্টগ্রাম জামায়াতের পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেওয়া হয়েছিল। সেই বিবৃতিদাতাদের একজন ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য মুমিনুল হক চৌধুরী। এমন একজন মানুষের মেয়ে এখন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা! বাহ বাহ বাহ। বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগে কীভাবে ঘটল এই দুর্ঘটনা? কী হবে এর পরিণাম?

রাজনীতি সচেতন, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী দেশবাসীর মনে চরম বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে এ ঘটনা। মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি কি আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার অবগতি ছাড়া হয়েছে? দলীয় সাধারণ সম্পাদক, ওবায়দুল কাদের নিশ্চয়ই রিজিয়াকে চেনেন ভালো করে। গত ২১ জুলাই শুক্রবার সন্ধ্যায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গণভবনে মনোনয়ন বোর্ডের সভায় দলে অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। তাহলে এ কেমন কমিটি গঠন মহিলা আওয়ামী লীগের? আমরা বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা জামায়াত-কন্যা রিজিয়ার অতীত, বাবার জামায়াত সংশ্লিষ্টতা ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে জানেন না। দেশের কোটি কোটি আওয়ামী সমর্থক কোনোভাবেই বিশ্বাস করবে না যে, সবকিছু জানার পরও শেখ হাসিনা রিজিয়াকে মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা হিসেবে অনুমোদন দিয়েছেন!

মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক নতুন সদস্যের সাথে কথা বলেছি এ নিয়ে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই নতুন সদস্যদের কারো কারো বাবা, কারো চাচা মুক্তিযোদ্ধা; শহীদ পরিবারের সদস্যও আছেন অনেক। আওয়ামী লীগে এমন পরিবারের ছেলে-মেয়েরা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তারা জানিয়েছেন, গেল রমযানের আগে মহিলা আওয়ামী লীগের একটি প্রস্তাবিত কমিটি আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে জমা পড়ে। শেখ হাসিনা সময় নিয়ে সেই প্রস্তাবিত কমিটি যাচাই-বাছাই করেন। কমিটি চূড়ান্তভাবে ঘোষণার ১৫/২০ দিন আগে শেখ হাসিনার দপ্তর থেকে কমিটির খসড়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং মহিলা আওয়ামী লীগের নতুন সভাপতি ও সম্পাদকের কাছে প্রেরণ করা হয়। রমযানের আগে শেখ হাসিনার কাছে জমা দেয়া কমিটির নাম, শেখ হাসিনা কর্তৃক চূড়ান্তকৃত কমিটির নাম আর ঘোষিত কমিটির নাম এক হয়ে থাকলে হিসেব একরকম। আর অন্যকিছু হয়ে থাকলে হিসেব আরেকরকম। যাই হোক, আওয়ামী লীগ কীভাবে চলবে, সংশ্লিষ্ট নানা সংগঠনের কমিটি কী হবে সেটা একান্তই শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দের ব্যাপার। তবে সাধারণ নেতা-কর্মী আর সমর্থকদের আবেগকেও মূল্য দিয়ে চলতে হবে আওয়ামী লীগকে।

ঘটনা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে আমার প্রশ্ন, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা কর্তৃক যাচাই হয়ে আসার পর কেন দুই সপ্তাহ বিলম্বে কমিটি ঘোষণা করা হলো? যুব মহিলা লীগের কমিটি কিন্তু একই প্রক্রিয়ার ১/২ দিনের মধ্যেই ঘোষণা করা হয়েছে। যুব মহিলা লীগের কমিটি অসাধারণ হয়েছে বলে মনে করি। সবার প্রতি ন্যায়বিচার করা হয়েছে। যারা যোগ্য তাদেরকেই দেয়া হয়েছে। এমন শিক্ষিত ও দক্ষ নেতৃবৃন্দকে স্থান দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন।

জামায়াত বাবার সন্তান রিজিয়া তাকে নিয়ে নানা সংবাদ প্রতিবেদনের প্রতিবাদ জানিয়ে একটি প্রেস রিলিজ দিয়েছেন। ছয়শ’রও বেশি শব্দ সম্বলিত এই প্রেস রিলিজে রিজিয়া রেজা চৌধুরী ‘মুক্তিযুদ্ধ’ বানান লিখেছেন ‘মুক্তিযোদ্ব’ হিসেবে। আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতা ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটা ঠিকমত লিখতে পারবেন না, এটা কেমন কথা? প্রেস রিলিজে রিজিয়া আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য স্বামী, মামা ‘মুক্তিযোদ্বা’ শ্বশুরবাড়ি একটি আওয়ামী পরিবার, ভাসুর ‘মুক্তিযোদ্বা’ ইত্যাদি নানা পরিচয় দিয়ে নিজের আওয়ামী সংশ্লিষ্টতা প্রমাণের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু নিজের জন্মদাতা পিতা বিষয়ে একটি শব্দও লিখেননি। নিজের বাবার পরিচয় দিতে উনার কিসের সমস্যা? যেখানে বলা হচ্ছে ‘রাজাকারের মেয়ে’ এখন আওয়ামী লীগ নেতা! রিজিয়া রেজা চৌধুরীকে কেউ রাজাকার বলছেন না, বলছে তার বাবাকে।

বলা হচ্ছে রিজিয়ার বাবা নিজামী, মুজাহিদের গায়েবানা জানাজার ইমামতি করেছেন! রিজিয়া রেজার সৎ সাহস থাকলে নিজের বাবার পরিচয় ঠিকমত তুলে ধরুন। আপনি কেমন সন্তান যে একটি প্রেস রিলিজে নিজের বাবার পরিচয় দিতে পারেন না! আপনি আবার ৫৭ ধারার ভয় দেখিয়েছেন। ৫৭ ধারা বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত একটা আশংকা নিয়ে আমি ফেসবুকে লিখছি কয়েকদিন ধরে। আমার আশংকা হলো এমন একদিন আসবে যখন রাজাকারকে রাজাকার বলা যাবে না; বললে ৫৭ ধারায় মামলা হবে। আমার আশংকা যে এত দ্রুত সত্য হবে তা ভাবিনি। রিজিয়া রেজার স্বামী চট্টগ্রামের একটি আসন থেকে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য। স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় কোন ব্যক্তি আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচন করে বিজয়ী হতেই পারে। আসন ধরে রাখার কৌশল হিসেবে শ্বশুর জামায়াত নেতা হওয়া সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ একজনকে টিকেট দিতে পারে। কিন্তু তাকে কিংবা তার স্ত্রীকে কোনভাবেই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান দিতে পারে না। জামায়াত পরিবারের কেউ কোনদিন আওয়ামী লীগ হতে পারে না। রক্তের জন্যই এটা সম্ভব না।

মুক্তিযোদ্ধার সন্তান রাজাকার হতে পারে, কিন্তু রাজাকারের সন্তান মুক্তিযোদ্ধা হতে পারে না। একজন স্বীকৃত জামায়াত নেতার কন্যা যখন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির গোপন সভায় ভাষণ দেবেন, গোপন পরামর্শ সম্পর্কে জানবেন, স্পর্শকাতর কোন সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানবেন তখন কতখানি নিরাপদ থাকবে আওয়ামী লীগ, কতখানি নিরাপদ থাকবে বাংলাদেশ?

চ্যানেল আই অনলাইন

Top