ঢাকা, ||

চিকুনগুনিয়া নিয়ে কিছু কথা


সাব লিড নিউজ

প্রকাশিত: ৭:৩৮ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৩, ২০১৭

আব্দুল্লাহ আল নোমান

বরগুনা প্রতিনিধি

 

ঘরে ঘরে এখন চিকুনগুনিয়া, যা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্য সমস্যা। রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত, বাস-ট্রেন, আড্ডা এমনকি বিভিন্ন গণমাধ্যমে একই আলোচনা। এ শতাব্দীর শুরুতে ডেঙ্গু যখন ভয়াবহ রূপ ধারণ করে, তখনও এরকম আলোড়ন তুলেছিল। আর বর্তমানে চলছে চিকুনগুনিয়ার ভয়াবহতা নিয়ে সর্বত্র শোরগোল। রোগটি ভয়াবহ বা জীবনঘাতি নয়, চিকিত্সকদের এমন শত আশ্বাসবাণী সত্বেও জনগণ মোটেই ভরসা রাখতে পারছেন না। হঠাত্ করে এরোগের প্রকোপ এত বেড়ে গেছে যে, মানুষের মধ্যে রীতিমতো আতঙ্ক বিরাজ করছে। এক পরিবারের কারো হলে অন্য সদস্যরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। রোগটি মহামারী না হলেও এটা যে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই।

চিকুনগুনিয়া কেন হয়

রোগটি ভাইরাস জনিত, ডেঙ্গু জ্বরের মতো এডিস ইজিপ্টাই ও এডিস অ্যালবোপিক্টাস মশার কামড়ের মাধ্যমে মানব শরীরে প্রবেশ করে। চিকুনগুনিয়া মানবদেহ থেকে মশা এবং মশা থেকে মানবদেহে ছড়ায়। মানুষ ছাড়াও বানর, পাখি, তীক্ষ্ম দন্ত প্রাণী যেমন ইঁদুর এই ভাইরাসের জীবনচক্র বিদ্যমান। মশা কামড় দেয়ার ৪ থেকে ৮ দিনের মধ্যে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়।

চিকুনগুনিয়ার ইতিহাস

চিকুনগুনিয়া একটি ভাইরাসজনিত অসহনীয় ব্যথা সম্বলিত যন্ত্রণাদায়ক জ্বর। প্রথম ১৯৫২ সালে আফ্রিকার দক্ষিণ-পূর্ব তানজানিয়া ও উত্তর মোজাম্বিক বর্ডার এলাকায় মাকন্ডি জাতির মধ্যে পাওয়া যায়। ২০০৬ সালে ভারতে কয়েক হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়, ২০০৭ সালে ইটালি, ফ্রান্স, ক্রোয়েশিয়া এবং ক্যারীবিয় অঞ্চলে রোগটির প্রাদুর্ভাব ছিলো ভয়াবহ। ২০১৫ সালে আমেরিকার বহু দেশে রোগটির ভয়াবহতা টের পাওয়া যায়। বাংলাদেশে ২০০৮ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রথম চিকুনগুনিয়ার রোগী সনাক্ত হয়। ২০১১ সালেও দোহারে কিছু কিছু লোক আক্রান্ত হয়। অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০১৭ সালে রোগটি রাজধানীতে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশে রোগটির প্রাদুর্ভাব। মূলত: আফ্রিকা, এশিয়া এবং ভারতীয় উপমহাদেশে এই রোগের প্রকোপ বেশি।

নামটি চিকুনগুনিয়া কেন

শব্দটি আফ্রিকান, রোগটিকে মাকন্ডি জাতির স্থানীয় ভাষায় বলা হয় কিমাকন্ডি, যার অর্থ “টু বিকাম কনটরটেড বা দুমড়ানো অবস্থা”। অনেকটা ধনুকের মতো বেঁকে যাওয়া। আসলে ব্যথার তীব্রতার এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যে, রোগী ধনুকের মতো সামনে বেঁকে হাঁটে। এই জ্বরকে স্থানীয় ভাষায় ল্যাংড়া জ্বরও বলা হয়, কারণ হাঁটুসহ শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টে বা গিরায় এতো ব্যথা হয় যে, রোগীকে নুইয়ে পঙ্গু করে ফেলে।

চিকুনগুনিয়ার মূল সমস্যা বা লক্ষণ কি

রোগের শুরুতে প্রচন্ড জ্বর, বমিবমি ভাব বা বমি, মাথা ব্যথা, শরীর দুর্বল, শরীরে লাল র্যাশ এবং সর্বশরীরে বিশেষ করে মাংসপেশি, মেরুদন্ড বা অস্থিসন্ধিতে তীব্র ব্যথা এমনকি ফোলাও থাকে, চলাফেরা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রচন্ড জ্বরে রোগী অচেতনও হতে পারে। তিন/চারদিনের মাথায় জ্বর সেরে যাওয়ার পরও অনেকেই দুর্বলতা, অরুচি এবং বমিভাব অনুভব করেন। কারও কারও ভাষায় চলে আসে জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা। আবার কিছু রোগী তীব্র গিটের ব্যথার ভোগেন, ফলে স্বাভাবিক কাজকর্ম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

চিকুনগুনিয়ার লংটার্ম ইফেক্ট কি

চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তদের ৮০ থেকে ৯০ ভাগ রোগী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আরোগ্য লাভ করে। শতকরা ১০ ভাগের কম রোগী জ্বর চলে যাবার পরও শরীরের বিভিন্ন জয়েন্ট বা গিরায় এবং মাংসপেশিতে প্রচন্ড ব্যথায় ভোগে, যাদের অধিকাংশই দুই এক সপ্তাহের মধ্যেই দ্রুত আরোগ্য লাভ করে। স্বল্প সংখ্যক রোগী কয়েক মাস পর্যন্ত মারাত্মক ব্যথায় ভুগতে পারে। ব্যথার তীব্রতা এতই বেশী যে, আক্রান্তদের অনেকেই দীর্ঘ দিনের জন্য স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

একমাত্র ভূক্তভোগী ছাড়া অন্য কেউ এর তীব্রতা অনুভব করতে পারবেনা। অনেক রোগী এমনভাবে বলে যে, তাদের হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ভর্তা বানিয়ে ফেলা হয়েছে।

চিকুনগুনিয়া শনাক্তকরণে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও করণীয়-

লক্ষণগুলো দেখে খুব সহজেই রোগ শনাক্ত করা যায়। ৫-৭ দিন পরে রক্তে ভাইরাসের বিরুদ্ধে এন্টিবাডি তৈরি হয়, যা ৫-৭ দিন পরে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা যায়। এই সময়ের আগে পরীক্ষাটি করলে পজিটিভ হবার সম্ভাবনা কম। আর-টিপিসিআর এবং সেরোলজির মাধ্যমে ভাইরাস শনাক্ত করা যায়। রোগীর আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে এই পরীক্ষাগুলো করার প্রয়োজন নেই। এতে চিকিত্সায় কোন লাভ হবেনা। তবে রক্তের কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট করা উচিত জ্বরের ৪-৫ দিন পরে।

চিকুনগুনিয়ার চিকিৎসা কি

চিকিৎসা মূলত উপসর্গ ভিত্তিক। জ্বরের জন্য শুধু প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধই যথেষ্ট। একটি বা দুটি ট্যাবলেট তিন বেলা অথবা সাপোজিটরি ব্যবহার করা যায়। পানি দিয়ে শরীর স্পঞ্জ করা এবং রোগীকে পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে। প্রচুন পানি, ডাবের পানি, শরবত, গ্লুকোজ, স্যালাইন, স্যুপ জাতীয় তরল খাবার এবং স্বাভাবিক খাবার খেতে হবে। (চলবে)

লেখক: ডিন, মেডিসিন অনুষদ
অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

দৈনিক ইত্তেফাক

Top