ঢাকা, ||

ওদের মুখে হত্যা, ধর্ষণ বীভৎসতার বর্ণনা


জাতীয়

প্রকাশিত: ৭:৫৮ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৭

দীন মোহাম্মাদ দীনু

বাকেরগঞ্জ প্রতিনিধি

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর নির্যাতন চালাচ্ছে সেখানকার রাষ্ট্রীয় বাহিনী। হত্যার পর মানুষের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হচ্ছে। বুলেটে ঝাঝরা করে দেয়া হচ্ছে দেহ। নারীদের ধর্ষণের পর শরীর থেঁতলে দেয়া হচ্ছে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে। জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হচ্ছে মানুষ ও পশু। জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। লাশের ওপর চলছে নারকীয় তাণ্ডব। রক্তের হোলিখেলা।

ভাগ্যের ফেরে কোনো মতে প্রাণে বেঁচে বাংলাদেশে আসা স্বজনহারা ও আহত রোহিঙ্গারা এমন লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তে অনাহারে-অর্ধাহারে তাদের দুঃসহ করুণ সময় কাটছে। আহত, গুলিবিদ্ধ, ক্ষুধার্ত, অসুস্থ, বিবস্ত্র, রোদ-বৃষ্টিতে ছায়াহীন চরম বিপর্যয়কর এক অবস্থা তৈরি হয়েছে সীমান্ত এলাকায়। গতকাল সোমবারও বাংলাদেশের উখিয়া সীমান্ত থেকে একের পর এক গ্রাম আগুনে জ্বলতে দেখা গেছে। সকাল সাড়ে ১০টার পর একটি হেলিকপ্টার মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে যাওয়ার পরপর এই গ্রামগুলো আগুনে জ্বলে ওঠে। অসহায় চোখগুলো নির্বাক চেয়ে দেখছিল তাদের শেষ সম্বল হারোনোর আলামত। দুপুরের দিকে ওই এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী রোহিঙ্গা তা নিশ্চিতও করেন।

গতকাল বেলা দেড়টার দিকে ওই এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন মিয়ানমারের বুচিডং এলাকার কিয়ংডংয়ের তমবাজারের বাসিন্দা নূর মোহাম্মদ (২৫)। তিনি বলেন, গত মাসের ২৫ তারিখ রওনা দিয়ে পাহাড়-পর্বত পেরিয়ে লুকিয়ে আজ (গতকাল সোমবার) দুপুরে নৌকা পেরিয়ে এদেশে ঢুকি। আমরা তম্বরু দিয়ে আসার সময় দেখি আর্মিরা গুলি করে মানুষ মারছে। আর ঘরবাড়িতে আগুন দিচ্ছে। আমরা রাস্তার ধারে কিছুক্ষণ লুকিয়ে থাকার পর তারা চলে গেলে ঘাট পার হয়ে ঘণ্টাখানেক আগে বাংলাদেশে ঢুকি।

গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা। উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের আনজুমান পাড়ার মৌলভী আবদুল লতিফ ওয়াকফ স্টেট এলাকা। অনেকটা সীমান্ত ঘেঁষা স্থান। ওই সময় মিয়ানমারের সীমান্ত দিয়ে একটি হেলিকপ্টার উড়ে যেতে দেখা যায়। তার পর পর জ্বলে উঠে আগুন। এর বেশ কিছুক্ষণ পরও একে একে আগুন জ্বলে ওঠে। বিস্তৃত আগুন দীর্ঘক্ষণ ধরে জ্বলছিল। দেখা গেছে কুণ্ডলি পাকানো ধোঁয়া। আগুনের লেলিহান শিখা। পাহাড় ও সমতলে। ঘণ্টা দেড়-দু’য়েকের মধ্যে সে আগুন ও ধোঁয়া শেষ হতেও দেখা যায়। দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত একের পর এক অন্তত এক ডজন স্থানে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে।

গতকাল সকাল ১১টা। আনজুমানপাড়ার মৌলভী আব্দুল লতিফ ওয়াকফ স্টেটের দিঘীর পাড়। সেই দিঘীর ৩ পাড়ে খোলা আকাশের নিচে ওই সময় পর্যন্ত অবস্থান নিয়েছে ৫১৭টি রোহিঙ্গা পরিবার। মৃত্যুর তাড়া খাওয়া ২ হাজার ৫০ মানুষ। বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) সদস্যরা তাদের বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকতে না দেয়ায় তারা সেখানে খোলা আকাশের নিচে গত কয়েকদিন ধরে আটকা পড়েন। তবে দুপুর হতেই ওই সংখ্যা অন্তত তিনগুণ ছাড়ায়। দুপুরের দিকে বাংলাদেশে প্রবেশ করা বুড়িচংয়ের চাংগানার বাসিন্দা মো. আনোয়ার বলেন, আমরা কাঁটা তারের কাছে আসার আগেই দেখি যে ওই তম্বরু এলাকায় আর্মি ও মগরা আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। প্রত্যেক ঘরে অন্তত দু-একজন করে পুড়ে মারা গেছে। হাত উঁচিয়ে তিনি দেখান সেই আগুনের ধোঁয়া। এ সময় বুড়িচংয়ের ফতেহ আলী পাড়ার ছেনুয়াকে (১৫) খাটিয়া বানানো চেয়ার ঘাড়ে করে আনেন তার আত্মীয় শাকের ও হালিম। ছেনুয়া বলেন, গত ৯ দিন আগে ঘরে গুলি চালানোর সময় বের হয়ে পালাতে গিয়ে পা ভেঙে গেছে। তারপর বিভিন্নজনের কাঁধে চড়ে অনেক কষ্টে এতটুকু এসেছি। বোমার আঘাতে ডান পা থেঁতলে যাওয়ার ক্ষত দেখান পাশে দাঁড়ানো খানসামা এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী।

মংডুর বলিবাজার এলাকার সাহেববাজারের ডিয়লতলীর বাসিন্দা নূর মোহাম্মদ তার স্ত্রী ফাতেমা বেগম (৩০), তিন সন্তান জয়নব বিবি (৭), উম্মে হাবিবা (৫) ও ইয়াছিন আরাফাতসহ (৩) গত শুক্রবার বাংলাদেশে ঢুকেন। তার স্ত্রী গত শনিবার রাস্তায়ই আরেক শিশুর জন্ম দেন। তিনি তার এলাকার ঘটনার বর্ণানা দিয়ে বলেন, ডুয়েলতলীতে অন্তত ৬০০ পরিবার ছিল। গত ২৫শে আগস্ট রাত দুটার দিকে চারদিকে ঘেরাও করে গুলি চালায় পুলিশ, আর্মি সদস্য ও মগরা। আমরা হামাগুড়ি দিয়ে পাশের পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নিই। অনেকে গুলি খেয়ে মারা গেছেন। এরপর তারা আগুনে সব ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়। সেখানে মানুষ ও লাশের সঙ্গে ঘরের পশু-পাখিও জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়।

তার স্ত্রী ফাতেমার বাপের বাড়ি ধুমাই এলাকার বলি বাজারে। সে এবং তার ছোট বোন নূর কায়দা (৭) প্রাণে বাঁচলেও বাবা-মাসহ অপর পাঁচ ভাইবোনকে গুলি করে মেরে ঘরবাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তারা হলেন, তার পিতা নূর আলম (৬০), জাহিদা বেগম (৫০) এবং সেতারা বেগম, ওবায়দুল হক, রাবেয়া, হাশিম, ইয়াছমিন আরা, রোকেয়া। একই সময় গুলিতে ও পুড়ে মারা গেছে, তার দাদা সৈয়দ হোসেন, দাদী মরছবা খাতুন, চাচা আবু, ফফু আনোয়ারা।

ফাতেমা বলেন, আমার বাবা-মাসহ সবাইকে মেরে ফেললেও নূর কায়দা খেলতে গিয়ে প্রাণে বাঁচে। সে ওই এলাকার লোকের সঙ্গে একা গতকাল বাংলাদেশে ঢুকার পর আমরা তাকে খোঁজে পাই। সে এলাকার অনেকেই নিখোঁজ। এরপর বাপের বাড়ির এলাকার লোকের কাছে খোঁজ নিলে তাদেরকে গুলি করে ও পুড়িয়ে মারার খবর পাই।

মংডুর বলিবাজার এলাকার সাহেববাজারের তুলাতলীর বাসিন্দা অন্তঃসত্ত্বা তোফায়দা তার স্বামী মহিবুল্লাহ, চার সন্তান আনোয়ার ইসা (১০), ইয়াছমিন (৬), সুপাইরা (৩) ও হাজুল ইসলামকে (২) নিয়ে এদেশে আসেন। তিনি গত ২৭শে আগস্ট সকাল ১০টার দিকে তার ছোটবোন (গত রমজানের তিন দিন আগে বিয়ে হওয়া) খুনের দৃশ্য দেখেন পাহাড়ের ওপরে লুকিয়ে।
তিনি বলেন, আমাদের ঘর পাহাড়ের কাছে ছিল। আমার বোনের ঘর পাহাড় থেকে কিছুটা দূরে। আমরা দ্রুত পাহাড়ের ওপর উঠে গেলেও তারা উঠতে পারেনি। আমার বোন খুব সুন্দরী ছিল। সে পালানোর সময় তাকে ধরে ফেলে। এরপর কয়েকজন আর্মি মিলে ধর্ষণ করে। পরে গুলি করে। এরপর পেট্রোল ঢেলে আগুন দেয়। তখন ওই গ্রামের অনেকজনকে গুলির পর গুলি করে ও বেয়নেট এবং কিরিচ দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারে। শেষে লাশ ও আহতদেরকে আগুন দিয়ে ঘরসহ পুড়িয়ে ফেলে।

গত শুক্রবার আগস্ট বুচিডংয়ের পুনদাউপিং এলাকার মনুপাড়ায় জাহেদ হোসেন ও বুধুর নামে দুই ভাইয়ের বিশাল বাড়িতে আশ্রয় নেয় ওই এলাকার কয়েকশ মানুষ। এর দুদিন পর সেখানে সেনা সদস্যরা তা দেখতে পায়। প্রথমে তারা গুলি চালায়। পরে জাহিদকে বেরিয়ে আসতে বলে। সেই ঘরের অধিকাংশ পুরুষকে মেরে ফেলা হয়েছে বলে জানান সেখানে অবস্থান নেয়া একাধিক রোহিঙ্গা।
মো. জুবাইর বলেন, প্রথমে ডাকে। তিনি গেলে অন্য এক নারী হিজাব খুলে তার হাত পিছমোড়া দিয়ে বাঁধে। তারপর তাকে গুলি করে। এরপর একজন একজন করে তারা গুলি করে ও জবাই করে খুন করে।

এই ঘটনার এক প্রত্যক্ষদর্শী নারীদের সঙ্গে বুধুর ঘরে আশ্রয় নেয়া ১২ বছরের শিশু ইয়াহা জানায়, এক আর্মি জাহিদকে বলে যে প্রতিবার ঝামেলা হলে ক্যাম্পে যাস। এবার যাসনি কেন। তোর ঘরে এত মানুষ কেন। এই বলেই তার উরুতে গুলি করে। তখন সে ও মানুষ, সবাই বেরিয়ে আয় বলে চিৎকার দেন। কিন্তু ভয়ে লোকজন বের হয়ে আসেনি। তবে তার দুই ছেলে এগিয়ে গেলে তাদেরকে বেঁধে রেখে তাদের সামনেই জাহিদকে খুন করা হয়। তারপর একে একে লোক বের করে জবাই ও গুলি করে মারে। পরদিন কয়েকটি ট্রাকে করে লাশগুলো সেখান থেকে নিয়ে গেছে।
জাফর আলম নামে অপর একজন বলেন, আমরা পালিয়ে একটি ঝোপে আশ্রয় নিই। মগরা আসার পর এক শিশুকে উপরে ছোঁড়ে মেরে নিচে কিরিচ বসিয়ে দুই টুকরো করে ফেলে।

Top