ঢাকা, ||

ঈদের আনন্দ হোক সম্প্রীতি সাম্যের


মতামত

প্রকাশিত: ৫:০০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩১, ২০১৭

আব্দুল্লাহ আল নোমান

বরগুনা প্রতিনিধি

ঈদ মানেই আনন্দ, অনাবিল হাসি । ঈদ মানেই অবহেলা ভুলে আন্তরিকতার অটুট বন্ধন সৃষ্টি । বছর ঘুরে এলো ঈদ-উল আযহা । সবাই ব্যস্ত, অবস্হান অনুযায়ী ঈদ উৎসব পালনের নানা রকম ব্যস্ততায় । মানুষের জীবনের বাস্তবতা ও দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতার পরও ডিজিটাল আধুনিক সভ্য সমাজে এখনও দেখি অবহেলিত পথশিশু এবং সুবিধাবঞ্চিত ছেঁড়া পোষাকের দারিদ্র-মলিন মুখ, যা দেখে ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে ! আমরাতো ঈদটাকে চাইনা এভাবে । ঈদের মূলমন্ত্র সম্প্রীতি ও সাম্য, অথচ এখনো ঘোচেনি ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান । এক দিকে চোখে পড়ে অহংকারী দামী পোষাক পরা ধনীর বিলাস-বাহুল্য, নানা রকম রিসিপিতে অতিরিক্ত খাবারের রসনা-বিলাস, অন্যদিকে ক্ষুধার্ত মানুষের কোন রকম বেচে থাকার সংগ্রাম । এতে বিবেকবান মানুষের ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে যায় অনেকটা । ঈদ আসে ঈদ যায় কিন্তু এ দৃশ্যের কোন পরিবর্তন নেই । আমরা পরিবর্তন চাই । চাই ঈদের আনন্দ হোক সবার জন্য সমান ।

শৈশব কৈশোরের স্মৃতি মানুষের কাছে ধূসর আবছায়ার মতো । অনেক দৃশ্যপট ঘটনা হারিয়ে যায় মন থেকে । পরিবেশ পরিস্থিতি এবং বাস্তবতা ধীরে ধীরে মানুষকে বদলে দেয়, ভুলিয়ে দেয় অনেক কিছু । তবুও জীবন চলার পথের অনেক স্মৃতি, অনেক কথা বোধহয় কখনোই ভোলা যায়না । যেমন ভোলা যায়না ছোটবেলার ঈদের কথা । কারন ঈদের ব্যাপারটা অত্যন্ত আনন্দের । মানুষ অত্যন্ত আনন্দ ও অতি কষ্টের স্মৃতি সহজে ভুলে যায়না । ছোটবেলায় ঈদ-উল আযহায় দল বেঁধে অপেক্ষা করতাম কখন গরু কিনে নিয়ে আসবে , গরু দেখে সবাই হৈচৈ শুরু করে দিতাম । চলার পথে সবাই আগ্রহ নিয়ে দেখে, দাম জিজ্ঞেস করে, মনে হয় গরু নামক প্রাণীটি নতুন রূপে এসেছে । এটাই অন্যরকম আনন্দ । কিন্তু আমার চোখ চলে যেত সেইসব মলিনমূখে তাকিয়ে থাকা অসহায় শিশুদের দিকে, যার বাবা মা গরু কিংবা ছাগল কিনতে পারেনি । দেখতাম ঐ অসহায় বাবা মা’র ছিন্নবস্রে ঈদের দিন এক টুকরো মাংসের জন্য দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা রুগ্ন শরীরে দ্বারে দ্বারে ঘোরা । এখনও দেখছি ! হয়ত আরও দেখবো । কারন যতোক্ষন দেশের শাষকগোষ্ঠি বিবেক তাড়িত না হয়ে কাজ করবে, যতোক্ষন মানুষের মনুষত্যবোধ জাগ্রত না হবে ততোক্ষন এভাবেই চলবে । সুখ স্মৃতি দেখার এ্যালবাম একমাত্র মানুষেরই রয়েছে, ইচ্ছে করলেই যেটা নাড়াচাড়া করে দেখা যায় । তাই আমাদের স্মৃতির এ্যালবাম তৈরী হোক বিশ্ব মানবতার বিবেক তাড়িত মমত্ববোধের সত্যিকারের দৃষ্টান্ত নিয়ে ।

ঈদ এক নির্ভেজাল আনন্দ উৎসবের দিন । ঈদে সারাদেশটা উৎসবে মেতে ওঠে । আমরা কি খেয়াল করেছি, অপার আনন্দ অনুভূতিতে জেগে ওঠা মনে আধুনিক এই হৈ-হুল্লোড় ইসলাম সম্মতকিনা ? এই আনন্দে ঈদের সঠিক তাৎপর্য খুঁজে পাই কিনা ? এখন ঈদ আসলেই দেখি মর্ডান বাহারি পোষাক । মেয়েদের পাখি ড্রেস, ছেলেদের পশু ড্রেস। এই পাখি ড্রেস, পশু ড্রেস একাকার হয়ে যায় অলিতে গলিতে, পার্কে, ছাদে কিংবা আড়ালে আবডালে । উচ্চশব্দে সাউন্ট সিস্টেমে “একখান চুম্মো দিয়ে যা-যা-যা” অশ্লীল গানের শব্দে । নিজেরা ঘুমাবেনা, অন্যকেও ঘুমাতে দেবেনা । কিছু বলা যাবেনা । এটা স্বাধীন দেশ । ছেলে মেয়ে সমান অধিকার । ছিনতাই, চাঁদাবাজি করে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে আলোক সজ্জা করে, পটকা ফাটিয়ে, ঈদ স্বাধীনতা পালন করবে । হায়রে আমার স্বাধীনতা ? ফেন্সিডিল আর ইয়াবার রঙ্গিন নেশায় স্বাধীনতা আজ ঝলমল করছে ।যৌবনের সুদৃঢ় চেতনা চাঞ্চল্য আজ ফার্মের মুরগীর মতো ঝিমুচ্ছে ! সব কিছুতেই বিভ্রান্ত চলছে ।সারা জাতির বিবেক যেন ইয়াবা খাইয়ে ঘুম পাড়িয়েছে কেউ ।

উঠতি ছেলেরা চুল খাঁড়া করে, লালকরে, কালো চশমা পড়ে না বুঝেই নেতা হয়ে দাড়িয়ে আছে । আর বোকা অভিবাবকেরা হাততালি দিচ্ছে, বাবা মা বাহবা দিচ্ছে, ছেলে বড় নেতা হয়ে গেছে । ঈদ মোবারক-ঈদ মোবারক পোষ্টারে ব্যানারে ছেয়ে যাচ্ছে দেশ । দেশে মানবতার, দেশপ্রেমের ঘাটতি থাকলেও শুভেচ্ছার কোন ঘাটতি নেই । উপদেশেরও কোন ঘাটতি নেই । কিন্তু উপদেশের চেয়ে দৃষ্টান্ত অনেক ভাল এটা সকলেই জানি । ঈদের সঠিক তাৎপর্যকে জীবনে ধারন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন না করলে এ ঘুনেধরা সমাজ কখনো বদলাবেনা । মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলালেই জীবন বদলে যাবে । আমি অবাক হয়ে গেছি, যখন দেখেছি, অনেক অর্থ-সম্পদ রেখে হঠাৎ মৃত্যুবরনকারী ব্যক্তির পরিবারের উচ্চাভিলাসী বেপরোয়া অহংকারী জীবন-যাপন, একজন নামাজী ভাল ব্যক্তির স্ত্রীর চুল রিবন্ডিং করে,পার্লারে সেঁজে, গাড়ি হাকিয়ে ঘুরে বেড়ানো, সন্তান বখাটে নেশাখোর হয়ে যাওয়া । ঐ ব্যক্তির মৃত্যুর কিছুদিন পরেই কি করে এটা সম্ভব ? এও দেখেছি, অঢেল সম্পদ রেখে যাওয়ার পরেও মৃত্যু ব্যক্তির সামান্য ৠণ পরিশোধ করছেনা তার প্রিয় পরিবার । তাই সময় থাকতেই পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকেই সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা উচিৎ । ভাল মানুষ হিসেবে গড়ে তুললে যে কোন পরিস্থিতেই সে ভাল থাকবে । যে ভাল সবক্ষেত্রেই যে কোন পরিস্থিতেই সে ভাল । খারাপ মানুষ যে কোন পরিস্থিতেই খারাপ ।

আরেকজন ব্যক্তিকে বহুদিন ধরে দেখেছি, সে নিজে নামাজ পড়ে কিন্তু ইয়ং সন্তানদের বেপরোয়া অহংকারী জীবন-যাপন খেয়াল করেনা । এমনকি ঈদের নামাজও পড়েনা । অথচ ঈদের ভিন্ন রকম প্রস্তুতি ব্যাপক । ভুল ধারনায় আছে । ইসলামে এ ইবাদতের কোন মূল্য নেই । একে সন্তানদেরকে ভালবাসাও বলেনা । যাদের আশ্রয় প্রশ্রয় এই অপরাধ হচ্ছে তারাই প্রকৃত দোষী, অথচ তা নির্বোধের কারনে বোঝেনা । বোঝাতে গেলে ক্ষেপে যায় । যদিও এ ক্ষেপে যাওয়াকে তারা রাগ বলে । কিন্তু রাগ-অনুরাগতো ভিন্ন কথা, এ ক্ষেপে যাওয়াকে আসলে উগ্রতা বলে । ঈদ মানেইতো সব ভুল পিছনে ফেলে খাঁটি মানুষ হয়ে খুব সকালে ঈদের নামাজ পড়া, কোলাকুলি করা, অথচ মনে হয় একজন আরেকজনকে চেনেইনা, পাশ দিয়ে দীর্ঘ সময়ের পরিচিত আপনজন হেঁটে যাচ্ছে কেউ কাউকে দেখছেনা, যেন সবাই অচেনা, অস্তিত্বহীন । প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব একটা আলাদা জগৎ আছে । এ জগৎটাকে যেভাবে সাজাবে সে ভাবেই চলবে । ঈর্ষা অহংকার কখনও উন্নতি করতে সাহায্য করেনা । আমরা শেখানোর মধ্যেই শিখি । তাই ঈদের দীক্ষা নিয়ে যেন ভুলি অবহেলা ।

একজন আরেক জনকে ভালবাসতে শিখি, তোষামোদ পছন্দ না করি । নির্বোধ মানুষ কখনও নিজের ভুল স্বীকার করেনা, নিজে যেটা ভাবে সেটাই সঠিক মনে করে, অহংকার করে কথা বলে, অকৃতজ্ঞ ও স্বার্থপর হয়, তোষামোদকারী ব্যক্তির কাছ থেকে বুদ্ধি হাওলাদ করে চলে, এগুলো সবকিছুই ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক, তাই নির্বোধ না হই । বর্তমান প্রজন্মের অধিকাংশ মেয়েদের কাছে ঈদ মানেই স্বল্প পোষাকে উদাম শরীরে ঘুরে বেড়ানো, জি বাংলা, ষ্টার জলসার সিরিয়াল দেখে কাঁদে হাসে, খেয়াল থাকেনা কে আছে পাশে , সারাক্ষন মোবাইল কানে কি কথা বলে কেবা তা জানে । ছেলে মেয়ে সবার সারারাত কাটে ইন্টারনেটে, কিযে খুঁজে বেড়ায় ঘেটেঘেটে । অপসংস্কৃতির কারনে বাড়ছে ধর্ষণ, খুন,জখম । মমত্ববোধ কমে যাচ্ছে, সবকিছুই হারিয়ে যাচ্ছে । গণমাধ্যমে কাজ করার সুবাদে সারা দেশটাকে চষে বেরিয়েছি, দেখেছি খুঁটে খুঁটে । টেলিভিশনের বিশেষ অনুষ্ঠান নির্মানের তাগিদে কথা বলেছি নানা বয়েসের নানা রকম মানুষের সাথে , যতোই দেখেছি ততোই অবাক হয়েছি । আজ প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলের সহজ-সরল কঠিনে মেশানো চমৎকার হৃদয়ের অধিকারী মানুষগুলোও অপসংস্কৃতির করালঘ্রাসে পড়েছে । দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে ইসলামী মূল্যবোধ, হারিয়ে যাচ্ছে মমত্ববোধ, আন্তরিকতা । একজন আরেক জনকে ক্রমাগতভাবে ঠকাচ্ছে, কঠিন ভাবেই ঠকাচ্ছে ।বহু ধরনের আবেগের তীব্রতা মানুষের চিন্তা ও চেতনাকে ভোতা করে দিচ্ছে । মানুষের মত দেখতে হলেই প্রকৃত মানুষ হওয়া যায় না , প্রকৃত মানুষ হতে হলে থাকতে হবে মানবিক গুনাবলী এবং বৈশিষ্ট্য ।নিজে ভাল থাকার বাহিরে অন্যের ভাল থাকার ব্যাপারেও ভাবতে হবে ।

হাজার বছর আগের কাউকে কি আমরা সেভাবে মনে করি ? চলছি তো চলছিই আপন মনে, খুব কম সময়ের অতীত ভবিষৎ নিয়ে । হাজার বছর পরে আমাদের কেউ কি মনে করবে ? আমাদের এই সুখ-দুঃখের কথা কেউ মনেও করবেনা । তাই জীবন বদলাতে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে । ঈদের পশু কোরবানীর সাথে মনের পশুত্বও কোরবানী দিতে হবে । তা না হলে সবই হবে বৃথা এবং মূল্যহীন । ভাল মানুষ হওয়ার জন্য নিজেদেরকে আরও শোধরানো দরকার । ঈদের সঠিক নির্ঝাস সকলকে শোধরিয়ে জীবনে সর্বাঙ্গীন সুখ-সমৃদ্ধি বয়ে আনুক, এই প্রত্যাশা প্রষ্ফূটিত হোক সবার মনে ।

এম.আর. প্রিন্স.
সাংবাদিক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব
প্রধান উপদেষ্টা, জিএমনিউজবিডি.কম

Top