ঢাকা, ||

আজকালকার ছেলেরা


মতামত

প্রকাশিত: ১০:২০ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৪, ২০১৬

আব্দুল্লাহ আল নোমান

বরগুনা প্রতিনিধি

১. ছেলে-বাচ্চাদের যে কী করে বড় করে বাঙালি মায়েরা! কলকাতায় থাকাকালীন ছেলে-বাচ্চাদের নিয়ে মায়েদের বড় আদিখ্যেতা দেখেছি। আমার এক বন্ধুর ছেলে অ্যাকসিডেন্টে মারা গিয়েছিল, ছেলেটিকে তো ভগবান ভেবে পুজো করতো ছেলেটির মা। পুজোর ঘরে ঠাকুরদের মূর্তির পাশে ছেলেটির একটি ফটো রাখতো। মেয়েদের জন্মই যেন ছেলে জন্ম দেওয়ার জন্য, আর সেই ছেলের সেবায় জীবন উৎসর্গ করার জন্য। বুড়ো ধাড়ি হওয়ার পরও মুখে তুলে খাইয়ে দেবে। সারাক্ষণই চোখে চোখে রাখবে। কোথায় যাচ্ছে, কী করছে। বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে বারণ করবে। আমার বেশ কয়েকজন বান্ধবীকে দেখেছি, তারা ছেলেকে নিজের বিছানায় শোয়ায়। ছেলের ১৫-১৬ বছর বয়স হয়ে গেলেও। মায়ের সঙ্গে শুয়ে শুয়ে ছেলেরা পরে আর বউ-এর সঙ্গে শুতে পারে না। আমার এক বান্ধবীর স্বামী তো তাই করতো। বাসর রাতেও সে বউ-এর পাশ থেকে উঠে গিয়ে মায়ের সঙ্গে মায়ের বিছানায় ঘুমিয়েছে। মায়ের অতি আদরে অতি নজরে অনেক ছেলেই বয়সে বড় হয়েও সত্যিকার বড় হয় না, স্বনির্ভর তো হয়ই না। মা পরনির্ভর বানিয়ে দেয় বলে বউ-এর সঙ্গেও পরনির্ভর জীবনযাপন করে। ঘরের কোনও কাজই করতে পারে না। কাপড় চোপড় পরার সময় নিজের শার্টটা, মোজাটা খুঁজে নিতে পারে না, খাবার টেবিলে বসে বাটি থেকে তরকারিটাও থালায় বেড়ে নিতে পারে না। বউদের সমস্যা হয় খুব। আবার এই বউরাও ছেলে জন্ম দিলে ওই একই কাজ করে, যেটা তাদের মা বা শাশুড়ি করতো। ছেলে-বাচ্চাদের কবে যে স্বনির্ভর আর দায়িত্ববান হতে দেবে মায়েরা! কবে যে নিজেরটা নিজেকে বুঝতে দেবে!

২. কলকাতায় কিছুদিন আগে আবেশ নামে সতেরো বছর বয়সী এক বড়লোকের ছেলে মারা গেছে। এক বন্ধুর জন্মদিনের পার্টিতে গিয়েছিল, ওখানেই কাচ ঢুকে গেছে বাহুতে। বাহুর ধমনিতে। রক্ত ক্ষরণ বেশি হয়েছিল। হাসপাতালে নিয়ে যেতেও দেরি হয়েছিল বেশি, সে কারণে আর বাঁচেনি। আবেশের মৃত্যু নিয়ে কলকাতা তোলপাড়। আবেশকে কেউ কি মেরে ফেলেছে, নাকি এটি দুর্ঘটনা। সকলে এ নিশ্চিত, ছেলেমেয়েরা ও বাড়িতে মদ খাচ্ছিল। হয়তো মাতাল হয়ে আবেশ কোনও খালি বোতলের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়, অথবা কেউ তাকে ভাঙা বোতল দিয়ে আঘাত করে। কোনটি ঘটেছে তা জানার আগেই বিতর্ক শুরু হয়ে গিয়েছে। কলকাতার মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায় ফেসবুকের একটি স্টেটাস শেয়ার করেছেন যেটিতে দোষ দেওয়া হয়েছে নতুন প্রজন্মকে। পোস্টটা এরকম—

‘আবেশের মৃত্যুর বিচার চাই। চারদিকে শোরগোল। আবেশ কবে মারা গিয়েছে? লেখক অমিত চৌধুরীর ফ্ল্যাটে জন্মদিনের পার্টিতে? শনিবারের ক্লাব পার্টি করে ফেরার পথে— ভুল। আবেশ মারা গিয়েছে সেদিন, যেদিন ইংরাজি মাধ্যম স্কুলে পড়া ১২ বা ১৩ বছরের বালক হওয়া সত্ত্বেও বাবা-মা তার হাতে একগুচ্ছ টাকা তুলে দিয়েছে বন্ধুদের সাথে পার্টি করার জন্য। আবেশ মারা গেছে সেদিনই, যেদিন ক্লাস এইটে উঠতে না উঠতে হাতে পেয়ে গেছে দামি মোবাইল। আবেশ মারা গেছে সেদিন-ই যেদিন টিউশনের নাম করে ক্লাব রেস্তোরাঁতে ঘুরে রাত করে বাড়ি ফিরলেও মা এর একগোছা প্রশ্নের সামনে পড়তে হয়নি। আবেশ মারা গেছে সেদিন-ই যেদিন রাত জেগে বান্ধবীদের সাথে চ্যাট করার পরও মা তাকে জিজ্ঞাসা করেনি— এত রাত জেগে কী করছিস? শুয়ে পড়, সকালে স্কুল আছে। আবেশ মারা গেছে সেদিন-ই যেদিন স্কুলের ক্লাস টিচার শুধু ইংরাজির নম্বর দেখে মুগ্ধ হয়ে বলতে ভুলে গেছেন— বাবা মানুষ হ। আবেশ মারা গেছে সেদিন-ই, যেদিন পাখি সব কলরব করে ওকে ঘুম ভাঙাতে ভুলে গেছে। আবেশরা বেঁচে ছিল কবে? ওরা তো কবেই মরে গেছে। পাখির কূজন ওদের কানে ঢোকে না, ঠাকুরমার ঝুলির গল্প ওদের হেডফোন ভেদ করে ঢুকতে পারে না। ওরা সূর্য কে উঠতে দেখেনি, পূর্ণিমার চাঁদ ওদের মনকে ভিজিয়ে দেয় না। জন্মদিনে ওরা নেমন্তন্ন পায় না, পার্টি করে। সে পার্টিতে মদ ঢেলে দেয় প্রগতিশীল পরিবারের স্বল্পবাস বান্ধবীরা। সে পার্টিতে মন দেওয়া নেওয়া চলে না, শরীর দেওয়া নেওয়া চলে। তাই নিয়ে মারামারিও হয়। ওসব না হলে সোসাইটিতে বাবা মায়ের মান পড়ে যায়। তাই যে ঠাকুরমার কোলে পিঠে বড় হয়ে ওঠা— তিনি চিরতরে বিদায় নেওয়ার দুদিনের মধ্যেই আধুনিক বান্ধবীর ফ্ল্যাটে জন্মদিনের সেলিব্রেশন করতে বিবেক দংশন হয় না। আবেশদের সোসাইটিতে বাচ্চা ছেলে মেয়েদের একসাথে প্রকাশ্যে মদ খেতে দেখলেও পাড়ার জ্যেঠু কাকুরা বলেন না… ‘এই তোরা কি করছিস? দাঁড়া এক্ষুনি বাড়িতে খবর দিচ্ছি।’

মেয়রের শেয়ার করা স্টেটাসটি পড়ে আমার যা মনে হয়েছে বলছি—

‘আবেশের মা আবেশকে পার্টি করার জন্য টাকা দিয়েছিল বলে আবেশকে মরতে হয়েছে? কেন যে লোকে হাবিজাবি কথা বলে। বাবা মা’রা সন্তানদের দামি দামি মোবাইল কমপিউটার কিনে দিলে সন্তান নষ্ট হয়ে যায়? জন্মদিনের পার্টিতে গেলে, বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে হৈ হেল্লা করলে, মদ খেলে ছেলে খারাপ হয়ে যায়? এত খারাপ যে ১৭ বছর বয়সী ছেলের মরে যাওয়াটাকেও যৌক্তিক বলে মনে হয়? রাত জেগে বান্ধবীর সঙ্গে চ্যাট করলে ছেলে খারাপ? কোচিং-এ যাওয়ার নাম করে কখনো ক্লাবে রেস্তোরাঁয় ঘুরলে ছেলে খারাপ? বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে রাত করে বাড়ি ফিরলে ছেলে খারাপ? পাখির কূজন কানে না ঢুকলে, ঠাকুরমার ঝুলির গল্প পছন্দ না করলে ছেলে খারাপ? ভোরের সূর্যোদয় না দেখলে ছেলে খারাপ? শরীর দেওয়া নেওয়া হলে ছেলে মেয়েরা খারাপ? কী আশ্চর্য। ছেলে মেয়েদের জন্য এসব অতি স্বাভাবিক, বরং এসব না করে, অভিভাবকের অতি বাধ্য হলেই, যাহা দেওয়া যায় তাহাই খাইলেই বরং হতো দুশ্চিন্তার বিষয়।

যারা ফেসবুকে পাখির কূজন টুজন নিয়ে স্টেটাস দেয়, যারা শেয়ার করে, যারা এসব অর্বাচীন কথাবার্তা বিশ্বাস করে, তারা সমাজের বিবর্তনে বিশ্বাস করে না। তারা তাদের নিজেদের ছোটবেলাকেই আইডিয়াল ছোটবেলা বলে মনে করে, শাসনে শোষণে তারা বড় হয়েছে, তারা চায় ওভাবেই সব যুগে সব ছেলেমেয়ে বড় হোক। ওই পদ্ধতিই যেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পদ্ধতি। তারা ভুলে যায় যে এক একটা যুগ থেকে আরেকটা যুগ আলাদা। এক প্রজন্মের মানসিকতা থেকে আরেক প্রজন্মের মানসিকতা ভিন্ন। এখনকার ছেলেমেয়ের জীবনযাপন, চিন্তাভাবনা, রুচিবোধ, নীতিবোধ আমাদের মতো নয়। নয় বলেই বুঝতে হবে সমাজ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। আমরা কৈশোরে যা করিনি, বা করতে ভয় পেয়েছি, এখনকার কিশোর কিশোরীরা তা অবলীলায় করছে বা করতে চাইছে। এদের জগত্টা তথ্যপ্রযুক্তির জগৎ। আমাদের জগতে পাখির কূজনে ঘুম ভাঙা ছিল, বিকেলের কাশবন ছিল, ডিঙি নৌকো ছিল। এদের জগতে ওসব নেই বলে এরা আমাদের চেয়ে কিছু কম জ্ঞানী, কিছু কম সংবেদনশীল— তা ভাবাটা বোকামো। বিয়ের আগে সেক্স করা এখনকার ছেলেমেয়ের কাছে স্বাভাবিক, যা আসলেই স্বাভাবিক। এভাবেই সমাজ বিবর্তিত হয়। বিবর্তন সব সময় আগের চেয়ে ভালো কিছু, পারফেক্ট কিছু নিয়ে আসে তা নয়। তবে যা-ই নিয়ে আসে, আমাদের তা গ্রহণ করতে হবে। গ্রহণ করাটাই স্মার্টনেস। গ্রহণ না করে বকবক করাটা আফসোস করাটা আনকুথ ব্যাপার। এক সময় ছেলেমেয়েরা হয়তো আর বিয়েই করবে না। এটিকে আজ স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না, কোনও একদিন এই নিয়মকে স্বাভাবিক মনে হবে। বড়রা মদ খাচ্ছে, ছোটরা শিখছে। এটিও খুব স্বাভাবিক। তবে ছোটরা বড়দের মতো প্রতি সন্ধেবেলা খেতে বসে না, পার্টিতে কদাচিৎ খায়। মাচ বেটার।

দুর্ঘটনায় আবেশ মারা গিয়েছে, অথবা কেউ তাকে মেরে ফেলেছে। এরকম মরে যাওয়া মেরে ফেলা অহরহই ঘটছে। কী করে আবেশের মৃত্যুটা হলো তা না হয় জানতে চেষ্টা করি।

আর, যে কথাটি বলার জন্যে এই পোস্টটি দেওয়া, সেটি হলো, পুরো প্রজন্মকে ঠাকুরমার ঝুলি না পড়ার জন্য বখে গেছে বলে দোষ দেওয়া, ছেলেমেয়েদের কড়া শাসন না করার জন্য বাবা মাকে দোষ দেওয়া, ‘উচ্ছৃঙ্খল’ জীবনযাপনের জন্য বিত্তকে দোষ দেওয়া বা ইংরেজি মাধ্যম ইসকুলকে দোষ দেওয়া… একেবারেই ঠিক নয়। কিছু একটা দুর্ঘটনা ঘটলেই কিছু প্রাচীনপন্থি লোক ট্র্যাডিশানের সুনাম গাইতে থাকে। যেন এ যুগেই দুর্ঘটনা ঘটে, তাদের ট্র্যাডিশান মানা যুগে কেবল শান্তির পায়রা উড়তো।’

৩. অনেকে মনে করে বাবা মা মানেই সন্তান মানুষ করার জন্য উপযুক্ত লোক। সন্তান জন্ম দিলেই যে সন্তানকে ভালো মানুষ করতে পারবে সবাই, তা ঠিক নয়। অনেক বাবা মা জানেই না সন্তানদের কী করে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা যায়। ছলচাতুরী করে যারা বড় হয়, তারা সন্তানদের ছলচাতুরী করতেই শেখায়। সৎ লোকই সত্ভাবে সন্তানদের বাঁচার উপদেশ দেয়। আজকাল সৎ লোকের বড় অভাব। অনেক বাবা মা ‘ছেলে লেখাপড়া করে বড় হোক, মানুষের মতো মানুষ হোক’—এর বদলে ছলেবলে কৌশলে টাকা পয়সা কামিয়ে নিক চায়। কিছু ছেলে মেয়ে বাবা মা যাই বলুক বা করুক, নিজেরা নিজের চেষ্টায় ভালো মানুষ অথবা বড় মানুষ হয়ে ওঠে। এই সংখ্যাটা খুব কম। ঘরে যা দেখে ছেলেমেয়েরা, সাধারণত তাই শেখে। নারী নির্যাতন দেখলে নারী নির্যাতন শেখে, বই পড়তে দেখলে বই পড়তে শেখে, মদ সিগারেট খেতে দেখলে মদ সিগারেট খেতে শেখে, খিস্তি আওড়াতে দেখলে খিস্তি আওড়াতে শেখে। শুধু ঘর থেকেই শেখে না, ঘরের বাইরে থেকেও প্রচুর শেখে। ঘরকে ভালো করলেও বাইরেরটা ভালো না হলে ছেলেমেয়েদের ভালো হওয়ার কোনও নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। ঘরটাকে ভালো করার দায়িত্ব বাবা মার থাকে। বাইরেরটাকে ভালো করার দায়িত্ব সবার, সব বড়দের। ছোটদের যদি চাই মানুষের মতো মানুষ হোক, শুধু ঘরকে বাসযোগ্য করলে চলবে না, বাইরেরটাকেও করতে হবে।

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা

Top